ফিফা কাউন্সিলে বিদ্রোহের মুখে ইনফান্তিনো

বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির ব্যর্থ চেষ্টার পর এবার ফিফা কাউন্সিলের ভেতরেই নজিরবিহীন বিদ্রোহের মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। কাউন্সিল সদস্যরা একটি জরুরি সাধারণ সভা (ইজিএম) আহ্বানের চেষ্টা করছেন, যা দ্রুতই ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জে রূপ নিতে পারে।

ব্রিটেনের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিশ্বকাপের স্বত্ব বিক্রির গোপন পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ার আগেই মূলত ইনফান্তিনোকে সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একাধিক টেলিফোন কলের পর বিশ্বকাপ চলাকালে ফোলারিন বালোগুনের ওপর থেকে বিতর্কিতভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ সদস্যরা এর ওপর একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। উয়েফাসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ফুটবলের শীর্ষ কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে ইনফান্তিনোর ওপর থেকে আস্থা হারানোর কথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন।

ফিফা কাউন্সিল হলো বিশ্বের এই সর্বোচ্চ ফুটবল সংস্থার মূল নীতিনির্ধারণী ফোরাম, যা প্রেসিডেন্ট ইনফান্তিনো, ৮ জন ভাইস-প্রেসিডেন্ট এবং ৬টি কনফেডারেশনের ২৮ জন প্রতিনিধিসহ মোট ৩৭ জন সদস্য নিয়ে গঠিত। ফিফার সংবিধান অনুযায়ী, ৩৭ সদস্যের মধ্যে অন্তত ৫০ শতাংশ অর্থাৎ ১৯ জন সদস্য একমত হয়ে প্রস্তাব পেশ করলেই জরুরি সাধারণ সভা ডাকতে ফিফা বাধ্য।

তথ্যমতে, ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনারের ভাই জোশুয়া কুশনারের বিনিয়োগকারী সংস্থা ‘থ্রাইভ ক্যাপিটাল’-এর কাছে ফিফা বিশ্বকাপের ২০ শতাংশ স্বত্ব গোপনে বিক্রির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার আগেই অন্তত ১০ জনের বেশি সদস্য ইজিএম ডাকার প্রস্তাবে সই করেছিলেন। ক্ষুব্ধ সদস্যরা হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন বালোগুন ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তে রাজি না হলে তারা সরাসরি ইনফান্তিনোর পদত্যাগের দাবি তুলবেন। উল্লেখ্য, ট্রাম্পের রাজনৈতিক চাপে নতিস্বীকার করে ফিফা তার নিরপেক্ষতা ভঙ্গ করেছে এমন অভিযোগ এনে নরওয়েজিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দিয়েছে। ফিফা বিষয়টি এথিকস কমিটির স্বাধীন সিদ্ধান্ত বলে দাবি করলেও এখনো কোনো লিখিত রিপোর্ট প্রকাশ করেনি।

উয়েফা, কনকাকাফ (উত্তর ও মধ্য আমেরিকা) এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের তীব্র বিরোধিতার মুখে শনিবার ভোরে বিশ্বকাপ বিক্রির পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হন ইনফান্তিনো। এই পিছু হটাকে নিজেদের সাফল্য মেনে বিদ্রোহীরা এখন আরও সংগঠিত।

তবে ইনফান্তিনোকে পদচ্যুত করতে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়া কিছুটা জটিল। ৩৭ সদস্যের কাউন্সিলে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ১৪ জন প্রতিনিধি রয়েছেন। ফলে ইনফান্তিনোর ওপর চূড়ান্ত চাপ সৃষ্টি করতে তাদের এশিয়ান কনফেডারেশনের সমর্থন প্রয়োজন। অন্যদিকে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন ও দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল কনফেডারেশন এখনো ইনফান্তিনোর পাশে রয়েছে। তাছাড়া কাতার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও ইনফান্তিনোকে প্রেসিডেন্ট  হিসেবে বহাল রাখার পক্ষে বিবৃতি দিয়েছে।

বিকল্প নেতৃত্ব ও অনাস্থা প্রস্তাবের পথ : আগামী নভেম্বরের আগে ফিফা কাউন্সিলের কোনো নিয়মিত বৈঠক নেই। ফলে বিরোধীরা দ্রুত ইজিএম ডেকে সেখানে ইনফান্তিনোকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য করার কৌশল নিয়েছেন। তিনি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি প্রত্যাখ্যান করলে তাকে সরাতে নতুন সভাপতি প্রার্থী দাঁড় করানোর প্রক্রিয়া জোরদার হবে।

কাতারের অবস্থান স্পষ্ট থাকায় পিএসজি প্রেসিডেন্ট নাসের আল-খেলাইফির সভাপতি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে কনকাকাফ প্রেসিডেন্ট ভিক্টর মন্তাগলিয়ানি কিংবা ২০১৬ সালের নির্বাচনে সামান্য ব্যবধানে হেরে যাওয়া এএফসি প্রেসিডেন্ট শেখ সালমান এই দৌড়ে নামবেন কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

ইনফান্তিনোর পক্ষে এখন পর্যন্ত ২০০টির বেশি সমর্থনসূচক চিঠি থাকলেও সেগুলো যেকোনো সময় প্রত্যাহার করা সম্ভব। ১৮ নভেম্বরের মধ্যে নতুন কোনো প্রার্থীর নির্বাচনে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার শেষ সময়। অন্যদিকে, ফিফার ৪৩টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশন লিখিত আবেদন জমা দিলে একটি ‘জরুরি ফিফা কংগ্রেস’ ডেকেও প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট দেওয়া যেতে পারে।