আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম মেসওয়াক

ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মানুষের জীবনের ছোট-বড় প্রতিটি বিষয়ের দিকনির্দেশনা এতে রয়েছে। খাওয়া, পান করা, ঘুমানো, পোশাক পরিধান, চলাফেরাসহ সবকিছুর মতো মুখ ও দাঁতের পরিচ্ছন্নতার প্রতিও ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আধুনিক যুগে দাঁতের যতেœর জন্য টুথব্রাশ ও টুথপেস্ট ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও, মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের যে অনন্য সুন্নাহ শিক্ষা দিয়েছেন, তা হলো মেসওয়াক। এটি ইবাদত, পরিচ্ছন্নতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব : ইসলাম পরিচ্ছন্নতাকে ইমানের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে। একজন মুসলিমের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় পরিচ্ছন্নতার প্রতি যতœবান হওয়া উচিত। মুখ মানুষের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, দোয়া এবং মানুষের সঙ্গে সুন্দরভাবে কথা বলার জন্য মুখকে পরিচ্ছন্ন রাখা অপরিহার্য। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুখের পরিচ্ছন্নতার জন্য মেসওয়াক ব্যবহারের প্রতি বিশেষ উৎসাহ দিয়েছেন।

মেসওয়াকের ফজিলত : মেসওয়াকের মর্যাদা সম্পর্কে বহু সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মেসওয়াক মুখের পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম এবং রবের সন্তুষ্টির উপায়।’ (মুসনাদে আহমাদ)

অপর হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমি যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর মনে না করতাম, তবে প্রত্যেক নামাজের সময় তাদের মেসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।’ (সহিহ বুখারি)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, মেসওয়াক এতটাই গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ যে, উম্মতের কষ্টের আশঙ্কা না থাকলে তা প্রায় বাধ্যতামূলক পর্যায়ে নির্দেশ দেওয়া হতো।

মেসওয়াক ইবাদতের অংশ : অনেকেই মনে করেন, মেসওয়াক কেবল দাঁত পরিষ্কারের জন্য ব্যবহৃত হয়। বাস্তবে এটি একটি ইবাদতও বটে। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণে যে কাজ করা হয়, তা সওয়াবের কারণ হয়। একজন মুসলিম যখন সুন্নাহ পালনের নিয়তে মেসওয়াক করেন, তখন তিনি তো মুখ পরিষ্কার করেনই, এর সঙ্গে সঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ অনুসরণ করেন এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশা করেন।

মেসওয়াকের উপকারিতা : আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিকভাবে ব্যবহৃত মেসওয়াক দাঁত ও মাড়ির জন্য উপকারী। এটি দাঁতের ময়লা দূর করতে, মুখের দুর্গন্ধ কমাতে এবং মাড়িকে শক্তিশালী রাখতে সহায়তা করে। বিশেষ করে, আরাক (পিলু) গাছের মেসওয়াকে প্রাকৃতিক কিছু উপাদান থাকে, যা মুখের পরিচ্ছন্নতায় সহায়ক বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এ কথাও মনে রাখা প্রয়োজন, ইসলামের দৃষ্টিতে মেসওয়াকের মর্যাদা শুধু স্বাস্থ্যগত উপকারিতার ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এটি সর্বপ্রথম একটি সুন্নাহ। স্বাস্থ্যগত উপকারিতা এর অতিরিক্ত অনুগ্রহ।

আজকের যুগে অনেকেই টুথব্রাশ ও টুথপেস্ট ব্যবহার করেন। এগুলো ব্যবহার করা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। বরং দাঁত পরিষ্কার রাখাই মূল উদ্দেশ্য। তবে একজন মুসলিমের উচিত সুন্নাহকে অবহেলা না করা। যদি কেউ টুথব্রাশ ব্যবহার করেন, পাশাপাশি মেসওয়াককেও জীবনের অংশ করে নিতে পারেন। এতে দাঁতের পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি সুন্নাহ পালনের সওয়াবও অর্জিত হবে।

এ কারণে বিষয়টিকে টুথব্রাশ বনাম মেসওয়াক, এভাবে না দেখে বরং সুন্নাহকে জীবিত রাখার দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করাই অধিক উত্তম।

যখন মেসওয়াক সুন্নাহ : হাদিসে বিভিন্ন সময়ে মেসওয়াক করার কথা এসেছে। যেমন অজুর সময়। নামাজের আগে। ঘুম থেকে জাগার পর। কোরআন তেলাওয়াতের আগে। ঘরে প্রবেশের সময়। মুখের গন্ধ পরিবর্তিত হলে। এসব সময়ে মেসওয়াক করা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ।

সুন্নাহ থেকে দূরে সরার বাস্তবতা : বর্তমান যুগে মানুষ আধুনিকতার নামে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পণ্য গ্রহণ করছে। কিন্তু অনেক সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেখানো সহজ ও বরকতময় সুন্নাহগুলো অবহেলিত হচ্ছে। অথচ একজন মুমিনের প্রকৃত ভালোবাসা প্রকাশ পায় তার অনুসরণের মাধ্যমে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো। আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করবেন।’ (সুরা আলে ইমরান ৩১) অতএব, সুন্নাহকে জীবিত রাখা মানে মহান আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করা।

পরিবারে ও সমাজে মেসওয়াকের চর্চা : প্রত্যেক মুসলিমের উচিত, নিজের ঘর থেকেই মেসওয়াকের চর্চা শুরু করা। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই এর গুরুত্ব শেখানো প্রয়োজন। মসজিদ, মাদ্রাসা ও ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেসওয়াক ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ বিষয়ে ইতিবাচক প্রচার করা দরকার, যাতে মানুষ সুন্নাহ সম্পর্কে সচেতন হয়।

তবে মানুষকে আহ্বান করার সময় প্রজ্ঞা, নম্রতা ও উত্তম আচরণ বজায় রাখা জরুরি। যারা মেসওয়াক ব্যবহার করেন না বা টুথব্রাশ ব্যবহার করেন, তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা বা দোষারোপ করা উচিত নয়। বরং ভালোবাসা ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে সুন্নাহর প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করাই একজন দাঈর দায়িত্ব।

আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম : মেসওয়াক ছোট আমল হলেও এর মর্যাদা অত্যন্ত বড়। এটি মুখের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহকে জীবিত রাখে এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম হয়। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত, জীবনের অংশ হিসেবে মেসওয়াককে গ্রহণ করা এবং সুযোগমতো নিয়মিত এর আমল করা।

লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষা সচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ মহিলা মাদরাসা, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর