কোটি টাকার সরঞ্জাম নষ্ট

কোটি টাকার সরকারি ল্যাপটপ ও আধুনিক প্রযুক্তি সরঞ্জামে ধুলো জমছে তালাবদ্ধ ঘরে, পাশে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা ক্লাস করছে সনাতন পদ্ধতিতে। চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি ডিভিশন) (আইটিসিডি) ডিজিটাল ল্যাব’-এর বাস্তব চিত্র এমনই। ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশ হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই ল্যাবগুলো দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তদারকির অভাব ও অব্যবস্থাপনায় তা মুখ থুবড়ে পড়েছে।

ল্যাবগুলোতে ল্যাপটপ দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো দিয়ে কোনো কাজ হয় না। শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করার মহৎ উদ্দেশ্যে কোটি টাকার আইসিটি সরঞ্জাম ও ল্যাপটপ বিতরণ করা হলেও বাস্তবে তার কোনো সুফল মিলছে না। ল্যাবগুলো নিয়মিত ব্যবহার না হওয়ায় নষ্টের দিকে যাচ্ছে মূল্যবান ডিভাইসগুলো।

অভিযোগ মিলেছে, আইটিসিডি ডিজিটাল ল্যাবের নামে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লোক দেখানো ক্লাস হয়েছে। কোথাও কম্পিউটার নেই, কিন্তু শিক্ষক আছে। আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে কম্পিউটার দেওয়া হয়েছে তার সবগুলোই নষ্ট। ফলে শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার শিক্ষা ও আইসিটি ক্লাসের নামে চলছে প্রতারণা।

স্থানীয় শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কম্পিউটার শিক্ষা ও নিয়মিত আইসিটি ক্লাসের নামে কার্যত এক ধরনের প্রতারণা চলছে। কাগজে-কলমে ল্যাব পরিচালনার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা ল্যাপটপ স্পর্শ করারও সুযোগ পাচ্ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠানে ল্যাব সহকারী বা দক্ষ শিক্ষকের অভাব, আবার কোথাও কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতার কারণে এই বিপুল সরকারি সম্পদ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে গ্রামীণ পর্যায়ের এই শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট বাংলাদেশের মূল স্রোতধারা থেকে পিছিয়ে পড়বে।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ২টি  মাদ্রাসায় ১টি কলেজ ও ২০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া হয় আইসিটিডি ডিজিটাল ল্যাবের জন্য কম্পিউটার। শিক্ষার্থীদের আইসিটি ক্লাসে কম্পিউটার বিষয়ক শিক্ষা দেওয়ার জন্য আলাদা ল্যাব করা হয়। লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে ল্যাপটপ দেওয়া হলেও সেগুলো দেওয়ার পর থেকেই ছিল নষ্ট। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ধনাগোদা তালতলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ইন্দুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, নন্দলালপুর ছামাদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, লুধুয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মমরুজকান্দি সপ্তগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়, নীল নগর উচ্চ বিদ্যালয়, আলী আহাম্মদ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিদ্যালয়ের, অধিকাংশ ল্যাপটপগুলোই নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে। বেশিরভাগ সময় ল্যাবগুলো তালাবদ্ধ থাকে। ধুলাবালু জমে সেগুলো অযতœ-অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

ধনাগোদা তালতলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. ফারুকুল ইসলাম বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানের ল্যাব টেকনিশিয়ান দিয়ে ল্যাবটি পরিচালনা করছি। যে ল্যাপটপগুলো দেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত নিম্নমানের। আমার এখানে ১১টি ল্যাপটপের মধ্যে তিনটি ল্যাপটপ পুরোপুরি অকেজো, বাকিগুলো সরাসরি বিদ্যুৎ সংযোগ ছাড়া ব্যবহার করা যায় না। ইন্দুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বশির আহমেদ বলেন, আমার ল্যাবের শতকরা ৯০ ভাগ ল্যাপটপই নষ্ট। শুধু মাঝেমধ্যে প্রজেক্টর দিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়া হয়। লুধুয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. জাকির হোসেন বলেন, আমাদের ল্যাপটপগুলো বেশিরভাগই অকেজো হয়ে আছে। কিছু ল্যাপটপ নিজেদের অর্থায়নে সার্ভিসিং করে ল্যাব পরিচালনা করছি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষার্থীরা জানান, আইসিটি ক্লাস নামমাত্র অনিয়মিতভাবে নেওয়া হলেও প্রজেক্টর বা আধুনিক সরঞ্জাম দিয়ে কখনোই ক্লাস করানো হয় না। ফলে সব প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষেত্রে তা কোনো কাজেই আসছে না।

মতলব উত্তর উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা মো. শাহজাহান জানান, যখন প্রতিষ্ঠানগুলোতে ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয় তখন তাদের সঙ্গে আমাদের একটি চুক্তি হয়েছিল, ল্যাব প্রতিষ্ঠা করতে তখন যা যা প্রয়োজন তা আমরা সবকিছু দেব। কিন্তু পরবর্তী সময় কোনো কিছু সার্ভিসিং প্রয়োজন হলে তারা তা নিজ অর্থায়নে করবে। তারা নিয়মিত ল্যাব ব্যবহার না করার কারণে ল্যাপটপগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি নষ্ট হলে প্রতিষ্ঠান প্রধানরা এগুলো ফেলে রাখেন। ফলে তা একদিন অচল হয়ে যায়।

মতলব উত্তর উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, আমি মতলব উত্তরে অতিরিক্ত দায়িত্বে আছি, আপনার মাধ্যমে বিষয়টা অবগত হলাম আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আমি আইসিটি শিক্ষক এবং প্রধান শিক্ষকদের ডেকে কড়া বার্তা দেব, যাতে তারা ল্যাবগুলোকে সচল করে। যদি তারা এই বিষয়ে পদক্ষেপ না নেয় তাহলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা কুলসুম মনি জানান, ল্যাবগুলো উপজেলা আইসিটি অফিসারের তত্ত্বাবধানে থাকার কথা, ওনার কাছে বিষয়গুলো জেনে আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।