‘যুক্তির নগরী’ হোক চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামের বিতর্কচর্চার ইতিহাসে অন্যতম পরিচিত নাম মাসুদ বকুল। ১৯৯২ সালে ‘দৃষ্টি চট্টগ্রাম’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি তরুণদের যুক্তিবাদী, আত্মবিশ্বাসী ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছেন। দীর্ঘ এই পথচলা, বিতর্ক আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এবং চট্টগ্রাম নিয়ে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের ফটো সাংবাদিক আকমাল হোসেন

দেশ রূপান্তর : দৃষ্টি প্রতিষ্ঠার পেছনে কী ধরনের ভাবনা কাজ করেছিল?

মাসুদ বকুল : ছোটবেলা থেকেই বই পড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড এবং সমাজের নানা বিষয় নিয়ে ভাবার আগ্রহ ছিল। তখনই বুঝেছিলাম, একজন মানুষকে গড়ে তুলতে শুধু পাঠ্যবই যথেষ্ট নয়; তার চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও নেতৃত্বের গুণ প্রয়োজন। সেই ভাবনা থেকেই দৃষ্টি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া।

আমার স্বপ্ন ছিল এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে তরুণরা নিজের চিন্তাকে শাণিত করতে পারবে, যুক্তির মাধ্যমে বিষয় বিশ্লেষণ করতে শিখবে এবং সমাজের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সাহস পাবে।

দেশ রূপান্তর : ‘দৃষ্টি’ নামের পেছনে বিশেষ কোনো ভাবনা ছিল?

মাসুদ বকুল : আমরা চেয়েছিলাম তরুণরা শুধু চোখ দিয়ে নয়, চিন্তা দিয়েও পৃথিবীকে দেখুক। সমাজ, রাষ্ট্র ও ভবিষ্যৎকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার মানসিকতা তৈরি করাই ছিল মূল লক্ষ্য। সেই দর্শন থেকেই ‘দৃষ্টি’ নামটি এসেছে।

দেশ রূপান্তর : দীর্ঘ পথচলায় সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কী?

মাসুদ বকুল : মানুষের ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। অনেক শিক্ষার্থীকে দেখেছি, যারা প্রথমবার মঞ্চে উঠে কয়েক মিনিটও কথা বলতে পারত না। পরে তারাই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য পেয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাদের অর্জনই আমাদের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।

দৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত বর্তমান ও সাবেক সদস্যরাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, প্রশাসন, ব্যবসা ও উন্নয়ন খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছে।

দেশ রূপান্তর : তরুণদের বিতর্কে আগ্রহী করতে কী করা প্রয়োজন?

মাসুদ বকুল : বিতর্ককে শুধু প্রতিযোগিতা বা পুরস্কার পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখলে হবে না। তরুণদের বোঝাতে হবে, এটি তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্ব, উপস্থাপনা ও সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশে বিতর্কের ভূমিকা অনেক।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত বিতর্কচর্চার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : এআইয়ের যুগে বিতর্কের গুরুত্ব কী কমে যাবে?

মাসুদ বকুল : বরং গুরুত্ব আরও বাড়বে। এআই তথ্য দিতে পারে, তথ্য সাজিয়ে দিতে পারে; কিন্তু মানুষের মতো মূল্যবোধ, বিবেচনাবোধ ও নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। বিতর্ক মানুষকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করতে শেখায়।

দেশ রূপান্তর : গ্রামাঞ্চলে বিতর্কচর্চা এখনো পিছিয়ে কেন?

মাসুদ বকুল : এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক বিতর্ক কার্যক্রম নেই, প্রশিক্ষকের অভাব রয়েছে এবং অনেক জায়গায় বিতর্ককে এখনো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় না।

গ্রামে বিতর্কের প্রসার ঘটাতে হলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, শিক্ষক উন্নয়ন কর্মসূচি এবং আন্তঃবিদ্যালয় প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে। শহরের সংগঠনগুলোকেও গ্রামে যেতে হবে। কারণ প্রত্যন্ত অঞ্চলেও অনেক মেধাবী তরুণ রয়েছে, তাদের শুধু একটি সুযোগ দরকার।

দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রামের বিতর্ক আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বলুন?

মাসুদ বকুল : আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো চট্টগ্রামে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ডিবেট কমপ্লেক্স’ তৈরি করা। এমন একটি কেন্দ্র, যেখানে শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীরা এসে বিতর্ক শিখতে পারবে, গবেষণা করতে পারবে, বই পড়তে পারবে এবং নিজেদের বিশ্বমানের বক্তা ও চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে।

এমন একটি জায়গা দেখতে চাই, যেখানে নিয়মিত বিতর্ক, কর্মশালা, গবেষণা ও মতবিনিময় হবে। সেখানে থাকবে প্রশিক্ষণকক্ষ, লাইব্রেরি, অডিটোরিয়াম ও গবেষণার সুযোগ।

আমার বিশ্বাস, এই কমপ্লেক্স শুধু একটি ভবন হবে না; এটি হবে চিন্তার কারখানা। এখান থেকে তৈরি হবে এমন তরুণ, যারা যুক্তি, জ্ঞান ও মানবিকতার মাধ্যমে সমাজে নেতৃত্ব দেবে।

দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রামকে আগামী ২০ বছরে কোথায় দেখতে চান?

মাসুদ বকুল : আমি এমন একটি চট্টগ্রাম দেখতে চাই, যেখানে তরুণরা শুধু চাকরি খোঁজার জন্য নয়, নতুন ধারণা সৃষ্টি করার জন্য পরিচিত হবে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, গবেষণা, উদ্ভাবন ও নেতৃত্বসব ক্ষেত্রেই চট্টগ্রাম এগিয়ে যাবে।

চট্টগ্রাম দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত। আমি চাই এটি একই সঙ্গে জ্ঞান ও যুক্তির নগর হিসেবেও পরিচিত হোক।

দেশ রূপান্তর : নতুন প্রজন্মের জন্য আপনার বার্তা কী?

মাসুদ বকুল : প্রযুক্তি ব্যবহার করুন, এআই ব্যবহার করুন, কিন্তু নিজের চিন্তা করার ক্ষমতা হারাবেন না। প্রশ্ন করতে শিখুন, পড়তে শিখুন, যুক্তি দিতে শিখুন। কারণ ভবিষ্যতে সফল হবে সেই মানুষ, যে শুধু তথ্য জানে না, তথ্যের অর্থও বুঝতে পারে।

দৃষ্টি কোনো একক ব্যক্তির সংগঠন নয়; এটি একটি আন্দোলন। আমি বিশ্বাস করি, আগামী প্রজন্ম এই আন্দোলনকে আরও বড় করবে। একদিন যুক্তি, জ্ঞান ও মানবিকতার চর্চায় চট্টগ্রাম নতুন পরিচয় তৈরি করবে।