বইচিত্র

বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যভাবনা

আমাদের শিশুসাহিত্যের আনুষ্ঠানিক সূচনা মৌখিক সাহিত্যের সঙ্গেই। পরবর্তী সময়ে সাহিত্যের লেখ্য রূপের সঙ্গে সঙ্গে শিশুসাহিত্যের পরিধির বিস্তার ও বিকাশ ঘটেছে। প্রাচীন লোকায়ত ছড়া বা রূপকথার যুগ পেরিয়ে আমাদের প্রথম বাংলা শিশুতোষ সাহিত্যগ্রন্থ প্রকাশ পায় ১৮৯১ সালে। যোগীন্দ্রনাথ সরকার রচিত হাসি ও খেলা শিরোনামের সচিত্র বইটিই এ ধারার পথিকৃৎ। তবে পূর্ণাঙ্গ শিশুতোষ সাহিত্য রচনার আগে, আমাদের পাঠ্যপুস্তকের হাত ধরেই এই শাখাটির বিস্তার ঘটেছে। এক্ষেত্রে পথিকৃৎ ভূমিকা পালন করেছেন মদনমোহন তর্কালঙ্কার। তিন খণ্ডে তার রচিত শিশুশিক্ষা বইটির প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশ পেয়েছিল ১৮৪৯ সালে। এখানেই গ্রন্থভুক্ত হয় পাঠ্যপুস্তকের সুপরিচিত কবিতা—‘পাখী সব করে রব, রাতি পোহাইল।/ কাননে কুসুম কলি, সকলি ফুটিল।/...ফুটিল মালতী ফুল, সৌরভ ছুটিল।/ পরিমল লোভে অলি, আসিয়া জুটিল।/গগনে উঠিল রবি লোহিত বরণ।/আলোক পাইয়া লোক, পুলকিত মন।/ শীতল বাতাস বয়, জুড়ায় শরীর।/ পাতায় পাতায় পড়ে, নিশির শিশির।/ উঠ শিশু, মুখ ধোও, পর নিজ বেশ।/ আপন পাঠেতে মন, করহ নিবেশ।’

এ রকম কবিতার প্রভাবেই শৈশবে কল্পনাপ্রবণ শিশুরা একদিন মুগ্ধ হয়েছিল এবং আজও শিশুরা মুখে মুখে এই কবিতা আবৃত্তি করে। এরই রেশ ধরে পরবর্তীকালে আমাদের শিশুদের জন্য পড়াপাঠ্য ও সৃজনশীল সাহিত্য এগিয়ে চলেছে। শিশুসাহিত্যের এই ধারাটির বাংলাদেশ পর্ব নিয়েই আলম সাইফুলের বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যভাবনা। বইয়ের শিরোনামেই তিনি নির্র্দিষ্ট করে জানিয়েছেন তার গবেষণার সময়কাল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার কাল থেকে ২০০০ পর্যন্ত এ সময় এবং এই পর্বের এগারো জন সাহিত্যিকের শিশুসাহিত্য নিয়ে তিনি আলোচনার বিস্তার ঘটিয়েছেন। এই এগারোজন সাহিত্যিক হলেন—শওকত ওসমান, মোহাম্মদ ফেরদাউস খান, আতোয়ার রহমান, শামসুর রাহমান, আবদুলস্নাহ আল-মুতী, ফয়েজ আহমদ, আলাউদ্দিন আল আজাদ, শওকত আলী, সুকুমার বড়ুয়া, বিপ্রদাস বড়ুয়া ও সেলিনা হোসেন। তাদের রচিত শিশুসাহিত্য নিয়ে আলোকপাত করেছেন বইটির ‘বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য : পাঠ-পর্যেষণা’ অধ্যায়ে। 

বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যভাবনা (১৯৭১-২০০০) চারটি অধ্যায়ে বিভক্ত। বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যভাবনা : ধারা ও ধারণা অনুসন্ধান, বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য গবেষণাভাবনা : একটি পর্যালোচনা, বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য : পাঠ-পর্যষেণা এবং উপসংহার ও প্রস্তাবনা। বইয়ের শুরুতেই, প্রথম অধ্যায়ে গবেষক ‘শিশুসাহিত্য’ শব্দটি নিয়ে সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। শিশুসাহিত্য শব্দটি নিয়ে অনেকের আপত্তির প্রেক্ষিতে এই আলোকপাত। শিশুসাহিত্য না বলে অনেকে, শিশুতোষ সাহিত্যসহ নানা অভিধায় অভিহিত করতে আগ্রহী। তবে গবেষক দেখিয়েছেন, শিশুসাহিত্য শব্দটি যেমন আভিধানিকভাবে পরিশুদ্ধ তেমনি ব্যবহার উপযোগীও। শিশুসাহিত্য শব্দটির মাধ্যমে শিশুদের জন্য লেখা সাহিত্য বোঝানোর পাশাপাশি শিশুদের দ্বারা লিখিত সাহিত্যও বোঝায়। 

তবে গবেষক আলম সাইফুলের গবেষণার পরিধি যাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে বিস্তৃত তাদের সবাই শুধু শিশুসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত নন। তাদের অনেকেই সাহিত্যের নানা শাখায় নিজেদের উজ্জ্বল উপস্থিতি প্রমাণের পাশাপাশি শিশুদের বিকাশে শিশুসাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন, দায়বোধ করেছেন। ফলে আলোচ্য সাহিত্যিকদের শিশুসাহিত্যের অংশেই গবেষক তার আলো ফেলেছেন। এ বিষয়টি তিনি বইয়ের ভূমিকা অংশে বিবৃতও করেছেন। যেখানে তিনি স্পষ্ট করেছেন, শিশুসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত না হলেও কেন তাদের নিয়েই গবেষণাকর্মটি এগিয়েছেন। তিনি লেখেন, ‘বাংলাদেশে বিশুদ্ধ শিশুসাহিত্যিকের সংখ্যা কম। বিষয়টি সর্বজনীন কিংবা বিশ্বজনীন বলেও মনে হয়। অন্যদিকে কবি ও কথাসাহিত্যিক মাত্রই কমবেশি শিশুসাহিত্য রচনায় ব্রতী হতে দেখা যায়। এ গবেষণায় আলোচ্য শিশুসাহিত্যিকদের ক্ষেত্রেও তা লক্ষণীয়। অনেকেই শিশুসাহিত্যিকের চেয়ে কবি-কথাসাহিত্যিক-গবেষক হিসেবেই সমধিক খ্যাত। পক্ষান্তরে বলা যায়, তাদের শিশুসাহিত্য কর্মের আলোচনা-সমালোচনা, বিচার-বিশ্লেষণ না হওয়ায় তাদের শিশুসাহিত্যিক পরিচিতি চাপা পড়ে আছে। এ গবেষণায় শিশুসাহিত্যিক ও কথাসাহিত্যিক উভয় ধারার সাহিত্যিকদের শিশুতোষ সাহিত্যকর্মের ওপর গবেষণা পরিচালিত হয়েছে।’

আমাদের শিশুসাহিত্যের ধারাটি সমৃদ্ধ হলেও, এ শাখা নিয়ে গবেষণা সংখ্যা অপ্রতুলই বলা চলে। এক্ষেত্রে আলম সাইফুলের প্রয়াস ধারাটিকে সমৃদ্ধ করবে।