রাজনীতির মঞ্চ থেকে জাতীয় অধ্যাপক

জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ্। জন্ম ১৯৪৫ সালের ৯ ডিসেম্বর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের তিতাহাজরা গ্রামে। তার পিতা শিক্ষাবিদ মরহুম হাবীব উল্লাহ্ ও মাতা মরহুমা ফয়জুন নিসা বেগম। তার সহধর্মিণী প্রয়াত মিসেস উম্মে সালমা। মাহবুব উল্লাহ্ জীবন বৈচিত্র্যময় ও বর্ণাঢ্য। কর্মজীবন সক্রিয় রাজনীতি থেকে অধ্যাপনা ও গবেষণা পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বরে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের বিপ্লবী নেতা। ১৯৭০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’র কর্মসূচি উত্থাপনের অপরাধে ইয়াহিয়ার সামরিক আদালতে কারাদন্ডে দন্ডিত হন।

মাহবুব উল্লাহ্ তার রাজনৈতিক জীবনে মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, জুলফিকার আলী ভুট্টো, আতাউর রহমান খান, হাজী মোহাম্মদ দানেশ, কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা, কমরেড আব্দুল হক, কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার, কমরেড দেবেন সিকদারের সান্নিধ্য লাভ করেছেন। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই ইংরেজি ও বাংলা সংবাদপত্রে লেখালেখি করে আসছেন। জাতীয়তাবাদী চিন্তাভবানার আর্থ-সামাজিক, ঐতিহাসিক ও দার্শনিক ভিত্তি এবং অর্থনীতি ও রাজনীতির নানা প্রসঙ্গ তার লেখালেখির মূল উপজীব্য।

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ্ রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল কলেজে থাকাবস্থায়। তখন তিনি ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। আত্মজীবনী আমার জীবন আমার সংগ্রাম গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, ‘১৯৬২ থেকে রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে আমি জড়িয়ে পড়ি। ১৯৬২ সালের কোনো একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন একটি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে। সভায় বিভিন্ন কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্ররা যোগদান করেন। এই সভার উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে মরহুম ফজলুল কাদের চৌধুরী গণতান্ত্রিক রীতিনীতি না মেনে যে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেছিলেন তার প্রতিবাদ করা। তিনি সেই সময় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী ছিলেন।’

এরপর জড়িয়ে পড়েন শিক্ষা আন্দোলনে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের আমলে শিক্ষার সংস্কারে গঠিত শরীফ কমিশন শিক্ষার প্রশ্নে বেশ কিছু গণবিরোধী প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিল। এর প্রতিবাদে শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন। আমার জীবন আমার সংগ্রাম গ্রন্থে মাহবুব উল্লাহ্ লিখেছেন, ‘প্রথম দিকে এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ কলেজ ও নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে। ঢাকা কলেজে এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলাম আমি।’

উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম একজন মাহবুব উল্লাহ্। ওই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনএসএফ নেতা পাসপার্তু হত্যার অভিযোগে দীর্ঘদিন ঢাকার বাইরে আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। গণঅভ্যুত্থানের পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে এর কিছুদিন আগে গোপনে ঢাকায় আসেন। এ প্রসঙ্গে আমার জীবন আমার সংগ্রাম গ্রন্থে মাহবুব উল্লাহ্ লিখেছেন, ‘২৪ জানুয়ারি পল্টন ময়দান বেলা ১১টা নাগাদ বিপুল জনসমাগমে ভরে উঠল। এর আগেই আমি আমার বাসস্থান পরিবর্তন করে গোপীবাগে চলে যাই। সেখানে সম্ভবত আমি কবি শহীদ কাদরির বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলাম। এই আশ্রয়স্থলটি আমার কর্মীরা খুঁজে বের করেছিল। ২৪ জানুয়ারি আমাদের কর্মীরা বেলা ১১টার দিকে আমাকে পল্টন ময়দানের জমায়েতস্থলে নিয়ে যেতে এসেছিল। তারা বলল, মামলা-মোকদ্দমা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এখন অকেজো হয়ে গেছে। শিগগির তৈরি হয়ে চলুন পল্টন ময়দানে। আমি ১০ মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে গেলাম এবং হেঁটে পল্টন ময়দানের দিকে অগ্রসর হলাম। পল্টন ময়দানে পৌঁছে দেখি, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্য নেতারা একটি বেঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে ক্রুদ্ধ জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন।’

উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন মাহবুব উল্লাহ্। পল্টন ময়দানে মতিউরের জানাজা শেষে ছাত্র নেতৃবৃন্দ জনতাকে মিছিলে যোগদানের আহ্বান জানালেন। মিছিল তৎকালীন ইকবাল হলের (সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) দিকে অগ্রসর হয়। মিছিলের অগ্রভাগে মাহবুব উল্লাহ্ একাই ছিলেন। জাতীয় মিউজিয়াম থেকে প্রকাশিত একটি ছবির অ্যালবামে দেখা যায়, তার অবস্থান ছিল মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের ৭-৮ ফিট সামনে।

স্বাধীন পূর্ব বাংলার দাবিতে কারাবরণ করা প্রথম বাংলাদেশি হলেন মাহবুব উল্লাহ্। আমার জীবন আমার সংগ্রাম গ্রন্থে তিনি বলেন, ‘উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার প্রশ্নটি সামনে চলে আসে। তখন তরুণদের একটি বড় অংশ নিজের দেশ নিয়ে যে স্বপ্ন দেখত তা হলো, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন। কিন্তু মওলনা ভাসানী ছাড়া দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে স্বাধীনতার প্রশ্নটি উচ্চারিত হতো না।’ তখন মাহবুব উল্লাহ্্ প্রস্তাব অনুযায়ী ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপ স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার কর্মসূচি উত্থাপনের জন্য ১৯৭০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে জনসভার ডাক দেয়। সেখানে স্বাধীন পূর্ব বাংলার দাবিতে তিনি বলেছেন, ‘আজ থেকে শুরু হলো এক নতুন যুদ্ধ। এই যুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে। পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের রাষ্ট্রীয় বন্ধন ছিন্ন করা হবে।’ রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্যের জন্য পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। সামরিক আদালতে তার সাজা হয়। কিন্তু কারাদ-ের মেয়াদ শেষ হলেও তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি রাষ্ট্রীয় নির্দেশে। তিনি ১৯৭০ সালের ২১ মার্চ থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত কারারুদ্ধ ছিলেন এবং মুক্তি পান ১৭ ডিসেম্বর।

মাহবুব উল্লাহ্ ১৯৭২ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন পুনর্গঠিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সম্পাদকম-লীর সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সময় তিনি মওলানা ভাসানীসহ দেশজুড়ে রাজনৈতিক সভা-সেমিনার করে বেড়িয়েছেন। একপর্যায়ে তিনি রাজনীতি ছাড়ার মনোস্থির করেন। এর কারণ ছিল ওই সময় ১৯৭৪ সালে তার দ্বিতীয় কন্যা খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন তিনি প্রায় কপর্দকশূন্য ছিলেন। তার চিকিৎসার খরচ বহন করা তার জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল। কারণ দেশে তখন বাকশালী শাসন চলছিল। ওই সময় ভিন্ন মতাদর্শীদের অবস্থা ছিল খুবই কোণঠাসা। এই ঘটনা তাকে খুব প্রভাবিত করেছিল। পঁচাত্তরের পট-পরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর তিনি স্বয়ং দরখাস্তের ফরম নিয়ে ঢাকায় মাহবুব উল্লাহ্র সঙ্গে যোগাযোগ করেন। চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিকে বিদায় জানান।

১৯৭৬ সাল থেকে ২০০৬ পর্যন্ত মাহবুব উল্লাহ্্ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান ও প্রফেসর ছিলেন। তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রো-ভিসি ছিলেন। এ ছাড়া তিনি রাজস্ব সংস্কার কমিশনের সদস্য, সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও উচ্চ শিক্ষাসংক্রান্ত স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অর্থনীতিতে পিএইচডি প্রফেসর মাহবুব উল্লাহ্ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় ও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করেছেন।

এ ছাড়া তিনি কানাডার ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার, ডেনমার্কের সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ, নেপালের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, ইউনাইটেড ন্যাশনস ইউনিভার্সিটি, চীনের সাংহাই একাডেমি অব সোশ্যাল সায়েন্স ও ডেনমার্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত গবেষণা কর্মকান্ডে নিয়োজিত থেকেছেন। তার অন্যতম গবেষণা গ্রন্থ খধহফ খরাবষরযড়ড়ফ ধহফ ঈযধহমব রহ জঁৎধষ ইধহমষধফবংয গবেষক মহলে সমাদৃত হয়েছে। এ ছাড়া তার ১৫টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।