লাল নয়, সবুজ আনবে সাফল্য

বাংলাদেশে লোহার কোনো প্রাকৃতিক খনি নেই। অথচ দেশের নির্মাণশিল্পে ব্যবহৃত রড উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কাঁচামালের জোগান দিচ্ছে শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং শিল্প। এক অর্থে, পরিত্যক্ত জাহাজই হয়ে উঠেছে ‘ভাসমান লোহার খনি’।

দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পিএইচপি ফ্যামিলি গ্রুপ আন্তর্জাতিক মানের গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেখিয়ে দেয়, পরিবেশ সংরক্ষণ, শ্রমিকের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেও এই শিল্পকে লাভজনক ও টেকসইভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। এ উদ্যোগের নেতৃত্বে ছিলেন পিএইচপি ফ্যামিলি গ্রুপের পরিচালক জহিরুল ইসলাম রিংকু।

দেশের এই সম্ভাবনাময় শিল্পের বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ, আন্তর্জাতিক মানে উত্তরণের পথ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান ভূঁইয়া নজরুল

দেশ রূপান্তর : ২০১৬-২০১৭ সালের দিকে শিপ ব্রেকিং শিল্পে ভরা জোয়ার ছিল। প্রতি বছর গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টন লোহা পাওয়া যেত। এখন কী অবস্থা?

জহিরুল ইসলাম রিংকু : শিপ ব্রেকিং শিল্পে সত্যি একসময় ভরা জোয়ার ছিল। ইয়ার্ডগুলোতে জাহাজ কাটার কর্মযজ্ঞ এবং জাহাজ থেকে পাওয়া উপজাত হিসেবে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স ও ফার্নিচার পণ্যে পুরো সীতাকুন্ড এলাকা সরগরম ছিল। আগে এই শিল্প থেকে যেখানে আমরা বছরে ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টন লোহা পেতাম; এখন তা নেমে এসেছে ১০ থেকে ১২ লাখে। তখন শিপ ব্রেকিং শিল্পে আমরা বিশ্বে শীর্ষস্থানেও ছিলাম। এখন অবনমন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে নেমে এসেছি।

দেশ রূপান্তর : এই অবনমন কেন?

জহিরুল ইসলাম রিংকু : এই শিল্পে পরিবেশগত বিধিনিষেধ আগেও ছিল এখনো আছে। ২০১১ সালে জাহাজভাঙাকে শিল্প হিসেবে ঘোষণার পর পরিবেশ অধিদপ্তরের আওতাধীন অরেঞ্জ (কমলা) ক্যাটাগরির আওতায় ছিল। এতে জাহাজ বিচিং থেকে শুরু করে কাটিংসহ অন্যান্য কাজ খুব দ্রুত হচ্ছিল এবং শিল্পেরও প্রসার ঘটে। তখন আমরা জাহাজভাঙা শিল্পে বিশ্বে এক নম্বরে চলে যাই। কিন্তু গেল অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একজন উপদেষ্টার কারণে জাহাজভাঙা শিল্পকে পরিবেশ অধিদপ্তরের রেড (লাল) ক্যাটাগরির আওতায় নিয়ে যাওয়া হয়। এতে জাহাজ বিচিং থেকে শুরু করে কাটিংসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে বাড়তি অনুমোদন ও ফরমালিটিস অনুসরণ করতে হয়। ফলে সময় যেমন অপচয় হচ্ছে; তেমনি রেড ক্যাটাগরি হওয়ায় বিদেশি দাতা সংস্থাও অর্থায়নে অনীহা দেখায়। শুধু তাই নয়, জাহাজ বিচিংয়ের পর কাটিংয়ের অনুমোদন পর্যন্ত সময় বেশি অতিবাহিত হয়। এতে ব্যাংকে সুদ বাড়তে থাকে।

বর্তমানে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমরা গ্রিন শিপ ইয়ার্ড। আর গ্রিন শিপ ইয়ার্ড হলে স্বাভাবিকভাবেই বৈশ্বিক অনেক শর্ত মেনে চলতে হয়। সে কারণে আমরা গ্রিন শিল্পের সুবিধা পেতে পারি। কিন্তু আমাদের রেড ক্যাটাগরি ভুক্ত করে এই শিল্পের প্রসারকে দমিয়ে রাখা হচ্ছে। আমরা গ্রিন ক্যাটাগরিতে যেতে চাই।

দেশ রূপান্তর : বর্তমানে কতটি গ্রিন শিপ ইয়ার্ড রয়েছে। বাকি ইয়ার্ডগুলোর অবস্থা কেমন?

জহিরুল ইসলাম রিংকু : বর্তমানে ৩০টি গ্রিন শিপ ইয়ার্ড রয়েছে। আমাদের আরো ৩৫ থেকে ৪০টি ইয়ার্ড রয়েছে; যেগুলোকে গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। একটি গ্রিন শিপ ইয়ার্ড গড়ে তুলতে কমপক্ষে ৭০ থেকে ১০০ কোটি টাকার প্রয়োজন হয়। বর্তমানে যে ৩০টি  গ্রিন শিপ ইয়ার্ড রয়েছে এদের সবাই নিজেদের টাকায় তা গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তর করেছে। কেউবা অন্য ব্যবসার টাকা এখানে বিনিয়োগ করে কিংবা নিজস্ব ব্যবসার প্রফিট না নিয়ে গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তর করেছে। কিন্তু যেসব ইয়ার্ড মালিক শুধু জাহাজভাঙার একক বিজনেস করেন তাদের পক্ষে তো ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তর করা সম্ভব নয়। তাই সরকারের কাছে আমরা কিছু ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা দেয়ার জন্য প্রস্তাবনা দিয়েছি। আশা করছি বাকি ইয়ার্ডগুলো গ্রিন ইয়ার্ডের আওতায় চলে এলে আবারো আগের অবস্থায় চাঙ্গা হবে জাহাজভাঙ্গা শিল্প।

দেশ রূপান্তর : বিশ্বজুড়ে শিপিং পলিসির কারণে অনেক জাহাজ চলাচল করতে পারবে না। উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত করতে হবে জাহাজগুলোতে। তখন অনেক জাহাজ কাটা পড়বে। সেই বাজার ধরতে আমরা কি প্রস্তুত?

জহিরুল ইসলাম রিংকু : আমাদের সবগুলো ইয়ার্ড সচল হয়ে গেলে বছরে ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টন পর্যন্ত লোহা কাটতে পারবো। বর্তমানে আমরা করছি ১০ থেকে ১২ লাখ টন। এজন্য আমরা আমাদের বাকি ইয়ার্ডগুলোকে গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তর করতে চাইছি। আমাদের যতো দেরি হবে আমাদের প্রতিযোগী দেশ ভারত তত এগিয়ে যাবে। গার্মেন্টস খাতের পর এই শিপ ব্রেকিং খাত সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করে। আমরা বিশ্বে জাহাজভাঙা শিল্পে আবারও শীর্ষস্থানে পৌছতে চাই। আগামী ১০ বছর পর বিশ^বাজারে আসা স্ক্র্যাপ জাহাজের বেশিরভাগ সংখ্যা আমরাই কাটতে চাই।

দেশ রূপান্তর : দেশের রডের বাজারের অন্যতম যোগানদাতা হিসেবে ধরা হয় জাহাজভাঙা শিল্পের লোহা। এছাড়া ইলেকট্রনিক্স ও ফার্নিচার উপাদানের অন্যতম ক্ষেত্র এই খাত। আগামীতে এসব খাত আরও বাড়বে?

জহিরুল ইসলাম রিংকু : একসময় দেশের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ রডের জোগান দিতো শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড। এখন তা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। অপরদিকে ফার্নিচার ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যের অন্যতম ক্ষেত্র শিপ ইয়ার্ডে আসা জাহাজগুলো। এসি ও ডিজেলচালিত জেনারেটরগুলোর চাহিদা যেমন রয়েছে তেমনিভাবে ফার্নিচারেরও বাজার আছে। আর এসব পণ্যের সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে ভাটিয়ারী ও সীতাকুন্ড এলাকায় একটি জোন গড়ে উঠেছে। শিপ ইয়ার্ডে জাহাজের সংখ্যা যত বাড়বে এসব পণ্যের জোগানও ততো বাড়বে। বর্তমানে এই শিল্পে প্রত্যক্ষভাবে ২৫ থেকে ৩০ হাজার লোক জড়িত থাকলেও পরোক্ষভাবে এই সংখ্যা প্রায় ৫ থেকে ৭ লাখ।

দেশ রূপান্তর : একসময় দুর্ঘটনায় অনেক শ্রমিক নিহতের খবর পাওয়া যেত। এখন শ্রমিকদের সুরক্ষায় কী কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?

জহিরুল ইসলাম রিংকু : জাহাজভাঙা শিল্পে আগের সেই দিন আর নেই। একসময় শিশু শ্রমিকসহ সুরক্ষা পোশাক ছাড়াই শ্রমিকরা ইয়ার্ডে কাজ করত। এখন আমাদের সব শ্রমিক প্রশিক্ষিত। ইয়ার্ডে কাজ করার আগে তাদেরকে ট্রেনিং দিয়ে দক্ষ করে কাজে নামানো হয়। শুধু দক্ষতা নয় সেক্টর ভিত্তিক দক্ষ শ্রমিকও আমরা তৈরি করছি। শিপ ইয়ার্ডে একজন শ্রমিকের সর্বনিম্ন বেতন এখন ১৮ হাজার টাকা। গড়ে একজন শ্রমিক প্রায় ২৫ হাজার টাকা মাসে বেতন পায়। শুধু শ্রমিকদের সুরক্ষা উপকরণ কিনতেই একটি ইয়ার্ডে খরচ হয় বছরে প্রায় এক কোটি টাকা। শ্রমিকরা চাকরিকালীন স্বাভাবিক মৃত্যুতেও ইন্সুরেন্স সুবিধা পাচ্ছে। অর্থাৎ শ্রমিকরা এখন অনেক সুরক্ষিত।

দেশ রূপান্তর : বলা হয়ে থাকে শিপ ইয়ার্ডে স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে এবং পরিবেশ দূষণ ঘটছে। বাস্তবে এর চিত্র কী?

জহিরুল ইসলাম রিংকু : আমরা বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ এনে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। তারা বিদেশিদের তত্ত্বাবধানে থেকে পরীক্ষায় পাস করে সার্টিফিকেট অর্জন করেছে। একটি জাহাজের মেডিকেল বর্জ্য ও রাসায়নিক বর্জ্য সংগ্রহে আমরা প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করেছি। একইসাথে এজবেস্টস কীভাবে সংরক্ষিত করতে হবে তা নিয়েও বিশেষভাবে দক্ষতা অর্জনকারী শ্রমিক রয়েছে। অপরদিকে বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নিয়মিত বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিয়ে আসছেন। তাই আগের সেই ইয়ার্ড চিত্র এখন আর নেই।