মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে সমন্বয়ের সুর

সমন্বিত উদ্যোগে বাস্তবায়ন হবে আগামীর ২৫ বছরের উন্নয়ন। যদিও এই সমন্বয় উদ্যোগের কথা সব সময় বলে আসা হলেও কাজের ক্ষেত্রে আমরা এর প্রতিফলন দেখতে পাই না। সেখানে চট্টগ্রামে কাজ করা বিভিন্ন সেবা ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কথা উঠে আসে। তবে এবার আইন করে সমন্বয়ের মাধ্যমে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। একইসঙ্গে কোন সংস্থা কী কী কাজ করবে তাও থাকছে এই মাস্টারপ্ল্যানে।

সিডিএ ২৫ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানের খসড়া উপস্থাপন করেছে গতকাল শনিবার। এই খসড়া মাস্টারপ্ল্যানের ওপর আগামী দুমাস ধরে জনগণ মতামত দিতে পারবে। এই মাস্টারপ্ল্যানের আগে  চট্টগ্রামের সর্বপ্রথম মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন হয়েছিল ১৯৬১ সালে। সেই মাস্টারপ্ল্যানের গাইড লাইনের আলোকে ১৯৬৫ সালে একটি রিভিউ প্ল্যান হয়েছিল। পরে ১৯৯৫ সালে ২০ বছর মেয়াদি একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন হয়েছিল। সেই মাস্টারপ্ল্যানের আলোকে ২০০৮ সালে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রণয়ন হয়। ২০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানের মেয়াদ ২০১৫ সালে শেষ হয়ে যাওয়ার পরও ড্যাপের গাইডলাইন অনুযায়ী এখনো নগরীর উন্নয়ন পরিকল্পনার রুটিন কাজ চলছে। এবার ২০২৬ সালে প্রণীত হতে যাচ্ছে ২৫ বছর মেয়াদি (২০২৫-২০৫০) মাস্টারপ্ল্যান। ৩৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা বাজেটের সেই মাস্টারপ্ল্যানের নতুন দিক কি? আমরা আগেও দেখেছি ১৯৯৫ সালের মাস্টারপ্ল্যান অনুসরণ করে চট্টগ্রাম মহানগরীর উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। মাস্টারপ্ল্যানে ফ্লাইওভার বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কথা উল্লেখ না থাকলেও সিডিএ তা করেছে। একইভাবে নগরীতে নতুন একাধিক খাল খননের কথা এবং নর্দান হিল নামের উত্তরের হিলগুলো সংরক্ষণের কথা বলা হলেও সিডিএ নিজেই কেটে রাস্তা নির্মাণ করেছে। প্রাকৃতিকভাবে পানি ধারণক্ষমতার জায়গাগুলোতে সিডিএ আবাসিক এলাকার প্লট তৈরি করে বরাদ্দ দিয়েছে। এমন অনেক অসংগতি খোদ সিডিএ করেছে। এবারও কি তাই হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএ’র উপপ্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আবু ঈসা আনসারি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার মাস্টারপ্ল্যানের গাইডলাইনের বাইরে   যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এবার আমরা সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনার দিকে জোর দিয়েছি। অর্থাৎ মাস্টারপ্ল্যানের কোন কোন কাজ কোন সংস্থা বাস্তবায়ন করবে তা উল্লেখ থাকবে। সিডিএ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করলেও তা বাস্তবায়ন করবে নগরীর সব উন্নয়ন ও সেবা সংস্থা।

তিনি আরও বলেন, এজন্য আমরা একটি আরবান কোঅর্ডিনেশন কমিটি গঠনের প্রস্তাবনা রেখেছি এই মাস্টারপ্ল্যানে। অর্থাৎ এই আরবান কোঅর্ডিনেশন কমিটির মাধ্যমে এক সংস্থার প্রকল্প অন্য সংস্থার প্রতিনিধিরা জানতে পারবে এবং এই প্রকল্পকে সাপোর্ট করার জন্য অন্য সংস্থাগুলো বাকি কাজ করবে।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কর্ণফুলীর তলদেশে টানেল ছিল একটি মেগা প্রকল্প হয়েছে। এই মেগা প্রকল্পকে ফলপ্রসূ করতে সড়ক ও জনপথ এবং অন্য সংস্থাগুলো বাকি উন্নয়ন প্রকল্প নিতে পারত। তাহলে তা আরও বেশি ফলপ্রসূ হতো।

সমন্বিত উন্নয়ন প্রসঙ্গে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, আমরা সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে চাই। মাস্টারপ্ল্যানের বাস্তবায়নও সব সংস্থাগুলোকে নিয়ে করতে চাই।

এদিকে মাস্টারপ্ল্যানের ব্যাটিংয়ের কাজ করছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান বলেন, ‘এবারের মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে যাতে কোনো সংস্থা বলতে না পারে এটা সিডিএ’র মাস্টারপ্ল্যান আমরা কেন মানব, সেজন্য প্রতিটি সংস্থাকেও মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। অর্থাৎ কোন কোন সংস্থার কী দায়িত্ব তাও উল্লেখ রয়েছে এই মাস্টারপ্ল্যানে। আর এটাই মাস্টারপ্ল্যানটিকে পৃথক করেছে এবং এতে তা মেনে চলতে সব সংস্থাগুলো কাজ করবে।’

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় আইনগত কারণেই দুই মাস ধরে জনগণের মতামত নেওয়া হচ্ছে। যেহেতু এই মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় কয়েকটি পৌরসভা রয়েছে তাই স্থানীয় জন প্রতিনিধিদের অনেক ভূমিকা রয়েছে মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্তকরণে তাদের মতামত দেওয়ার। এতে একটি ফলপ্রসূ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন হবে।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে বিগত মাস্টারপ্ল্যানের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তৎকালীন সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম ২০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের জন্য ডিপিপি তৈরির কাজ শুরু করেন। ২০১৯ সালে ১০ বছরের মেয়াদ শেষে ছালামের বিদায়ের পর জহিরুল আলম দোভাষ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দায়িত্বে থাকা মূলত : এই দোভাষের সময়ই মাস্টারপ্ল্যানের প্রধান অংশের কাজ শেষ হয়। ২০২২ সালের জুনে ড্রোন সার্ভের মাধ্যমে মাস্টারপ্ল্যানের কাজ শুরুর পর ২০২৩ সালের ১৮ মে সার্ভে রিপোর্ট উপস্থাপন ও অনুমোদন হয়। এই সার্ভে রিপোর্টের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ৬ মার্চ ইন্টেরিম রিপোর্টও উপস্থাপন ও অনুমোদন হয়ে যায়। এপ্রিলে দোভাষের মেয়াদ শেষ হলে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান মোহাম্মদ ইউনুস। এপ্রিলে দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান প্রকৌশলী নুরুল করিম। এই চেয়ারম্যানের সময়কালে বিভিন্ন স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে মিটিং ও মতামত গ্রহণের কাজটি হয়ে থাকে। এরই ভিত্তিতে গত বছরের ১৭ জুন ড্রাফট ফাইনাল রিপোর্ট-১ এবং গত ১ ফেব্রুয়ারিতে ড্রাফট ফাইনাল রিপোর্ট-২ উপস্থাপন ও অনুমোদন হয়। প্রকৌশলী নুরুল করিমের বিদায়ের পর সম্প্রতি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন। যেহেতু ড্রাফট ফাইনাল রিপোর্ট অনুমোদন হয়ে গেছে তাই এখন খসরা ফাইনাল রিপোর্ট জনগণের সামনে উপস্থাপন হলো। ইতিমধ্যে গতকাল এই খসড়া রিপোর্ট সিডিএ তাদের ওয়েবসাইটে আপলোডও করেছে। এখন আগামী ২ মাস এই খসড়া রিপোর্টের ওপর মতামত সংগ্রহের পর ডিসেম্বরে ফাইনাল রিপোর্ট প্রকাশ করবে সিডিএ।