৫ কেজি চালের অপেক্ষায় ঝরল ৩ প্রাণ

প্রতিবেশীদের ৩০ টাকা কেজি দরে টিসিবির চাল কিনে আনতে দেখেছেন বিউটি বেগম। কিন্তু তার কখনো ওই লাইনে দাঁড়ানো হয়নি। স্বামী-স্ত্রী দুজনই কাজ করতেন, তবু সংসারের অভাব ঘোচেনি। অভাবের তাড়নায় প্রথমবারের মতো গত মঙ্গলবার লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু কে জানতো সেই প্রথমই হবে তার শেষ। চাল-ডালভর্তি ব্যাগ হাতে তার আর ঘরে ফেরা হলো না। মিরপুর কলেজের সীমানাপ্রাচীর ধসে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি।

গত মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মিরপুর-২ এ মিরপুর কলেজের সীমানাপ্রাচীর ধসের ঘটনায় মো. ফিরোজ ও নাসিমা বেগম নামে আরও দুজন প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের পরিবারেও শোকের মাতম। শিশু খুঁজছে তার বাবাকে। মেয়েকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন মা। হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন এ ঘটনায় আহত আরও ৯ জন। এত প্রাণহানির পরও ঘটনার দায় স্বীকার করেনি কেউ।

কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে, সীমানাপ্রাচীরের দায়িত্ব শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের। আর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর বলছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখে পরে জানানো হবে। অথচ ২০২২ সালেই দেয়াল সংস্কারে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। কিন্তু চার বছরেও কাজ না হওয়ায় অবহেলার বিষয়টি সামনে এলেও এখন পর্যন্ত হয়নি কোনো মামলা বা নেওয়া হয়নি আইনি ব্যবস্থা।

বিউটি বেগম ও নূর মোহাম্মদ দম্পতি মিরপুরের লাভ রোডে এক রুমের একটি টিনশেড কক্ষে ভাড়া থাকতেন। তাদের তিন ছেলে-মেয়ের আলাদা সংসার। বাসাবাড়িতে কাজ করে বিউটি বেগমের মাসে আয়ের ৫ হাজার টাকার প্রায় পুরোটাই খরচ হত বাসা ভাড়ায়। আর নূর মোহাম্মদের আয় থেকে রিকশার জমা পরিশোধের পর বাকি টাকায় চলতো তাদের সংসার।

নূর মোহাম্মদ বলেন, স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে মঙ্গলবার চাল-ডাল কিনতে আমিও দাঁড়িয়েছিলাম টিসিবির লাইনে। আলাদা লাইনে দাঁড়িয়ে দেখি লম্বা সিরিয়াল। তাই স্ত্রীকে যা পারো নিয়ে বাসায় যাওয়ার কথা বলে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। এর ঘণ্টাখানেক পর ফোনে জানতে পারি, সীমানাপ্রাচীর ধসে স্ত্রী আহত হয়ে পঙ্গু হাসপাতালে। পরে আইসিইউতে নেওয়া হয়। রাতে চিকিৎসক বিউটি বেগমের মৃত্যুর খবর জানান।

রাতেই মরদেহ নেওয়া হয় জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার গ্রামের বাড়িতে। গতকাল সেখানে দাফন সম্পন্ন হয়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে নূর মোহাম্মদ বলেন, আমরা গরিব মানুষ, কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব?

বাবাকে খুঁজছে ছোট্ট প্রিয়া : ‘মেয়ে দুইটা বাবার জন্য পাগল, মঙ্গলবার কাজে যাওয়ার সময় ছোট মেয়েটারে সঙ্গে নিছিলাম। দুপুরে বাসায় আইসাই বাবারে খুঁজতেছে। পাশের বাসার আন্টিরে জিগাইতেছে, বাবা বাসায় আইছিল? সুস্থ একটা মানুষ ঘর থাইকা বাইর হইল, ঘরে আর আইলো না।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন নিহত রিকশাচালক মো. ফিরোজের স্ত্রী শাহিদা আক্তার। নওগাঁর বাসিন্দা ফিরোজ স্ত্রী ও পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে প্রিয়াকে নিয়ে মিরপুরের শাহআলী বাগে ভাড়া থাকতেন। বড় মেয়ে ফিরোজা নানির কাছে গ্রামে থাকে। শাহিদা পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করেন একটি কোয়ার্টারে, আর ফিরোজ রিকশা চালাতেন। টিসিবির ট্রাক দেখলেই তিনি রিকশা থামিয়ে স্বল্পমূল্যে চাল-ডাল কিনতেন। মঙ্গলবারও রিকশা রেখে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। মুহূর্তেই সীমানাপ্রাচীর ধসে শেষ হয়ে যায় তার জীবন। ময়নাতদন্ত শেষে তার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলে দাফনের জন্য নেওয়া হয় গ্রামের বাড়ি নওগাঁয়।

খাবার বিরতিতে ৫ কেজি চাল আনতে গিয়ে প্রাণ হারান নাসিমা : মিরপুর-২-এর জনতা হাউজিংয়ে মেয়ে মনিরাকে নিয়ে ভাড়া থাকতেন নাসিমা বেগম। স্বামী হালিম তালুকদার ছয়-সাত মাস আগে কুয়েতে যান। স্থানীয় ইউসেপ মিরপুর টেকনিক্যাল স্কুলে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে মাসে ১৫ হাজার টাকা বেতনে কাজ করতেন নাসিমা। মঙ্গলবার দুপুরে স্কুলের কাজ শেষে খাবার বিরতির এক ঘণ্টা কাজে লাগাতে টিসিবির লাইনে দাঁড়ান। কিন্তু ৫ কেজি চাল নিয়ে তার আর ঘরে ফেরা হয়নি। সীমানাপ্রাচীর ধসে গুরুতর আহত হওয়ার পর হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। স্বজনরা মঙ্গলবার রাতেই মরদেহ নিয়ে যান বাগেরহাটে।

নাসিমার মামা শহিদুল ইসলাম জানান, নাসিমাকে নিজের ও মেয়ের খরচ মেটাতে হতো। পাশাপাশি সে তার মাকেও চালাত। ঘটনার দিন তার দোকান থেকেই একটি ব্যাগ নিয়ে টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন নাসিমা।

তিনি বলেন, নাসিমার বাবা হানিফ মৃধা রিকশা চালান। ঘটনার ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি এক যাত্রীকে ঘটনাস্থলের উল্টো পাশে নামিয়ে দেন। এ সময় দেয়ালধসের শব্দে হানিফের চোখ যায় সেদিকে। তখন দেখতে পান, তার মেয়েও সেখানে রয়েছে। গিয়ে দেখেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে তার মেয়ে। স্থানীয়দের সহায়তায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলেও তাকে বাঁচানো যায়নি।

টিন দিয়ে সাময়িক সীমানাপ্রাচীর : গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, ঘটনাস্থলে জমে থাকা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে পাশের একটি সড়কে রাখা হয়েছে। ধসে পড়া দেয়ালের অংশে টিন দিয়ে বাউন্ডারি দেওয়ার কাজ চলছে। বিপরীত পাশের ফুটপাতে একদল পুলিশ বসে তদারকি করছেন। পাশ দিয়ে যাওয়া লোকজন ঘটনাস্থলটি স্বজনদের দেখাচ্ছেন, কেউ কেউ ছবি তুলছেন।

দায় নিচ্ছে না কেউ : মিরপুর কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইফ্ফাত আজমী জানান, আমি জুন মাস থেকে দায়িত্বে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই মিটিংয়ে এক কর্মচারী সীমানাপ্রাচীর একটু হেলে পড়ার কথা জানালে মেরামতের জন্য জেলা পরিষদে আবেদন লেখা হলেও সেটি আর জমা দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, মঙ্গলবার এ ঘটনার পর নথিপত্র ঘেঁটে দেখতে পাই, দেয়াল, মূল ফটক ও অভ্যন্তরীণ কাঁচা সড়ক মেরামতে  ২০২১ সালে তৎকালীন অধ্যক্ষের শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালে অধিদপ্তর ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ ঘোষণা করে। কিন্তু এই চার বছরে কেন সংস্কার করা হয়নি তা জানা নেই।

দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির দায়ভার কার? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এর দায় শিক্ষা প্রকৌশলী অধিদপ্তরের। কলেজ কর্তৃপক্ষ, অধিদপ্তরে যেতে যেতে জুতার তলা ক্ষয় করে ফেলেছে। তারপরও তারা কাজ করায়নি। দুর্ঘটনার পর তারাই ত্বরিতগতিতে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে এবং টিন দিয়ে সাময়িক সীমানাপ্রাচীর করতে আমাদের অনুমতি চায়।

এ বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেন, ওই কলেজের সীমানাপ্রাচীরের জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, তা জানা নেই। বিষয়টি প্রথম শুনলেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, খোঁজ-খবর নিয়ে পরে বিস্তারিত জানাব।

তবে মর্মান্তিক এ ঘটনায় এখনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি পুলিশ। মিরপুর মডেল থানার ওসি বলেন, নিহতদের স্বজনরা ঢাকায় ফিরে মামলা করবেন। আর তারা মামলা না করলে ঊধ্বর্তনদের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।