চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ি ইউনিয়নের ছমদ আলী সিকদারপাড়ার তরুণ উদ্ভাবক মো. আশির উদ্দিন। প্রযুক্তিনির্ভর নানা উদ্ভাবনের মাধ্যমে এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন তিনি। নিজ উদ্যোগে ড্রোন ও আল্ট্রালাইট ক্যাটাগরির বিমান তৈরির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন তিনি। তার উদ্ভাবন সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থারও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বলে জানান আশির।
আশির উদ্দিন বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ড্রোন প্রযুক্তি কৃষি, উদ্ধার অভিযান, নজরদারি ও বিভিন্ন আধুনিক কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০১৬ সাল থেকে আমি এ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছি। বর্তমানে ১০ সদস্যের একটি দল নিয়ে সাতটি ড্রোন তৈরি করেছি, যেগুলোর সফল পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সম্পন্ন হয়েছে।’
তিনি জানান, তার তৈরি কয়েকটি ড্রোনে জিপিএস-ভিত্তিক নেভিগেশন, অটোমেটিক মিশন প্ল্যানিং এবং ফেইল-সেফ ‘রিটার্ন-টু-হোম’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে এসব ড্রোনের কার্যকর পরীক্ষামূলক রেঞ্জ ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত।
শিক্ষাজীবন ও প্রযুক্তির পথে যাত্রা
আশির ২০১৫ সালে পুঁইছড়ি ইজ্জতিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০১৮ সালে মাস্টার নজির আহমদ কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে চট্টগ্রামের সামশুন্নাহার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ইউনিভার্সিটি আয়োজিত এভিয়েশন ও মেকানিক্যাল প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি ড্রোন প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
পারিবারিক সঞ্চয় ও ব্যক্তিগত অর্থে ২০১৭ সালে তিনি প্রথম বিমান তৈরির কাজ শুরু করেন। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন ধরনের ড্রোন, এয়ারক্রাফট মডেল, হেলিকপ্টার, এয়ার বোট, ইঞ্জিন এবং অন্যান্য প্রযুক্তিপণ্য তৈরি করেন।
আশির জানান, তার কাজ পরিদর্শনের পর বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা তাকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানান। পাশাপাশি তিনি বর্তমানে বিমানবাহিনীর একটি স্কলারশিপ সুবিধা পাচ্ছেন। এছাড়া বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসন তাকে ‘ক্ষুদে বিজ্ঞানী’ হিসেবে সম্মাননা দিয়েছে।
দুই আরোহী বহনে সক্ষম ‘এয়ার বাইক’
আশিরের অন্যতম উদ্ভাবন আল্ট্রালাইট ক্যাটাগরির একটি বিমান, যার নাম তিনি দিয়েছেন ‘এয়ার বাইক’। তার দাবি, সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয়ে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে এটি নির্মাণ করা হয়েছে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিমানটির দৈর্ঘ্য ১৮ ফুট, উইংস্প্যান ৩০ ফুট এবং ওজন প্রায় ৬০ কেজি। কাঠামোর প্রায় ৮০ শতাংশ অ্যালুমিনিয়াম এবং ২০ শতাংশ লোহা দিয়ে তৈরি। এতে দুটি ১২ হর্সপাওয়ার ক্ষমতার ইঞ্জিন ব্যবহৃত হয়েছে।
আশিরের দাবি, বিমানটি প্রায় ৫০ মিটার রানওয়ে ব্যবহার করে উড্ডয়ন করতে পারে। সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার গতিতে এবং প্রায় ৫০০ মিটার উচ্চতায় উড়তে সক্ষম। এতে সেফটি বেল্ট, জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও উন্নত ল্যান্ডিং সিস্টেম সংযোজন করা হয়েছে।
তিনি জানান, সমুদ্র উপকূলবর্তী চরে ইতোমধ্যে তিন দফা পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সফল হয়েছে।
‘এমএস-৭’ ড্রোন
আশির উদ্ভাবিত ‘এমএস-৭’ নামে একটি ড্রোন সামরিক ও বেসামরিক উভয় ধরনের কাজে ব্যবহারযোগ্য বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রোনটি ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত সফলভাবে পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালিত হয়েছে।
ড্রোনটিতে জিপিএস, ওয়েপয়েন্ট নেভিগেশন, স্বয়ংক্রিয় মিশন পরিকল্পনা এবং সিগন্যাল বিচ্ছিন্ন হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে আসার প্রযুক্তি রয়েছে। এটি প্রায় ৫ কেজি ওজন বহন করে ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত ওষুধ, খাদ্যসহ বিভিন্ন জরুরি সরঞ্জাম পরিবহনে ব্যবহার করা যেতে পারে বলে তিনি জানান।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ভবিষ্যতে একটি ড্রোন উৎপাদন কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে চান আশির। তিনি বলেন, ‘সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পেলে এয়ার বাইকের উৎপাদন ব্যয় আরও কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি চার থেকে ছয়জন যাত্রী বহনে সক্ষম নতুন সংস্করণ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।’
আশিরের মতে, কৃষিতে স্প্রে, দুর্যোগে উদ্ধার অভিযান, জরুরি ওষুধ পরিবহন এবং নজরদারির মতো কাজে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ড্রোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
সম্প্রতি তার উদ্ভাবন দেখতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর একটি প্রতিনিধি দল তার বাড়ি পরিদর্শন করে। প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তারা তার গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রমে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।