বিদ্যুৎ বিতরণের মুনাফায় বেসরকারি চোখ

লাভজনক সরকারি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণায় নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জনগণের করের টাকায় গড়ে ওঠা বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার উদ্যোগে বাড়ছে উদ্বেগ। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এতে বিদ্যুতের দাম বাড়তে পারে। অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে লাখো বিদ্যুৎকর্মীর ভবিষ্যৎ।

গত সপ্তাহে বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ খাত বেসরকারিকরণের কথা বলেছেন। মন্ত্রীর বক্তব্যের পর বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে। দেশের ছয়টি সরকারি বিতরণ প্রতিষ্ঠান পাঁচ কোটির বেশি গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে। এর মধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখ গ্রাহক রয়েছেন লাইফলাইনে অর্থাৎ সমাজের একেবারে প্রান্ত বিন্দুতে। এসব গ্রাহকের জীবনমান উন্নয়নে সরকার ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হলে এই ভর্তুকির কী হবে সে বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। একইভাবে কৃষি সেচ বিদ্যুতেও সরকার ভর্তুকি দিয়ে থাকে। দেশের খাদ্য উৎপাদন খরচ সীমিত রাখতে কম দামে এই বিদ্যুৎ দেওয়া হয়। বেসরকারি কোম্পানির হাতে বিতরণ ছাড়লে কে ভর্তুকি দেবে, তাহলে কি দাম বাড়াতে হবে? এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। বিতরণ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে সারা দেশে কয়েক লাখ বিদ্যুৎকর্মী কাজ করেন। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছাড়লে তাদের কী হবে, তাও নিশ্চিত নয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন দেশের প্রায় শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সরবরাহের আওতায় রয়েছে। অর্থাৎ সব এলাকায় সরকারি বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো রয়েছে। এক-দুই দিনে নয়, প্রায় ৫০ বছর ধরে একটু একটু করে দেশের বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয়েছে। লাখ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে বিতরণ লাইন, সাবস্টেশন, গ্রাহকের আঙ্গিনার ট্রান্সফরমারসহ বিদ্যুৎ অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। সরকারি মালিকানার বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো এবং ব্যবস্থাপনা থাকার পরও বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার এই পরিকল্পনার বিষয়ে কোনো রূপরেখাও প্রকাশ করেনি। ফলে কী প্রক্রিয়ায় দেশের কোন অঞ্চল বেসরকারি বিদ্যুৎ বিতরণের আওতায় যাবে তা স্পষ্ট নয়।

এ বিষয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য ছাড়া আনুষ্ঠানিক কোনো কাজ শুরুর খবর জানাতে পারেননি বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বশীল কেউ। দুটি বিতরণ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) শীর্ষ এক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, তারা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। অন্যদের মতো তারাও সংবাদ মাধ্যমে মন্ত্রীর বক্তব্য শুনেছেন। তবে পিডিবির টেকনিক্যাল এবং ননটেকনিক্যাল কর্মকর্তাদের হোয়াটসঅ্যাপ এবং ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে বিষয়টি ব্যাপক চর্চার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার উদ্যোগ হিসেবে বেসরকারিকরণের বন্দোবস্ত করলে তারা এই উদ্যোগ রুখে দেবে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে পিডিবির হাত থেকে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা এবং সিলেট অঞ্চল নিয়ে পৃথক সরকারি কোম্পানি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু পিডিবির কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা প্রতিবাদমুখর হলে সরকার শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়।

যদিও প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিল্লি, মুম্বাই এবং পশ্চিমবঙ্গের একাংশে বেসরকারি কোম্পানি বিদ্যুৎ বিতরণ করে। টাটা এবং আদানির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিদ্যুৎ বিতরণ করে থাকে।

দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ কীভাবে হয় : দেশের উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় সবটাই কিনে নেয় পিডিবি। এরপর এই বিদ্যুৎ বিতরণকারীদের কাছে বিক্রি করে পিডিবি। বিতরণকারী কোম্পানি গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে বিল আদায় করে। এটি একটি চক্রাকার আবর্তন। এই আবর্তণে বিতরণ কোম্পানি এবং পিডিবির মধ্যে খুব একটা সমস্যা হয় না। বিদ্যুতের উৎপাদন পর্যায়ে সরকার যে ভর্তুকি দেয় তা সময়মতো পরিশোধ না করাকে কেন্দ্র করেই সব জটিলতা তৈরি হয়। বেসরকারি উদ্যোক্তারা বিল এবং জ্বালানির দাম না পাওয়ায় কেন্দ্র চালাতে পারে না। একইভাবে পিডিবিও ব্যয় সাশ্রয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখে, এতেই লোডশেডিং হয়। বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা বলছেন, লোডশেডিংয়ের দায় তাদের নয়। উৎপাদনের সঙ্গে তারা সম্পৃক্তই নয়। আর বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলে তারা এটি পরিবর্তনও করতে পারবে না।

দেশের রাজশাহী ও রংপুরের শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণ করে নর্দান ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো), খুলনা এবং বরিশালের ২১ জেলায় ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউট কোম্পানি (ওজোপাডিকো), ঢাকায় ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো), ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)। এ ছাড়া সিলেট, কুমিল্লা এবং চট্টগ্রাম এলাকায় পিডিবি বিদ্যুৎ বিতরণ করে। সারা দেশের গ্রামীণ জনপদে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ৪৬২টি উপজেলায় বিদ্যুৎ বিতরণ করে। এদের কোনো প্রতিষ্ঠান লোকসান করে না। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দাম বৃদ্ধির সময় বিতরণ প্রতিষ্ঠানকে লাভ লোকসানের সমতা বিন্দুতে (ব্রেক ইভেনে) চলার মতো একটি দাম ঠিক করে দেয়। কিন্তু এরপরও বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলো লাভ করে থাকে। উল্টো বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যে দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করে তার ওপর প্রতি ইউনিটে সরকারকে এক শতাংশ কর দিতে হয়। এর বাইরে সরকার ভোক্তার কাছ থেকে আরও ৫ শতাংশ ভ্যাট আদায় করে।

দেশের সবখানে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা রয়েছে : প্রায় শতভাগ মানুষের ঘরে এখন গ্রিডের বিদ্যুৎ রয়েছে। দেশের সব থেকে বড় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা আরইবি। ৪৬২ উপজেলায় আরইবির সব মিলিয়ে ৬ লাখ ১১ হাজার কিলোমিটার বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন রয়েছে। রয়েছে ১ হাজার ৩০৬টি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র। এভাবে প্রত্যেকটি বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার কিলোমিটার বিতরণ লাইন এবং শত শত উপকেন্দ্র রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে এই বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

গরিব কৃষক কি করপোরেট কালচারে অভ্যস্ত হতে পারবে : দেশের গ্রামীণ জনপদে বিদ্যুৎ বিতরণের প্রথমেই চিন্তা করা হয় দরিদ্র সাধারণ মানুষ তার বিদ্যুৎ সংযোগের আবেদনটি যেন অফিসে নিয়ে আসতে পারেন তেমন আবহ তৈরি করা। এজন্য আরইবির বিতরণ ইউনিটগুলোর নাম সমিতি রাখা হয়েছে। বহুবার এই প্রক্রিয়াকে ভেঙে করপোরেট কালচারে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও সরকার এই আহ্বানে সাড়া দেয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, একবার করপোরেট কালচার চালু হলে গ্রামের সাধারণ মানুষ এদের ভয় পাবে। সে নিজের বিদ্যুৎ সংযোগের আবেদনটি নিয়ে আসতে ভয় পাবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ কেবল ব্যবসায়িক পণ্য নয়, এক ধরনের সেবা, যা মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করে। কোনো মানুষ যদি এটি পাওয়ার ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের ভয় পায় সেক্ষেত্রে জীবনমান উন্নয়নের রাষ্ট্রীয় যে দর্শন তা ব্যর্থ হবে। এখন সেই প্রথা ভেঙে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে সব চলে গেলে উন্নয়ন দর্শন থেকে সরে আসা হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

কেউ কেন কিছু জানে না : বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা বেসরকারিকরণ কোনো ছোটখোটো উদ্যোগ নয়। এমন উদ্যোগ নিয়ে সরকার কাজ শুরু করলে এটি সবার জানার কথা। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের দুজন অতিরিক্ত সচিবের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তারা এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না। অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) নূর আহমেদ এবং অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) সবুর হোসেন দুজনেই জানান, তারা এমন কোনো উদ্যোগের কথা শোনেনওনি। বিতরণ কোম্পানি নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান জানান, তিনি বিষয়টি গণমাধ্যমে দেখেছেন। তবে সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সরকারি কর্মচারী হিসেবে তিনি তা পালন করতে বাধ্য। বিষয়টি আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক কোনোভাবেই না জানার কথা জানান ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম আহমেদ, এনডিসি, পিএসসি। পিডিবির সদস্য উৎপাদন মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, তিনিও এসব বিষয়ে কিছুই শোনেননি। তবে সরকার তাদের কাছে আনুষ্ঠানিক মতামত চাইলে তারা তা পাঠাবেন। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা : জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘আমি মনে করি সরকার এতটা অবিবেচক সিদ্ধান্ত নেবে না। এ ধরনের সর্বনাশা সিদ্ধান্ত থেকে শেষ পর্যন্ত সরে আসবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকার নানা ধরনের স্বার্থ-সংঘাত নিয়ে চলছে। কৌশলগত কারণে এ ধরনের ঘোষণা দিতে পারে। কীভাবে এ খাতকে রক্ষা করা সম্ভব সেই উদ্যোগ বাদ দিয়ে ব্যবসা বানানোর চিন্তা বন্ধ করতে হবে।’

পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, ‘সালমান এফ রহমান, আজিজ খানরা গত সরকারের সময় বেড়ে উঠেছিল। এই সরকার তাদের মতো কাউকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি করতে চাইছে কি না আমাদের দেখতে হবে। উন্নত দেশে বিশ্বে সিস্টেম লস ৩ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে থাকে। আমাদের এখানে তা ১২ শতাংশ। সরকারকে অনুরোধ করব বিতরণ খাতে দক্ষতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের দায়িত্ব এটাই। জনগণের ঘাড় মটকে পয়সা আদায়ের চিন্তা বন্ধ করতে হবে।’