প্রকল্পে অগ্রগতির পরও উন্নতি নেই তাঁতিদের

তাঁতিদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে সরকার গত ৭ বছরে ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয় করলেও এ খাতের পেশাজীবীদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন বা উন্নতি হয়নি। ‘তাঁতিদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে চলতি মূলধন সরবরাহ ও তাঁতের আধুনিকায়ন’ প্রকল্পের আওতায় এসব টাকা ব্যয় করা হয়। দেশের ৫৯টি জেলার ৩০৫টি উপজেলায় তাঁতিদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, আয় বৃদ্ধি, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং নারী তাঁতিদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্য ছিল প্রকল্পটির।

প্রকল্পের আওতায় ৩২ হাজার ২৭৮টি তাঁতের বিপরীতে তাঁতিদের ঋণ বিতরণ, ৬০৬টি তাঁত আধুনিকায়ন, ২০ জন তাঁত কারখানার মালিক ও উদ্যোক্তাকে ঋণ সুবিধার আওতায় আনা এবং ৪ হাজার ৬৭২ তাঁতিকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ ছাড়া ১০১ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।

সম্প্রতি প্রকল্পটির সার্বিক বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তবে আইএমইডির প্রতিবেদনের তথ্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন প্রকল্প পরিচালক রতন চন্দ্র সাহা।

জানা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ২ কোটি মিটার কাপড়ের উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রায় দেড় লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জাতীয় অর্থনীতিতে প্রায় ১০০ কোটি টাকার মূল্য সংযোজন হবে বলে প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের মাধ্যমে তাঁতিদের সহজ শর্তে ঋণ সরবরাহ লক্ষ্য থাকলেও ৬৯ দশমিক ৮ শতাংশ তাঁতি প্রয়োজনীয় ঋণ সময়মতো পান না। আবেদন করার পর ঋণ পেতে ৬ থেকে ৮ মাস বা তারও বেশি সময় লাগে। পাশাপাশি সুবিধাভোগী তাঁতি নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট সমিতির সভাপতি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও পাওয়া গেছে।

সমীক্ষায় প্রকল্পের ছয়টি ক্রয় প্যাকেজ পর্যালোচনা করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫৮ কোটি টাকার প্রকল্পে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৯৭ শতাংশ। অর্থ ব্যয় হলেও দেশের তাঁতিদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশ তাঁতি উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। প্রায় ২০ শতাংশ তাঁত বন্ধ বা আংশিক অচল অবস্থায় রয়েছে। মাঠপর্যায়ে রয়েছে ঋণ বিতরণে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ। ফলে ৬৯ দশমিক ৮ শতাংশ তাঁতি সময়মতো প্রয়োজনীয় অর্থ না পেয়ে উচ্চ সুদে বিকল্প উৎস থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

প্রকল্পের এসব অনিয়ম, দুর্বলতা ও বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে আইএমইডি নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড বাস্তবায়িত ‘তাঁতিদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে চলতি মূলধন সরবরাহ ও তাঁতের আধুনিকায়ন (২য় সংশোধিত)’ প্রকল্পের ওপর এ সমীক্ষা পরিচালনা করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উন্নয়ন ধারা’।

আইএমইডির সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রকল্প আওতায় ৭৯ দশমিক ৬ শতাংশ তাঁত সচল থাকলেও ৫ দশমিক ২ শতাংশ পুরোপুরি বন্ধ এবং আরও ১৫ দশমিক ২ শতাংশ আংশিক অকার্যকর। অর্থাৎ প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তাঁতই উৎপাদনের বাইরে রয়েছে। নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ, দক্ষ শ্রমিক সংকট এবং অভিজ্ঞ কারিগরদের অন্য পেশায় চলে যাওয়ায় উৎপাদন ও পণ্যের মান উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সহজ শর্তে চলতি মূলধন সরবরাহ। কিন্তু আইএমইডি তথ্যমতে, ৬৯ দশমিক ৮ শতাংশ তাঁতি প্রয়োজনীয় ঋণ সময়মতো পান না। আবেদন করার পর ঋণ পেতে সাধারণত ৬ থেকে ৮ মাস, অনেক ক্ষেত্রে এক বছরেরও বেশি সময় লাগে। অথচ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের ঋণ ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যেই পাওয়া যায়। পাশাপাশি সুবিধাভোগী নির্বাচনে সমিতির সভাপতি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও পাওয়া গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকৃত তাঁতি নন, এমন ব্যক্তিরাও ঋণ পেয়েছেন। বেসিক সেন্টারের কর্মকর্তাদের মতে, মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রকৃত তাঁতি সঠিকভাবে নির্বাচিত হয়েছেন।

আইএমইডির সমীক্ষায় দেখা যায়, ৮৫ দশমিক ৬ শতাংশ তাঁতি সুতা ও রঙের মূল্যবৃদ্ধিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পাশাপাশি ৫৯ দশমিক ৯ শতাংশ তাঁতি দক্ষ শ্রমিক ও কারিগরের সংকটের কথা জানিয়েছেন। অধিকাংশ তাঁতি এখনো আধুনিক প্রযুক্তি, নকশা উন্নয়ন ও বাজার ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ পাননি। জরিপে অংশ নেওয়া ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশ তাঁতি জানিয়েছেন, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য তারা পান না। বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীর আধিপত্য, চাহিদার অস্থিরতা এবং উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের অসামঞ্জস্যের কারণে প্রায় ১০ শতাংশ তাঁতি নিয়মিত লোকসানে রয়েছেন। ৩৭ শতাংশ তাঁতি খুবই সীমিত আয়ে জীবনযাপন করছেন।

সমীক্ষায় প্রকল্পের ছয়টি ক্রয় প্যাকেজ পর্যালোচনা করা হয়। এতে সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ করা হলেও আসবাবপত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়ে। নথিপত্রে ৩৯ লাখ ৮২ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩৪৩টি আসবাবপত্র কেনার তথ্য থাকলেও মাঠপর্যায়ে সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

আইএমইডি বলছে, প্রকল্পটির মাধ্যমে কম সুদে ঋণ, মাঠপর্যায়ের তদারকি ও সমিতিভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলার ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও দুর্বল পরিবীক্ষণ, অপর্যাপ্ত ঋণ, জনবল সংকট, প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল সুবিধার অভাব প্রকল্পের কার্যকারিতা সীমিত করছে। একই সঙ্গে কাঁচামালের মূল্য অস্থিতিশীলতা, মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব, উচ্চ সুদের ঋণ, দক্ষ জনবলের সংকট এবং বাজার সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধতাকে তাঁত খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের প্রধান ঝুঁকি।

আইএমইডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, তাঁত খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে তাঁতিদের সক্ষমতা অনুযায়ী ঋণের সীমা নির্ধারণ, সুতার বাজারে তদারকি ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ, ভারতে শাড়ি রপ্তানির উদ্যোগ, নতুন বাজার সৃষ্টি, দেশ ও বিদেশে প্রদর্শনীর আয়োজন, আধুনিক নকশা সরবরাহ এবং স্বাভাবিক সময়ে তাঁতিদের শাড়ি বন্ধক ও ঈদ, পূজা, পয়লা বৈশাখসহ মৌসুমি সময়ে বিক্রির ব্যবস্থা করা। বর্তমানে বিভিন্ন সংস্থা তাঁতিদের ঋণ দিলেও এসব মৌলিক সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেই। ফলে প্রকৃত সমস্যার সমাধান না করে শুধু ঋণভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ করলে কাক্সিক্ষত ফল অর্জন করা সম্ভব হবে না।

প্রকল্পে চিহ্নিত অসংগতির বিষয়ে আইএমইডির প্রতিবেদনের তথ্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন প্রকল্প পরিচালক রতন চন্দ্র সাহা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ৬৯ দশমিক ৮ শতাংশ তাঁতি প্রয়োজনীয় ঋণ সময়মতো পান না। তবে এ অভিযোগ নাকচ করে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা সমীক্ষা করেছেন, তারা একজনের সঙ্গে কথা বলেই এ ধরনের প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। রিপোর্টে যা বলা হয়েছে, বাস্তবে এমন হওয়ার কথা নয়।’

আইএমইডির প্রতিবেদনে তাঁত বোর্ড পরিচালিত বেসিক সেন্টারের তথ্যের ভিত্তিতে তাঁতি নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রতন চন্দ্র সাহা বলেন, ‘বিষয়টি সঠিক নয়। তাঁতি নির্বাচনে কোনো অনিয়ম হয়নি। আমরা আইএমইডিকে জবাব দিয়েছি এবং জানতে চেয়েছি বেসিক সেন্টারের কে এই তথ্য দিয়েছেন, কিন্তু তারা তা জানাননি।’

প্রতিবেদনে ৩৪৩টি আসবাবপত্রের অস্তিত্ব না থাকার যে তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, সেটিও অস্বীকার করেন তিনি। প্রকল্প পরিচালকের দাবি, এই প্রকল্পের মাধ্যমে তাঁতিদের জীবনমানের উন্নয়ন হয়েছে এবং সার্বিকভাবে প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে।

১৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৯ সালের ৫ মার্চ একনেক সভায় অনুমোদন পায় এটি। শুরুতে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল মার্চ ২০১৯ থেকে জুন ২০২৩ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হলেও পরে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়।

আইএমইডি জানায়, এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি ৯৭ দশমিক ১ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় ৩২ হাজার ২৭৮টি তাঁতের বিপরীতে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও এ পর্যন্ত ৩১ হাজার ৪০১টি তাঁতের অনুকূলে ১৪৫ কোটি ১৮ লাখ টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।

আইএমইডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে শাড়ি রপ্তানি বন্ধ থাকায় তাঁতশিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। বর্তমানে নদীপথে রপ্তানি করতে হওয়ায় প্রতি পিস কাপড়ে ৮ থেকে ১০ টাকা পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং রপ্তানির অর্থ পেতে ২ থেকে ৩ মাস সময় লাগছে। ফলে তাঁতিদের অতিরিক্ত চলতি মূলধনের প্রয়োজন হচ্ছে। একই সময়ে ভারত ও চীন থেকে আমদানি করা সুতার দাম বাড়লেও সেই অনুপাতে শাড়ির বিক্রিমূল্য বাড়ছে না। কাঁচামাল ও শাড়ির বাজারে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ, উচ্চ সুদের মহাজনি ঋণ এবং দাদন ব্যবস্থার কারণে অনেক তাঁতি লোকসানের মুখে পড়ছেন। ফলে অনেকে তাঁত বিক্রি করে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন বা বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন।