পটুয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালীতে এক বছরে ছয়জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) রদবদল হয়েছে। এ যেন বদলির হিড়িক। একের পর এক ইউএনও আসছেন, দায়িত্ব বুঝে নিচ্ছেন, আবার অল্প সময়ের মধ্যেই চলে যাচ্ছেন অন্য কর্মস্থলে। গত এক বছরে এ উপজেলায় ছয়জন ইউএনওর পরিবর্তন হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন যোগদানের মাত্র এক দিনের মাথায় প্রত্যাহার হয়েছেন।
বর্তমানে পাশের উপজেলা গলাচিপার ইউএনও অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে রাঙ্গাবালীর ইউএনওর দায়িত্ব পালন করছেন।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২ জুলাই ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাজীব দাশ পুরকায়স্থ। ওই বছরের ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তার দায়িত্বকাল ছিল ৫ মাস ২ দিন।
পরে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মো. নাহিদ ভূঞা। ২০২৬ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তার দায়িত্বকাল ছিল ৩ মাস ২২ দিন।
এরপর তৎকালীন গলাচিপা উপজেলার ইউএনও মো. মাহমুদুল হাসান অতিরিক্ত দায়িত্বে রাঙ্গাবালীর ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। তার দায়িত্বকাল ছিল ১ মাস ১ দিন।
পরে ২৭ এপ্রিল থেকে ১৭ মে পর্যন্ত প্রথম দফায় ভারপ্রাপ্ত ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রাঙ্গাবালীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) খায়রুল হাসান। এ সময় তার দায়িত্বকাল ছিল ২০ দিন।
১৭ মে এই উপজেলায় ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন নিরুপম মজুমদার। ২৫ জুন পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তার দায়িত্বকাল ছিল ১ মাস ৮ দিন।
নিরুপম মজুমদারের বিদায়ের পর ২৫ জুন থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় ভারপ্রাপ্ত ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন খায়রুল হাসান। এ সময় তার দায়িত্বকাল ছিল ১ মাস ১ দিন।
সর্বশেষ ২৬ জুলাই সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাওন মজুমদার সুমন ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু পূর্বের কর্মস্থলে থাকাকালীন ডেপুটি স্পিকারের স্বাক্ষর জাল করে ডিও লেটার তৈরির ঘটনায় রাঙ্গাবালীতে যোগদানের পরদিনই তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। ফলে তিনি মাত্র এক দিন দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর ২৭ জুলাই থেকে গলাচিপা উপজেলার ইউএনও আবুজর মো. ইজাজুল হককে তার নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত হিসেবে রাঙ্গাবালীর ইউএনও এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে রাঙ্গাবালীতে দায়িত্ব পালন করা তুলনামূলকভাবে কঠিন। উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘রাঙ্গাবালী একটি বিচ্ছিন্ন উপজেলা। এখানে পদায়ন হলে অনেক কর্মকর্তা আসতে চান না। আবার যারা আসেন, তাদের অনেকেই বেশিদিন থাকতে চান না।’
আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘এখানে প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি প্রায় সারা বছরই নদীভাঙন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জোয়ার-জলোচ্ছ্বাস ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই একজন কর্মকর্তার দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
স্থানীয় লোকজন বলছেন, রাঙ্গাবালী ও গলাচিপার মধ্যে কোনো সড়ক যোগাযোগ নেই। দুই উপজেলার মধ্যে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরত্ব। নৌপথে যাতায়াত করতে হয়। মাঝখানে রয়েছে আগুনমুখা নদী। ফলে একটি উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যায়।
রাঙ্গাবালী প্রেস ক্লাবের সভাপতি কামরুল হাসান বলেন, ‘বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ, উন্নয়ন সমন্বয় সভা, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, ভূমিসংক্রান্ত কার্যক্রম এবং জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইউএনওর সরাসরি উপস্থিতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই সেই সুযোগ তৈরি হয় না।’
স্থানীয়দের দাবি, নদী ও সাগরবেষ্টিত এই উপজেলার বাস্তবতা বিবেচনায় দ্রুত একজন স্থায়ী ইউএনও নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় প্রশাসনিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, একজন ইউএনও একটি উপজেলার প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের মূল সমন্বয়কারী। সার্বক্ষণিক একজন ইউএনও থাকলে প্রশাসনিক কাজে গতি আসে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা অজিত চন্দ্র দেবনাথ বলেন, এলাকার সমস্যা ও সম্ভাবনা জেনে-বুঝে উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে না করতেই বদলি হলে কাজের ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হয়।