জুয়া ভয়ংকর এক আসক্তি, যা মানুষকে লোভের স্রোতে ফেলে। জুয়ার থাবা সমাজে নতুন নয়, তবে প্রযুক্তির বিকাশে অনলাইনে জুয়াড়িদের প্রলুব্ধ করার নতুন নতুন দরজা উন্মুক্ত হচ্ছে। এরই চিত্র উঠে এসেছে ১ আগস্ট দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, অনলাইন জুয়া, বেটিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সি সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের আড়ালে দেশে গড়ে উঠছে বিপুল অঙ্কের সন্দেহজনক অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্ক। গত ৪ বছরে এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহজনক লেনদেনের পরিমাণ ছাড়িয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। উল্লিখিত সময়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের কাছে জমা পড়েছে ১ হাজার ৮৯৯টি সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন ও কার্যক্রম প্রতিবেদন। লেনদেনে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার ৬ হাজার ২২২টি হিসাব ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। ৪ বছরের ব্যবধানে এমন সন্দেহজনক প্রতিবেদনের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২১ গুণ !
সহজেই প্রতীয়মান হয়, জুয়াড়িরা কীভাবে ছড়িয়েছে তাদের জাল! ইতিপূর্বে সংবাদমাধ্যমেই জানা যায়, আমাদের সমাজ ও পারিবারিক জীবনে এর বিরূপ প্রভাব ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। অসংখ্য পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। ‘জীবন নিয়ে জুয়া’ এই বাক্যটি আমাদের সমাজে হরহামেশা উচ্চারিত হতে শোনা যায়। প্রযুক্তির আশীর্বাদ যখন যোগাযোগসহ অনেক কিছুই হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে তখন এর অপব্যবহার একই সঙ্গে জীবনে সর্বনাশের গাঢ় ছায়াও ফেলেছে। জুয়ার ফাঁদ পাতা ভুবনে বিভিন্ন স্তরের মানুষ বিশেষ করে তরুণ-যুবসমাজ যেভাবে জড়িয়ে পড়েছে, তা অশনিসংকেত। ক্রিকেট, ফুটবল জনপ্রিয় এসব খেলাসহ অন্য খেলা অনলাইন জুয়ার অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। জুয়ার ওয়েবসাইটগুলোতে বিভিন্ন মাধ্যমে টাকা জমা করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে আমেরিকান সমাজ সংস্কারক, দাসপ্রথা বিরোধী, বক্তা, ১৯ শতকে আফ্রিকান-আমেরিকানদের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ফ্রেডরিক ডগলাসের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘জুয়া হলো ধ্বংসের সীমানা, যেখানে সুখ শেষ হয়।’
আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, জুয়া শুধু মানুষকে সততার পথ থেকেই বিচ্যুত করছে না, একেকটি পরিবারকে পথে বসিয়ে দিচ্ছে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে এর জন্য অতীতে অভিযানও চালিয়েছে। কিন্তু তাতে যে স্থায়ী ফল মেলেনি দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনটি এরই সাক্ষ্যবহ। অনলাইন জুয়া অপরাধ জগতে নতুন উদ্বেগজনক মাত্রা যোগ করেছে। আমরা এ ব্যাপারে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিকভাবে উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করি। জনপ্রতিনিধিসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের সচেতনদের সমন্বয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে। পারিবারিকভাবেও বাড়াতে হবে নজরদারি। তরুণ ও যুবসমাজের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ যে মরণফাঁদে পা দিচ্ছে এর পথ রুদ্ধ করতেই হবে। অনলাইন জুয়ায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক উভয় সংকটই বিদ্যমান।
এই আসক্তি মাদকের মতোই বহুমুখী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশের প্রচলিত আইনে জুয়া অবৈধ। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে প্রণীত এই আইনে সাজার পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য বিধায় বর্তমানের নিরিখে আমরা মনে করি, আইন যুগোপযোগী করার বিকল্প নেই। অভিযোগ আছে, অনলাইন জুয়ার সাইট ও অ্যাপ বন্ধে কার্যকর আইনি উদ্যোগের অভাব রয়েছে। আমরা মনে করি, উত্থাপিত অভিযোগ খতিয়ে দেখে সময়ক্ষেপণ না করে বৃহৎ স্বার্থ ও প্রয়োজনে এ জন্য কঠোর কার্যকর নেওয়া বাঞ্ছনীয়। অনলাইন জুয়া শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা নয়, তা যেন জাতীয় সমস্যায় রূপ নিয়েছে। জুয়ার অ্যাপস বন্ধ করতে এবং এর সঙ্গে যুক্ত এজেন্টদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বিটিআরসিকেও নজরদারি কঠোর করতে হবে। একই সঙ্গে মোবাইল কোম্পানিগুলোকেও ভূমিকা রাখতে হবে। এই বিষবৃক্ষ সমূলে উৎপাটন করতে না পারলে এর শাখা-প্রশাখা আরও ছড়াবে এবং সমাজের নতুন ঘাতক হিসেবে তা উদ্বেগের মাত্রা আরও বাড়িয়ে তুলবে। অনলাইন ‘বাজিকর’দের বেশিরভাগই শিক্ষিত। কারণ প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতার দরকার এ ক্ষেত্রে। ইংরেজ জীববিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন বলেছেন, ‘জুয়া মানে পরিবারের শান্তি ও সম্পর্ক ধ্বংস করা’। মনে রাখতে হবে, জুয়া মানুষের ক্ষতির খতিয়ানই দীর্ঘ করে, চেতনা লুপ্ত করে লোভে উন্মাদ করে দেয়।