সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই হবে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান!

তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন নির্দেশনা মানতে চায় না জ্বালানি বিভাগ। ‘দ্রুততার স্বার্থে’ ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্পে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) করার যে বিধান রয়েছে তা শিথিল করে প্রকল্প অনুমোদন দিতে বলেছে তারা। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গত ২ জুলাই অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে একটি আধাসরকারি পত্র বা ডিও লেটার দিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রক্রিয়ায় তৃতীয় পক্ষের যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রকল্প ব্যয় নির্ধারিত হতে পারে। এতে প্রকল্প ব্যয়ও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া, দুর্নীতির সুযোগও তৈরি হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে অন্য যেকোনো প্রকল্পের মতোই গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন-সংক্রান্ত প্রকল্পের অনুমোদনের ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাই করা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। তবে জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার স্বার্থে ডিও লেটারের মাধ্যমে এই নিয়ম থেকে অব্যাহতি নেওয়ার চর্চা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল বিবেচনায় অনেকে এরূপ অব্যাহতি নেওয়াকে যৌক্তিক মনে করেন। তবে বিকল্প হিসেবে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি প্রয়োগের জন্য বুয়েট, আইবিএ বা আইআইএফসির মতো প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে স্বল্পসময়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সুযোগ আছে। তা না করে অব্যাহাতি নেওয়া হলে তা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মানদণ্ডে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। পক্ষপাতিত্বের প্রশ্নও উঠতে পারে।’ সরকারি প্রকল্পের ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এ জন্য রয়েছে ‘সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা-জুন, ২০২২’। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটে এই নির্দেশিকা পাওয়া যায়। মন্ত্রীর ডিও লেটারে উল্লেখিত ওই নির্দেশিকার ১.১.২ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতা শিথিল করার কথা বলা হয়েছে।

নির্দেশিকার ১.১.২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে প্রচলিত ব্যয়ের সব বিনিয়োগ প্রকল্প গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ, নিরপেক্ষ ও পেশাদারি প্রতিষ্ঠান/ব্যক্তি পরামর্শক কর্র্তৃক আবশ্যিকভাবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে এবং নির্ধারিত ছকে (সংযোজনী-ক/খ) সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রতিবেদন প্রণয়ন করতে হবে। প্রতিবেদনের সুপারিশ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ (নির্বাহী সার-সংক্ষেপ, ব্যয় প্রাক্কলন, ডিজাইন/কনসেপচুয়াল ডিজাইন ইত্যাদি) প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। এ ছাড়া, প্রকল্পের গুরুত্ব/প্রকৃতি বিবেচনায় ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত প্রাক্কলিত ব্যয়ের বিনিয়োগ প্রকল্প গ্রহণের আগেও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে।’

বিদ্যুৎ জ্বালানি এবং খনিজসম্পদমন্ত্রী ডিও লেটারে বলেন, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, উন্নয়ন, কূপ খনন, ওয়ার্কওভার এবং অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর প্রকৃতি অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ভিন্ন। এসব প্রকল্পে সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ব্যবহৃত সুবিধা-ব্যয় অনুপাত (বিসিআর), অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার (আই আর আর) এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ই আই এ)-এর ফলাফল মূলত অনুসন্ধানে তেল বা গ্যাস পাওয়ার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় প্রচলিত পদ্ধতিতে সমীক্ষা সবসময় কার্যকর হয় না। আর এ কারণেই তিনি সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ক্ষেত্রে এই ছাড় চান।

সাধারণত দেশে কোনো তেল-গ্যাস অনুসন্ধান প্রকল্প ৫০ কোটি টাকার নিচে হয় না। একটি গ্যাস কূপ খনন করতে ধরন ভেদে ৮০ কোটি থেকে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়ে থাকে। একই ভাবে গ্যাস অনুসন্ধানের ভূতাত্ত্বিক জরিপ প্রকল্পগুলোর ব্যয় ১০০ কোটি টাকার বেশি হয়ে থাকে। বাপেক্স ২০২২ সালের চুক্তিতে ভোলার তিনটি কূপ (টোবগি-১, ভোলা নর্থ-২ ও ইলিশা-১) খননের জন্য মোট চুক্তিমূল্য ছিল ৬৪৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এই হিসেবে প্রতিটি কূপ খনন ব্যয় ছিল ২১৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে, বাপেক্স তাদের নিজস্ব রিগ দিয়ে প্রতি কূপ খনন করতে ব্যয় করে সর্বোচ্চ ৮০ কোটি টাকা। কোথাও কোথাও এই ব্যয়ে আরও ১৫ কোটি কমে ৬৫ কোটিতেও কূপ খনন করেছে বাপেক্স। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিদ্যুৎ জ¦ালানি দ্রুত সরবরাহ বিশেষ বিধান ২০১০-এর আওতায় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু সেগুলোর অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এখন আবার দ্রুততার কথা বলে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া তুলে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের দর ঠিক না থাকলে দরপত্রে ঠিকাদারও এর বিশেষ সুবিধা নিতে পারে।

সূত্র বলছে, সাধারণত পাঁচটি কারণে সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকায় তৃতীয় পক্ষের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দুটি কারণ সরাসারি রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষা করে। প্রথমত, প্রস্তাবিত প্রকল্পটি প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক, আর্থিক, সামাজিক ও পরিবেশগত দিক থেকে বাস্তবায়নযোগ্য কি না তা নির্ধারণ করা। দ্বিতীয়ত, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা। অন্য কারণগুলো হচ্ছে বড় অঙ্কের সরকারি বিনিয়োগের আগেই প্রকল্পটি প্রত্যাশিত সুফল দেবে কি না তা যাচাই করে অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো। সঠিক ব্যয় ও নকশা নির্ধারণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা এবং জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য এই ধারা সংযোজন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)-এর সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতিকুজ্জামান বলেন, যেকোনো প্রকল্পের একটি সম্ভাব্যতা জরিপ থাকতেই হবে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা জরিপ ছাড়া কোনো প্রকল্প অনুমোদনই হওয়ারই কথা না। তেল-গ্যাস অনুসন্ধান উত্তোলন একটি জটিল প্রক্রিয়া। এখানে তৃতীয় পক্ষও বাপেক্সের কাছ থেকে ডাটা (তথ্যে উপাত্ত) নিয়ে সম্ভাব্যতা জরিপ করে। সেক্ষেত্রে সরকার চাইলে বাপেক্সের সম্ভাব্যতা জরিপকারী দলের সঙ্গে বাইরের বিশেষজ্ঞদের রাখতে পারে। যাতে প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ হয়।

বাপেক্সের আরেক সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোর্তজা আহমেদ ফারুক চিশতি বলেন, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা জরিপ এবং পরিবেশের জরিপ দুটি বিষয়ই প্রকল্প অনুমোদনের জন্য জরুরি। আমরা যেটা করেছি, সেটা হলো কূপ খনন করার ক্ষেত্রে ওই এলাকার রাস্তাঘাট, মসজিদ, স্কুল এবং মানুষের বসতি বিষয়ে একটি জরিপ করতাম। সেটি প্রকল্প প্রস্তাবের সঙ্গে দেওয়া হতে। এ ছাড়া তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরিবেশগত একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন দেওয়া হতো।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়া প্রকল্প অনুমোদনের সুযোগ দেওয়া হলে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হবে। এ প্রসঙ্গে সাবেক সিনিয়র দায়রা জজ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম বলেন, সরকারি অর্থ খরচের যে নির্দেশনা রয়েছে তার বাইরে গিয়ে সরকারি অর্থ খরচের বিষয়ে কোনো ডিও লেটার কেউ দিতেই পারেন না। এতে করে সম্ভাব্য দুর্নীতির পথ খুলতে পারে। তিনি বলেন, এই ডিও লেটারের ভিত্তিতে যদি কোনো কাজ হয় তাহলে যারা এটি অনুমোদন করবে তারাও দায়ী হতে পারেন।’

যদিও ডিও লেটার একটি আধাসরকারি পত্র। মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যরা এটি দিলেও তা মানার ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।