কয়েকদিনের অস্ত্র বিরতির পর উপসাগরীয় অঞ্চলে আবার যুদ্ধের দামামা বাজছে। তবে সংঘাতের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি নিয়ে চলমান জটিলতাও আরও প্রকট হচ্ছে। সম্প্রতি হরমুজের ব্যবস্থাপনা ও টোল আদায় নিয়ে ইরানকে একটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছিল ওমান। এতে প্রণালিটি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে স্বেচ্ছা ফি নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। গতকাল বুধবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। তবে মাসকটের দেওয়া প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছে তেহরান।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি সংবাদমাধ্যমটিকে বলেছেন, ওমান যদি হরমুজের পুরো নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে না দেয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তারা এখন আর কোনো আলোচনায় অংশ নেবেন না। তিনি জানিয়েছেন, ওমান প্রণালিকে দুই ভাগ করার যে প্রস্তাব দিচ্ছে, সেখানে ইরানের নিরাপত্তার বিষয়টিকে দেখা হচ্ছে না। তবে ইরানি এ উপমন্ত্রী বলেছেন, ওমান যদি চায় হরমুজ প্রণালি থেকে যেসব জাহাজ বের হবে সেগুলো তাদের অংশ দিয়ে বের হতে পারে। কিন্তু হরমুজে প্রবেশের যে রুট নির্ধারিত আছে তার পুরো নিয়ন্ত্রণ ইরানের কাছেই থাকতে হবে। এর মধ্য দিয়ে ইরান স্পষ্টতই প্রাণালিটি নিজেদের একক নিয়ন্ত্রণে রাখার বার্তা দিল।
ইরান জানিয়েছে তারা ওমানের সঙ্গে মিলে প্রণালিটি যৌথভাবে পরিচালনা করতে চায়। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি ওমানকে প্রস্তাব দিয়েছেন প্রণালির একদিকের জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ ইরান করবে এবং অন্যদিকের আংশিক নিয়ন্ত্রণ করবে মাসকট। তবে ওমানের বর্তমান প্রস্তাবে বলা হয়েছে একটি অংশ পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে, আরেকটি অংশ ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ফলে হরমুজে ইরানের একক নিয়ন্ত্রণ থাকছে না এবং প্রস্তাবিত স্বেচ্ছা ফি হবে সম্পূর্ণ- ঐচ্ছিক। এশিয়ার মালাক্কা প্রণালিতে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর যেমন নৌ-চলাচল ও পরিবেশ রক্ষার জন্য স্বেচ্ছায় অনুদান নেয়, এটি অনেকটা সেই আদলে তৈরি। গত মঙ্গলবার গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ভিডিও কনফারেন্সে এই সংঘাত নিয়ে আলোচনা করেছেন; এর মধ্যে হরমুজ প্রণালির বিষয়টিও ছিল। উপসাগরীয় অঞ্চলের এক সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানায়, ওমানের প্রস্তাবটিতে আঞ্চলিক দেশগুলোর সমর্থন রয়েছে।
ওমানের এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট বাণিজিক অচলাবস্থা নিরসন করা। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই টোল বা ফি আদায়ের ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ, যা ইরানের নিয়ন্ত্রণ বা বিধিনিষেধমুক্ত থাকা উচিত। আলোচ্য কোনো চুক্তিতেই টোল বা ফি-এর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হবে না বলে তিনি নিশ্চিত করেন। হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনার এই পরিকল্পনা নিয়ে ওমান ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে গত সোমবার কথা বলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় আরাগচি পশ্চিম এশিয়ার স্থিতিশীলতা ফেরানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে হরমুজ প্রণালিতে তৈরি হওয়া নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে সহযোগিতা জোরদার ও যৌথ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপরে জোর দেন।
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ হতো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে হামলা চালানোর পর তেহরান এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয়। তবে যুদ্ধ বন্ধে গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের সমঝোতার পর প্রণালিটি আংশিক চালু হয়েছিল। তবে হরমুজ প্রণালিতে ইরান জাহাজে হামলা চালিয়েছে দাবি করে চলতি মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা শুরু করলে সমঝোতা চুক্তি ভেস্তে যায়। এতে আবারও হরমুজে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। বর্তমানে প্রণালিটির ব্যবস্থাপনা শান্তি আলোচনার অন্যতম প্রধান জটিল বিষয়ে পরিণত হয়েছে এবং এটি নতুন করে সংঘাত সৃষ্টির কারণ হয়ে উঠেছে।