বাংলাদেশে আমরা আর ফ্যাসিবাদ দেখতে চাই না...

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩২ এএম

জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ্। একাধারে তিনি অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ। রাজনীতির মঞ্চ থেকে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। চার দশকের বেশি অধ্যাপনায় নিয়োজিত ছিলেন। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উত্তরকালের নানা বিষয়ে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এস এম নূরুন নবী

দেশ রূপান্তর : আগামী ডিসেম্বরে আপনি ৮২ বছরে পা দেবেন। শারীরিক কেমন বোধ করছেন?

মাহবুব উল্লাহ্ : ভালোই আছি। তবে এ বয়সে কিছু সমস্যা তো থাকবেই। তারপরও আল্লাহর কাছে শুকরিয়া তিনি আমাকে অনেকের চেয়ে ভালো রেখেছেন।

দেশ রূপান্তর : পাকিস্তান শাসনামলে সামরিক আদালতে আপনার কারাদ- হয়। সেই থেকে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় কারাবন্দি ছিলেন।  এ বিষয়ে জানতে চাই।

মাহবুব উল্লাহ্ : আমার জন্ম হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিকে। পাকিস্তান আমলে আমি ভাষা আন্দোলন দেখেছি। পরবর্তীতে ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান দেখা এবং এতে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। ১৯৭০-এর ২২ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার কর্মসূচি উত্থাপন করায় সামরিক আদালতে আমার বিচার হয় এবং আমাকে সশ্রম কারাদ- ও ১৫ বেত্রদ- দেওয়া হয়। জনগণের প্রতিবাদের মুখে বেত্রদ- প্রত্যাহার করা হয়। তবে আমি ’৭০ সালের বেশি অংশ এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলাম। কারারুদ্ধ অবস্থায় অনেক বিপজ্জনক মুহূর্ত আমার কেটেছে। কিন্তু ভালো লাগত কারাগারে বসে সিপাহি-শ্রান্তিদের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের খবর পেতে। পাকিস্তান আমলের রাজনীতিতে অনেক মতপার্থক্য ছিল, কিন্তু একে-অপরকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার রাজনীতি তখন ছিল না। পূর্ব বাংলার মানুষের বঞ্চনা জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের পথে নিয়ে যায়। বাংলাদেশ উত্তরকালে অনেক চড়াই-উৎরাই দেখেছি। দুজন প্রেসিডেন্ট নিহত হয়েছেন। পাকিস্তান আমলে খুন-খারাবির রাজনীতি ছিল না। বাংলাদেশ উত্তরকালে এ ধরনের রাজনীতির চর্চা শুরু হয়। তবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় যে গণহত্যা হয়েছে তা বাংলাদেশের জনগণের মানসলোকে গভীরভাবে রেখাপাত করেছে। যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রক্তপাতের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মন-মেজাজে পরিবর্তন এসেছে। এখন দরকার এমন এক নেতৃত্ব, যে নেতৃত্ব বাংলাদেশের মানুষকে একটি সুখী-সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ সৃষ্টিতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। বাংলাদেশে আমরা আর ফ্যাসিবাদ দেখতে চাই না। এ দেশের মানুষকে গণতন্ত্র ও সমতামূলক সমাজব্যবস্থায় বাস করার সুযোগ দিতে হবে।

দেশ রূপান্তর : প্রায় ৩০ বছর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পর আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। এর কারণ কী?

মাহবুব উল্লাহ্ : আমি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আহ্বানে এবং প্রফেসর আবুল ফজলের উদ্যোগে ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিই। আমি নিষ্ঠার সঙ্গে অধ্যাপনা ও গবেষণার কাজে ব্রতী হই। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগকে গড়ে তুলতে আমার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের ডিন নির্বাচিত হয়েছিলাম। ২০০৬ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে যোগ দিই। এই বিভাগ থেকেই ২০১১ সালে অবসর গ্রহণ করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর জাতীয় জীবনে অধিকতর সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হই। এই কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিই। তবে শেখ হাসিনার শাসনামলে অনেক ন্যায্য প্রাপ্যতা থেকে আমাকে বঞ্চিত করা হয়। এর জন্য কারও বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই।

দেশ রূপান্তর : আপনি যুক্তরাষ্ট্রে মাস্টার্স করেছেন। সেখানে পিএইচডি ডিগ্রিও করার কথা ছিল। কিš‘ শেষ মুহূর্তে দেশে ফিরে আসেন। এর কারণ কী?

মাহবুব উল্লাহ্ : আমি যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন অর্থনীতিতে মাস্টার্স করেছি। সেখানে থাকা অবস্থায় ১৩টি পূর্ণ কোর্স করেছি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়ার্ল্ড ফুড সিস্টেমের ওপরও একটি কোর্স করেছি। এই কোর্সের শিক্ষক ছিলেন প্রফেসর পিটার টিমার। বোস্টনে বেশ কয়েকজন নামকরা অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন। এদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ছিলেন প্রফেসর রোজেনস্টাইন রোডান। তার ‘বিগ পুশ’ থিওরির কথা অর্থনীতির ছাত্রদের বহুল পরিচিত। তার কোর্সে আমি এ+ পেয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মানুসারে ‘এ’র ওপর কোনো গ্রেড হয় না। শুধু বিশেষ ক্ষেত্রেই প্রফেসর সন্তুষ্ট হয়ে এমন গ্রেড দিতে পারেন। এর ভিত্তিতে একটি প্রশংসাপত্রও দেওয়া হয়। এই প্রশংসাপত্রে প্রফেসর রোডান আমার সম্পর্কে লিখেছেন, ‘এমন ছাত্র তিন বছরে একজন পাওয়া যায়।’ ভেবেছিলাম, বোস্টনেই পিএইচডিটা শেষ করব। সেজন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যে শর্তে মাস্টার্স করার জন্য আমাকে স্কলারশিপ দেওয়া হয়েছিল, সেই শর্তের কারণে সেখানে পিএইচডি না করে আমি দেশে ফিরে আসি এবং সেই সময়ের স্টাডি লিভের নিয়মানুযায়ী ৫ বছর পর ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং প্রয়াত প্রফেসর কৃষ্ণা ভরদ্বাজের সুপারভিশনে আমি পিএইচডি শেষ করি। আমার থিসিসটি প্রকাশনা সংস্থা ইউপিএল প্রকাশ করেছে। এই গ্রন্থটি দেশে-বিদেশে সমাদৃত হয়েছে। বিশেষ করে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের সোয়াসে এর ফলো-আপ হিসেবে আরও থিসিস রচিত হয়।

দেশ রূপান্তর : আপনি রাষ্ট্রপতি হতে পারেন বলে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে। এর মধ্যেই সরকার আপনাকে সম্প্রতি জাতীয় অধ্যাপক পদে নিয়োগ দিয়েছে। এ নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?

মাহবুব উল্লাহ্ : আমাকে রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে বলে মিডিয়াতে কিছু আলোচনা দেখেছি। তবে আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না এবং এর জন্য আমার বাড়তি কোনো উৎসাহ নেই। সরকার আমাকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। অধ্যাপক পদে এটা সর্বোচ্চ অবস্থান। আমি এতে আনন্দিত এবং যারা আমার নিয়োগটি বিবেচনা করেছেন তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে বাংলাদেশের অনেক গুণীজন জ্ঞানের রাজ্যে অবদান রেখেছেন। তারা সবাই ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় একাডেমিশিয়ান। তাদের কাতারে আমি নিজেকে দেখতে পেয়ে অভিভূত।

দেশ রূপান্তর : জাতীয় অধ্যাপক নিয়োগের প্রজ্ঞাপনে বলা আছে, আপনি গবেষণা কাজে নিয়োজিত থাকবেন। এ নিয়ে আপনার ভাবনা জানতে চাই।

মাহবুব উল্লাহ্ : আমি ইতিমধ্যে গত দেড়শ বছরে গ্রাম-বাংলার রূপান্তর নিয়ে একটি গবেষণাকাজ শুরু করেছি। এ ছাড়া ব্রিটিশ ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতিবিদ ডেভিড রিকার্ডোর ঞযব চৎরহপরঢ়ষবং ড়ভ চড়ষরঃরপধষ ঊপড়হড়সু ধহফ ঞধীধঃরড়হ গ্রন্থটির বাংলায় অনুবাদ করছি। এ ছাড়া বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের জন্য ব্যাংকিং এথিকসের ওপর একটি স্মারক বক্তৃতার জন্য পা-ুলিপি প্রস্তুতের কাজে নিয়োজিত আছি।

দেশ রূপান্তর : ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসে। নতুন বাংলাদেশ নিয়ে আপনার আকাক্সক্ষা জানতে চাই।

মাহবুব উল্লাহ্ : চব্বিশের মহান গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশকে আমি দেখতে চাই একটি গণতান্ত্রিক অংশীদারত্বমূলক এবং সাম্যভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে। আমি চাই না এ দেশে আবার কোনো ফ্যাসিবাদী শাসকের উত্থান ঘটুক। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সচেতনতা। বাংলাদেশে এতকাল যে রাজনৈতিক বয়ান প্রাধান্য বিস্তার করেছিল, সেই বয়ান ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে। দেশটাকে ব্যক্তিবিশেষের সম্পত্তিতে পরিণত করা হয়েছে। দেশের তাবৎ প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। অথবা অকার্যকর হয়ে গেছে। তাই প্রয়োজন দেখা দিয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার। এই সংস্কার সাধন না করতে পারলে রাষ্ট্রটি ভঙ্গুর হয়ে থাকবে। আমি চাই, প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশ শৌর্যবীর্যে, সার্বভৌম অধিকার প্রয়োগে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে একটি আদর্শ রাষ্ট্রে পরিণত হোক।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো শিক্ষাব্যবস্থা ধসে পড়েছে। শিক্ষার গুণগত মানের চরম অবনতি ঘটেছে। দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানে সৎ ও ভালো শিক্ষক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠেছে। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। জ্ঞানী, সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেই এই সংকটের অবসান হতে পারে। তবে যেভাবে মানহীন শিক্ষক দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভরে ফেলা হয়েছে, তাতে করে পরিস্থিতির উন্নতি খুব সহজে হবে না। আগামী ৩০ থেকে ৪০ বছরে এই মানহীন শিক্ষকদের বোঝা আমাদের বয়ে বেড়াতে হবে। ততদিনে শিক্ষাব্যবস্থার চরমতর অবনতি ঘটবে। তাই চাইলেই ভালো শিক্ষকদের নিয়োগ দিয়েও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান উন্নয়নের কাজটি সহজসাধ্য নয়।

দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।

মাহবুব উল্লাহ্ : আপনাদেরও ধন্যবাদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত