যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে ইরানের নেতৃত্বে মতভেদ, বাড়ছে ক্ষমতার লড়াই

যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও তার মিত্রদের ওপর হামলা জোরদার করলেও যুদ্ধের কৌশল নিয়ে আপাতভাবে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে ইরানের নেতৃত্ব। তাদের লক্ষ্য, ইরান যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের তুলনায় দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম, সেই বার্তা দেওয়া। তবে যুদ্ধের শেষ পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রেই তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছে। সূত্র এপি নিউজ। 

ইরানের নেতৃত্বের একাংশ, বিশেষ করে কট্টরপন্থি ‘পায়দারি’ (পার্সি ভাষায় যার অর্থ ‘স্থিতিশীলতা’) গোষ্ঠী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনার বিপক্ষে। তাদের মতে, যুদ্ধের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত পূর্ণ বিজয়। এই গোষ্ঠী ইসলামী প্রজাতন্ত্রের আদর্শিক অবস্থান আরও কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠা এবং সমাজের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পক্ষে।

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং পার্লামেন্টের স্পিকার ও ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফের সমর্থকেরা ভিন্ন অবস্থানে রয়েছেন। তারা মনে করেন, সামরিক চাপ বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে আরও বড় ছাড় দিতে বাধ্য করাই বাস্তবসম্মত কৌশল। একই সঙ্গে যুদ্ধের কারণে অর্থনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ এবং দেশের পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

কালিবাফের উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মদি নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে লিখেছেন, ‘আলোচনা একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার। সামরিক চাপের পরিপূরক হিসেবে এটি শত্রুকে ছাড় দিতে বাধ্য করার একটি উপায়।’

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার ভেতরে এই প্রকাশ্য মতভেদ যুদ্ধ-পরবর্তী ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির অবস্থান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকের এক হামলায় তার বাবা, সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হন। একই হামলায় মোজতবা খামেনিও আহত হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এরপর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি। তবে কট্টরপন্থি ও মধ্যপন্থি উভয় পক্ষই দাবি করছে, নতুন সর্বোচ্চ নেতার সমর্থন তাদের পক্ষেই রয়েছে। 

এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিল। পরিষদের ১৩ সদস্যের মধ্যে ১২ জন ওই চুক্তির পক্ষে ভোট দেন। সমর্থনকারীদের মধ্যে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ও সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাও ছিলেন। ধারণা করা হয়, একমাত্র বিরোধিতা করেছিলেন পায়দারি আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা সাঈদ জালিলি।

তবে যুদ্ধবিরতি বেশিদিন টেকেনি। উভয় পক্ষ আবার পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু করে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে না দেওয়ায় উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। পরে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় অবরোধ আরোপ করলে চুক্তি থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধাও আর বাস্তবায়িত হয়নি।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরানবিষয়ক পরিচালক আলি ওয়ায়েজের মতে, যুদ্ধবিরতি থেকে কোনো বাস্তব সুবিধা না পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের জবাব কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়ে ইরানের নেতৃত্বে এখন বড় কোনো বিভাজন নেই। তার ভাষায়, ইরানি নেতারা বিশ্বাস করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কেবল শক্তির ভাষাই বোঝেন। তাই তাকে ছাড় দিতে বাধ্য করতে হলে যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে হবে।

চলতি মাসের শুরুতে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির জানাজায় কট্টরপন্থি পায়দারি গোষ্ঠীর প্রভাবও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। সেখানে উপস্থিত জনতার অনেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের দাবি জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, সাঈদ জালিলিকে সমর্থকেরা উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানকে একপর্যায়ে কটূক্তির মুখে পড়তে হয়। কেউ কেউ তাকে উদ্দেশ করে ‘সমঝোতাকারীর মৃত্যু হোক’ বলেও স্লোগান দেন।

বিশ্লেষকদের মতে, কট্টরপন্থিরা রাতের সমাবেশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন আইআরআইবির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রচারে ইরানকে ‘পূর্ণ বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে’ রয়েছে বলে তুলে ধরা হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আপসের পক্ষে অবস্থান নেওয়াদের কঠোর সমালোচনা করা হচ্ছে।