এই শহরে শৃঙ্খলা জরুরি

একটি শহর কেমন হবেবাসযোগ্য নাকি বিশৃঙ্খল, পরিবেশবান্ধব নাকি অপরিকল্পিত; তা অনেকটা নির্ভর করে পরিকল্পনার ওপর। আর সেই পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। দ্রুত বর্ধনশীল চট্টগ্রাম নগরের আগামী দুই দশকের উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনার রূপরেখা নির্ধারণে প্রণয়ন করা হচ্ছে নতুন মাস্টারপ্ল্যান। এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে ডেপুটি টিম লিডার হিসেবে আছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ড. মোহাম্মদ নুরুল হাসান।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (সিডিএ) ‘টাউন প্ল্যানার’ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে পেশাগত অভিজ্ঞতার গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক জ্ঞান ও গবেষণা কাজে লাগাতে তিনি চাকরি ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষায় পাড়ি জমান। সেখানে পিএইচডি করে দেশে ফিরে ফের যুক্ত হন চট্টগ্রামের পরিকল্পিত উন্নয়নকাজে। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তর, চট্টগ্রামের ব্যুরো প্রধান ভূঁইয়া নজরুল

দেশ রূপান্তর : পরিকল্পিত নগরায়নের জন্য কী কী থাকা দরকার?

ড. মোহাম্মদ নুরুল হাসান: একটি নগরী পরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠার জন্য তিনটি প্রধান নিয়ামকের একটি হলো লিডারশিপ, দ্বিতীয়টি প্ল্যান এবং তৃতীয়টি হলো প্ল্যান বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ। নগরী তখনই পরিকল্পিত হিসেবে গড়ে ওঠে যখন একজনের লিডারশিপ থাকে। অর্থাৎ এই লিডারশিপের নেতৃত্বে নগরী গড়ে উঠবে এবং কোথাও কোনো অসংগতি হলে এর দায়ভারও সংশ্লিষ্ট লিডার বহন করবেন। এখন আমরা চট্টগ্রামের অপরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ে কাউকে দায়ী করতে পারি না। এককভাবে কেউ এর দায়ভারও নিচ্ছেন না। একে অপরের ওপর দায় চাপাতে ব্যস্ত। এজন্য ‘সিটি গভর্নমেন্ট’ দরকার।

পরিকল্পিত নগরীর জন্য প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ। আর এই মানবসম্পদের প্রপার ট্রেইনড থাকতে হবে। একইসাথে সময়োপযোগী একটি মাস্টারপ্ল্যান থাকতে হবে। সেই মাস্টারপ্ল্যান আবার ৫ বছর পর পর রিভিও করতে হবে। কারণ সময়ের সাথে সাথে প্ল্যান পরিবর্তন হতে পারে। বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল শহরগুলোতে তথা প্রায় সব শহরের বিভিন্ন কম্পোনেন্ট দ্রুত পরিবর্তন হয়। সেই পরিবর্তনের আলোকে প্ল্যানও পরিবর্তন হতে হবে। আবার প্ল্যানগুলো বাস্তবায়নের জন্য জনবল কাঠামো লাগবে। 

দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রাম মহানগরীর পরিকল্পিত নগরায়ণে সমস্যা কোথায়?

ড. মোহাম্মদ নুরুল হাসান : চট্টগ্রামে সিটি গভর্নমেন্ট (নগর সরকার) নেই। তাই একক লিডারশিপের মাধ্যমে এই শহরের সম্প্রসারণ ও পরিচালন হচ্ছে না। ফলে জলাবদ্ধতাসহ যেকোনো সমস্যা এককভাবে সমাধানও করা যাচ্ছে না। একই সমস্যা হচ্ছে পরিকল্পিত নগরায়ণের ক্ষেত্রেও। এছাড়া চট্টগ্রামে দক্ষ মানবসম্পদ নেই। নগর ব্যবস্থাপনার জন্য সিডিএতে পর্যাপ্ত জনবল কাঠামো নেই। এছাড়া চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে কোনো প্ল্যানার ও আর্কিটেক্ট নেই, ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ার, ট্রান্সপোর্টেশন প্ল্যানার ও ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেক্ট নেই; যা একটি পরিকল্পিত নগরীর জন্য খুব প্রয়োজন। এভাবে কি শহর বেড়ে উঠতে পারে? এই শহরে ১৯৯৫ সালে ২০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু শহরের জনসংখ্যা ও অবকাঠামোগত পরিবর্তন দ্রুত হয়েছে। তাই প্রতি ৫ বছর পর পর শহরের পরিকল্পনা রিভাইস করা প্রয়োজন ছিল; কিন্তু তা হয়নি। আর এর সব নেতিবাচক প্রভাব আমরা এখন ভোগ করছি।

এখন চট্টগ্রাম শহরের মাস্টারপ্ল্যান হচ্ছে ২০২৬-২০৪৬ সাল পর্যন্ত। এই মাস্টারপ্ল্যানও ২০৩১ সালে রিভাইস হতে হবে। যদি রিভাইস না করা হয় আবারো অপরিকল্পিত উন্নয়নের প্রসার ঘটবে। চট্টগ্রামসহ বিশ্বের এমন উন্নয়নশীল শহরগুলোতে দ্রুত পরিবর্তন হয়; আর তা মাথায় রেখেই প্রতি ৫ বছর পর পর রিভাইস প্ল্যান করতে হবে। তবেই প্ল্যানিং প্রসেস ঠিক থাকবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো একটি এলাকায় ওয়াসার সংযোগ লাইন দেয়া হয়। কিন্তু সেই এলাকায় যদি ১০ বছরে অনেক বেশি মানুষ বসতি গড়ে তোলে তাহলে ওখানকার পরিকল্পনা কলাপ্স করবে। তাই পরিকল্পনার সময় যথাযথ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দিয়ে শহরের প্রবৃদ্ধি, প্রসার ও জনসংখ্যার চাহিদার ডিটেইল সার্ভের মাধ্যমে গবেষণা রিপোর্ট তৈরি করতে হবে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধু পরিকল্পনা করলেই হবে না তা বাস্তবায়নও করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : বায়েজিদ, সাগরিকা, কালুরঘাট শিল্পজোনে আবাসিক এলাকাও গড়ে উঠছে। নগরে আবাসিক ও বাণিজ্যিকের মিশ্রণ হচ্ছে। পরিকল্পিত নগরী গড়ে উঠার ক্ষেত্রে এই বৈপরীত্য কেন?

ড. মোহাম্মদ নুরুল হাসান : যখন এসব শিল্পজোন গড়ে উঠে তখন এগুলো নগরকেন্দ্র থেকে অনেক দূরেই ছিল। কিন্তু ওই যে বললাম চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোতে দ্রুত প্রসার ঘটে। ৯৫ এর মাস্টারপ্ল্যানেও এগুলো জনকোলাহল থেকে দূরে ছিল কিছুটা। তারপরও পরবর্তীতে এর আশপাশের এলাকায় বসতি স্থাপনের আগে শিল্প ও আবাসনের মাঝে বাফার জোন (উন্মুক্ত স্থান বা সবুজায়ন এলাকা) থাকা প্রয়োজন ছিল। এক্ষেত্রে তা হয়নি, এর অন্যতম কারণ হলো ওই যে ৫ বছর পর পর প্ল্যান রিভিও করা দরকার ছিল। যদি রিভিও করা হতো তাহলে এই সমস্যাটি সমাধান হয়ে যেত।

দেশ রূপান্তর : এই নগরে ট্রাফিক সমস্যা মারাত্মক। তা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? এখানে পর্যাপ্ত রোড নেটওয়ার্ক নেই?

ড. মোহাম্মদ নুরুল হাসান : আমরা ট্রাফিক সার্ভে করে দেখেছি এই নগরে রোড নেটওয়ার্ক অপর্যাপ্ত নয়। আর এখনই ফ্লাইওভার দরকার ছিল না। তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে যানজট কেন লেগে আছে? ট্রাফিকের প্রধান সমস্যা হলো ব্যবস্থাপনার অভাব অর্থাৎ ট্রাফিক পার্কিং ব্যবস্থাপনা, পার্কিং ব্যবস্থাপনা ও পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে। আমরা যদি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কার্যকর করেই কিন্তু এই সমস্যা সমাধান করে ফেলতে পারি। এই শহরে আগে ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট ছিল। এখন আর তা নেই। আগে থাকলে এখন থাকবে না কেন?

এই শহরের রাস্তাঘাটগুলোর মধ্যে গাড়ি অবৈধ পার্কিং করে রাখে। রাস্তাগুলোতে ভ্যানের বাজার বসে। রাস্তা ভ্যান আর দাঁড়ানো গাড়ির মাধ্যমে দখল হয়ে থাকে তাহলে গাড়ি চলবে কোথায়। এজন্য এগুলো রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে হবে। এই শহরে গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা নেই। দীর্ঘদিন ধরে যদি দুটি বাস সার্ভিস কাউন্টার মাধ্যমে চলাচল করতে পারে তাহলে বাকি বাসগুলো কেন কাউন্টার ভিত্তিক চলাচল করতে পারবে না? অর্থাৎ শহরে গণপরিবহন ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। এই শহরে নতুন আরেকটি সমস্যা রয়েছে তা হলো বাসাবাড়িতে অতিথির গাড়ি বাইরে রাখুন স্টিকার লাগিয়ে রাখে। কেন রে ভাই? অতিথির গাড়ি থাকবে কোথায়? রাস্তায় রাখলে যানজট হবে, অতিথির গাড়িকে তো ভবনের ভেতরে রাখার সুযোগ দিতে হবে। আধুনিক নগর পরিকল্পনায় প্রতিটি ভবনের পার্কিংয়ের ৮ থেকে ১০ শতাংশ জায়গা অতিথির গাড়ি ও মোটরসাইকেলের জন্য বরাদ্দ থাকে। আমাদের এখানে কেন নয়? রাস্তার পাশের বাণিজ্যিক ভবনগুলোতেও পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এই শহরে সিটি কর্পোরেশনকে অবশ্যই ট্রাফিক সিগন্যাল সিস্টেম চালু করতে হবে। কর্পোরেশন নগরবাসী থেকে ট্যাক্স নিচ্ছেন, তাই এই সংস্থাকেই তা নিশ্চিত করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : আধুনিক নগরীর জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেমন হওয়া প্রয়োজন?

ড. মোহাম্মদ নুরুল হাসান : বিশ্বের প্রায় সব শহরেই বর্জ্যকে পৃথকীকরণ করা হয়। কিন্তু আমরা বর্জ্য রাখার জায়গাও পাইনি। বাসা বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা বর্জ্যগুলো একটি নির্ধারিত স্থানে (সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন) জড়ো করে সেখান থেকে ডাম্পিং স্টেশনে নেয়ার কথা। কিন্তু আমরা সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন করার কোনো জায়গা পাই না। জায়গা না থাকলে প্রয়োজনে জায়গা কিনে প্ল্যান্ট করতে হবে। জায়গা পেলে শুধু ফ্ল্যাট বা মার্কেট নির্মাণ করলেই হবে না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও সিটি কর্পোরেশনের প্রধান দায়িত্ব। এই বর্জ্যকে পৃথকীকরণের পর রিসাইক্লিনিংয়ের মাধ্যমে ব্যবহার এবং তা শক্তিতে পরিণত করার প্রকল্প থাকতে হবে।

দেশ রূপান্তর : আগামীর চট্টগ্রাম শহরকে কেমন দেখতে চান?

ড. মোহাম্মদ নুরুল হাসান : আমরা তো চট্টগ্রামকে সিডনি কিংবা কুয়ালালামপুর বানাতে পারবো না। আমি এই শহরকে শৃঙ্খলার মাধ্যমে বেড়ে উঠতে দেখতে চাই। শহরে বিদ্যমান সবুজ স্থানগুলো রক্ষার পাশাপাশি নতুন নতুন উন্মুক্ত স্থান ও সবুজায়ন রাখতে হবে। এই শহরের নাগরিকদের বিনোদনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। নগরীর বর্তমান সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে আমরা মাস্টারপ্ল্যানে একটি সমন্বিত প্রস্তাবনা দিয়েছি। যদি মাস্টারপ্ল্যানের প্রস্তাবনাগুলো মেনে তা বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে হয়তো আমরা একটি পরিকল্পিত নগরীর দিকে ধাবিত হতে পারবো।