পরিবারের হাল ধরতে তিন মাস আগে রাশিয়া গিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের যুবক আদনান। কিন্তু সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত তাকে ঠেলে দেয় যুদ্ধের ময়দানে। দালালের খপ্পরে পড়ে তার ঠাঁই হয় ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধরত রুশ সেনাবাহিনীতে। শুধু আদনান নন, তার মতো আরও ২৯ যুবককে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেয় দালালচক্র। রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে গিয়ে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় আহত আদনান এখন মস্কোর একটি হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। আর অন্যদের ভাগ্যে কী ঘটেছে এখনো জানে না পরিবার। বাংলাদেশ সরকার বারবার আশ্বাস দিলেও দুই মাসে দেশে ফেরাতে পারেনি কাউকেই।
আন্তর্জাতিক কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অন্তত ১০৪ জন নাগরিক বড় অঙ্কের আর্থিক সুবিধার আশায় বিভিন্ন মাধ্যমে রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে অনেককে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকজন যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় গত জুন মাসের শেষ দিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নিযুক্ত হওয়া বাংলাদেশের নাগরিকদের ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানায়।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার পক্ষে ইউক্রেনের ভেতরে যুদ্ধরত অবস্থায় অন্তত চারজন বাংলাদেশি বন্দি হয়েছেন। বন্দি হওয়ার সময় তাদের কাছে বাংলাদেশের পাসপোর্ট ছিল না। ইউক্রেন তাদের ‘রাশিয়ার সৈন্য’ হিসেবে বন্দি রেখেছে। এই চার যুদ্ধবন্দি বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক হস্তক্ষেপে নিরাপদে দেশে ফিরতে চান। তবে দেশে ফেরার আগে তারা রাশিয়ার সেনাবাহিনী থেকে তাদের পাওনা বকেয়া বেতন ও প্রতিশ্রুত অর্থ সংগ্রহ করারও দাবি জানান।
এ বিষয়ে অবহিত একজন কূটনীতিক দেশ রূপান্তরকে গত শনিবার বলেন, রাশিয়ায় কাজ করার জন্য বাংলাদেশ থেকে কর্মী হিসেবে অনেকে যান। সেখানে যাওয়ার পর ‘বহু টাকা’ এবং অন্তত এক বছর কাজ করলে ‘রুশ পাসপোর্ট’ পাওয়ার প্রলোভনে পড়ে অনেকে দেশটির সেনাবাহিনীতে যুক্ত হন। রুশ সেনাবাহিনী প্রশিক্ষণ দিয়ে একপর্যায়ে তাদের ইউক্রেনে যুদ্ধে পাঠায়। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হামলায় আহত হলে অথবা প্রাণহানির আশঙ্কা দেখা দিলে তারা দেশে ফেরানোর জন্য আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন।
বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট একজন কূটনীতিক জানান, ঢাকায় রাশিয়ার দূতাবাসের মাধ্যমে এবং মস্কোয় বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে ইতিমধ্যে দেশটিকে অনুরোধ করা হয়েছে যে, অন্য পেশার জন্য বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া হলেও তাদের যেন রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা না হয় এবং কাউকে যেন যুদ্ধে পাঠানো না হয়।
এ ছাড়া, যাদের যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে, তাদের ফেরত আনার জন্যও রাশিয়াকে অনুরোধ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি নেই বলে কর্মকর্তারা স্বীকার করেন।
ইউক্রেনে বাংলাদেশের দূতাবাস নেই। পোলান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস দেশটির রাজধানী ওয়ারশতে অবস্থিত ইউক্রেন মিশনের মাধ্যমে দেশটির (ইউক্রেন) সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে থাকে।
ইউক্রেনে আটক হওয়া নাগরিকদের ফেরত আনার বিষয়ে জানতে ঢাকা থেকে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে ওয়ারশর বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন কূটনীতিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি।’
কর্মকর্তারা জানান, ইউক্রেন অথবা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যাদের ফেরত পাঠানোর জন্য আত্মীয়স্বজন অথবা সরকারের মাধ্যমে ঢাকা থেকে অনুরোধ এসেছে, প্রতিটি অনুরোধের বিষয়ে ইউক্রেন দূতাবাসের মাধ্যমে দেশটির সরকারকে জানানো হয়েছে। ইউক্রেন দূতাবাস জবাবে বলেছে, তারা কিয়েভে দেশটির সরকারকে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধ অবহিত করেছে।
তারা বলছেন, রাশিয়ার বহু সৈনিক ইউক্রেনে যুদ্ধরত অবস্থা বন্দি হয়েছেন। যুদ্ধবন্দি হিসেবে কেউ ইউক্রেনের সেনাদের দ্বারা আটক হয়ে থাকলে ‘বাস্তবতা’ বিবেচনায় ‘বাংলাদেশি হিসেবে’ তাদের ফেরানোর সুযোগ শিগগির মিলবে, এমন সম্ভাবনা কম। এর বড় কারণ, বাংলাদেশের যারা আটক হচ্ছেন, তাদের নিজ দেশের পাসপোর্ট সঙ্গে না থাকায় ‘রাশিয়ার সৈন্য’ হিসেবেই তাদের আটক রাখা হচ্ছে।
রাশিয়ায় ৩০ যুবককে প্রতারণামূলকভাবে প্রেরণের দায়ে গত ১ জুন তিন রিক্রুটিং এজেন্সি আর এস ইন্টারন্যাশনাল, জাবাল-ই-নূর ও টিএস ওভারসিসের লাইসেন্স প্রত্যাহার ও জামানত বাজেয়াপ্তের কথা জানান প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক। তখন তিনি বলেছেন, ভুক্তভোগী যুবকদের দ্রুত ও নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ইতিমধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে জোর তৎপরতা শুরু হয়েছে এবং তাদের শিগগির দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। তবে দুই মাস পেরিয়ে গেলেও হতভাগ্যদের এখনো ফিরিয়ে আনতে পারেনি সরকার।
জানা গেছে, সৌদিফেরত নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদী এলাকার বাসিন্দা আদনান হোসেন দালালের খপ্পরে পড়ে উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভনে যান রাশিয়া। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কথা চিন্তা করে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাগজপত্র যাচাই-বাছাইও করেন তিনি। তবে গত ৭ মে রাশিয়ায় পৌঁছানোর কয়েক দিনের ব্যবধানে আদনানকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। আদনানের মতো আরও ২৯ যুবককেই বরণ করতে হয় একই পরিণতি। জনপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা করে নিয়েছে এজেন্সি ও দালাল চক্র।
হতভাগ্য ওই যুবকদের প্রথমে যুদ্ধের জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ দেয় রুশ সেনাবাহিনী। এরপর তাদের পাসপোর্ট জব্দ করে সেনাবাহিনীর পোশাক পরিয়ে পাঠিয়ে দেয় ইউক্রেন যুদ্ধে। যুদ্ধে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় আহত আদনান মস্কোর একটি হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। আর বাকি ২৯ জনের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা অজানা। এদের মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জেরে আরও দুই যুবক রবিন মিয়া ও রেজাউল করিমও রয়েছেন।
আদনানের মা পাপিয়া বেগম ডলি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, আদনানের স্ত্রী-সন্তান রয়েছে। এজেন্সিগুলো আদনানসহ ৩০ জনকে একটি কোম্পানিতে চাকরি দেবে বলে রাশিয়া নেয়। এরপর জুলিয়া নামে এক রুশ নারীর কাছে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়। সেখানে তাদের সামান্য খাবার ও পানি দিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন সীমান্তে যুদ্ধে পাঠানো হয়। কয়েকদিন আগে আদনান ড্রোন হামলায় মারাত্মক আহত হয়ে তিন দিন ঘটনাস্থলে পড়েছিল। পরে তাকে প্রথমে রাশিয়ার মিলিটারি হাসপাতাল ও পরে মস্কোর একটি হাসপাতালে তিন দফা অপারেশন করে স্পিøন্টার বের করা হয়। কিছুটা সুস্থ হয়ে আদনান ওই হাসপাতালের চিকিৎসকের মাধ্যমে আমাদের কল করে বিষয়টি জানায়। এরপর আমরা রাশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসকে খবর দিলে তারা সেখানে প্রথমে গেলেও প্রবেশ করতে পারেনি। পরে রাশিয়ার সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রবেশ করে। কিন্তু এখন শুনছি, আদনানকে অন্য হাসপাতালে নেওয়া হবে। আমরা আদনানসহ ৩০ যুবককে দেশে ফেরাতে সরকারের সবগুলো দপ্তরে গেছি। তারা শুধু আশ্বাসই দিচ্ছে, ফেরত আনার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমাদের অনুরোধ দ্রুত আদনানসহ ৩০ যুবককে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়ে মায়ের কোলে সন্তানদের ফিরিয়ে দিন।
সিদ্ধিরগঞ্জে অটোরিকশা চালাতেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম রবিন মিয়া। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকতেন পাইনাদী এলাকার দোয়েল চত্বরে। ভালো চাকরি ও উচ্চ বেতনের আশায় দালালের খপ্পরে পড়ে ধারদেনা করে রাশিয়ায় পাড়ি জমান। সেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া রবিন মিয়া বেঁচে আছেন কি না জানে না তার পরিবার। ১০ লাখ টাকা ঋণের বোঝা ও দুই সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা রবিনের স্ত্রী পেয়ারা আক্তার। তিনি জানান, আমার স্বামী বেশ কিছুদিন আগে ফোন দিয়ে বলেছে তার জন্য দোয়া করতে। কিন্তু এখন তার কী অবস্থা কিছুই জানি না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বনকে ফিরিয়ে দিন। নয়তো তার সঙ্গে আমাদেরও মরা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।
দুবাইফেরত সিদ্ধিরগঞ্জের আরেক যুবক কাজী রেজাউল করিম সাত মাস আগে বিয়ে করেন। পরিবারের বড় ছেলে করিমের ওপরেই ছিল সংসারের হাল। ভালো চাকরি ও উচ্চ বেতনের আশায় দালালের খপ্পরে পড়ে তিনিও ঋণ করে রাশিয়া যান। তাকেও রাশিয়ার পক্ষে যেতে হয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধে। তবে করিম বেঁচে আছেন কি না সেটা জানে না পরিবার। ছেলের দুশ্চিন্তায় বৃদ্ধ পিতা-মাতা ক্রমশই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।