সড়কে গাড়ি থামিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ শুনলেন ইউএনও

গাড়ির জানালায় দাঁড়িয়ে এক চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীর স্পষ্ট জবাব—‘আমগোরে ছুটি দিয়া দিছে!’ এরপর বেরিয়ে এলো শিক্ষকদের ক্লাস না নেওয়া, ক্লাসে ঘুমানো ও ফেসবুকে বুঁদ হয়ে থাকার নানা অবিশ্বাস্য অভিযোগ।

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০২ এএম

নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার চর ঈশ্বর ইউনিয়নে সরকারি নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রাথমিক বিদ্যালয় ছুটি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। রাস্তা দিয়ে শিক্ষার্থীদের হেঁটে যেতে দেখে গাড়ি থামিয়ে অনিয়মের কথা জানতে পারেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। পরে বিদ্যালয়টিতে গিয়ে তিনি কোনো শিক্ষকের সন্ধান পাননি।

গত রবিবার (১৬ আগস্ট) দুপুরের পর হাতিয়ার চর ঈশ্বর ইউনিয়নের দক্ষিণ রাজের হাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই চিত্র দেখা যায়।

জানা গেছে, ওই দিন চর ঈশ্বর ইউনিয়নের কয়েকটি রাস্তার উন্নয়নমূলক কাজ পরিদর্শনে যান হাতিয়ার ইউএনও রাসেল ইকবাল। দক্ষিণ রাজের হাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের একটি সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় দুপুরের পর হঠাৎ বই-খাতা হাতে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে দেখে সন্দেহ হলে তিনি গাড়ি থামান।

গাড়িতে বসেই শিক্ষার্থীদের কাছে নির্ধারিত সময়ের আগেই বাইরে বের হওয়ার কারণ জানতে চাইলে চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রী জানায়, তাদের স্কুল ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর ইউএনও গাড়ি থেকে নেমে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বললে শিক্ষকের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে।

শিক্ষার্থীরা ইউএনওর কাছে অভিযোগ করে জানায়—তাদের নির্ধারিত সময়ের আগেই ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়, শিক্ষকরা ঠিকমতো ও নিয়মিত ক্লাস নেন না, এমনকি ক্লাস চলাকালীন অনেকে ঘুমান কিংবা মোবাইলে ফেসবুক ব্যবহার করেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকরা অশালীন ও অশোভন আচরণ করেন বলেও তারা অভিযোগ তোলে।

ঘটনার পরপরই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছান ইউএনও। তবে সেখানে গিয়ে তিনি কোনো শিক্ষককেই পাননি। পরবর্তীতে তিনি মোবাইলে শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এবং বিষয়টি সাথে সাথে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন।

বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বই-খাতা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে একটি ছবি তুলে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেন ইউএনও। ওই পোস্টে শিক্ষার্থীদের থেকে পাওয়া বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন। সোম ও মঙ্গলবার—টানা দুই দিন ধরে অনিয়মের বর্ণনা সহ ছবিটি ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং এলাকা জুড়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

এ ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক জানান, শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই খারাপ আচরণ করে আসছিলেন। বিষয়টি বারবার প্রধান শিক্ষককে জানানো হলেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন বা সংশোধন হয়নি।

তবে সময়ের আগে ছুটি দেওয়ার বিষয়ে সাফাই গেয়ে দক্ষিণ রাজের হাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাজল রানী পাল বলেন, “পরদিন সোমবার থেকে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল। তাই শিক্ষার্থীদের অনুরোধেই তাদের কিছুটা আগে ছুটি দেওয়া হয়। তবে আমার কয়েকজন সহকারী শিক্ষকের ক্লাস ফাঁকি দেওয়া ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণের বিষয়টি আমি আগেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলাম। তদন্ত হওয়ার পরও তাদের স্বভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি।”

পুরো বিষয়টি নিশ্চিত করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল জানান, “নিয়মিত তদারকির অংশ হিসেবে আমি উন্নয়ন কাজ পরিদর্শনে বের হয়েছিলাম। স্কুলের পাশের রাস্তাটিতে গেলে শিক্ষার্থীরা আমার সঙ্গে কথা বলতে এসে দাঁড়ায়। তাদের সব অভিযোগ শোনার পর আমি নিজে স্কুলে গিয়ে একজন শিক্ষককেও খুঁজে পাইনি। এ বিষয়ে শিক্ষা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।”

এদিকে অনিয়মের বিষয়টি নিশ্চিত করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার বলেন, “আমরা পুরো ঘটনা সম্পর্কে অবগত হয়েছি। ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কারণ দর্শানোর নোটিশ (কৈফিয়ত তলব) দেওয়া হয়েছে। জবাব পাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত