চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার বাউরিয়া উপকূলে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগের সাবমেরিন কেবল আবারও অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। কয়েক মাস আগে নদীভাঙনে ১৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ের এই কেবলটির একটি অংশ দৃশ্যমান হয়ে পড়ে। তখন পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িক প্রতিরোধের চেষ্টা করে। তবে জোয়ারের তীব্র স্রোতে সেই জিও ব্যাগ ভেসে যাওয়ায় নতুন করে প্রায় ৩০ ফুট কেবল উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামোটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সন্দ্বীপে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চলতি বছরের জুন মাসে বাউরিয়া সাগরতীরবর্তী এলাকায় নদীভাঙনের তীব্রতা আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় সূত্র থেকে জানা যায়, এই ভাঙনের ফলে প্রথমবারের মতো জাতীয় গ্রিডের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি ৩৩ হাজার ভোল্ট ক্ষমতাসম্পন্ন সাবমেরিন কেবলের কিছু অংশ মাটির নিচ থেকে বের হয়ে পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। বিষয়টি জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে এক বিরাট হুমকি ও চরম ঝুঁকি তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে কেবল উন্মুক্ত হওয়ার এই বিপজ্জনক সচিত্র সংবাদটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকাসহ সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পানি উন্নয়ন বোর্ড দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তারা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং ভাঙনকবলিত ওই নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ (বালিভর্তি বিশেষ ব্যাগ) ফেলে অস্থায়ীভাবে নদীভাঙন প্রতিরোধের উদ্যোগ নেয়, যাতে কেবল দুটি বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পায়।
তবে সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, জোয়ারের তীব্র স্রোতে অধিকাংশ জিও ব্যাগ স্থানচ্যুত হয়ে গেছে। ফলে জিও ব্যাগ ফেলা স্থানের পশ্চিম পাশে খালের প্রবল স্রোতের মুখে আবারও প্রায় ৩০ ফুট সাবমেরিন কেবল দৃশ্যমান হয়ে রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিটি জোয়ারে ভাঙনের পরিমাণ বাড়ছে এবং দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে কেবল ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জানা গেছে, ২০১৮ সালে প্রায় ১৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সাগরের ১৮ থেকে ৩০ ফুট গভীরে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করে দুটি সাবমেরিন কেবল স্থাপন করা হয়। প্রতিটি কেবলে তিনটি পাওয়ার কোর এবং একটি অপটিক্যাল ফাইবার রয়েছে। এসব কেবলের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা সন্দ্বীপ উপজেলার বাউরিয়া সীমান্ত দিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের ল্যান্ডিং স্টেশনে পৌঁছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, দুটি কেবলের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। বর্তমানে একটি ক্যাবলের মাধ্যমে প্রায় ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। ৫০ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে সন্দ্বীপের প্রায় ৫৩ হাজার গ্রাহক জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছেন। এছাড়া আরও প্রায় ৫০ হাজার গ্রাহককে এ সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। উন্মুক্ত কেবলটি বাউরিয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে বিদ্যুৎ বিভাগের ল্যান্ডিং স্টেশন থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে। ভাটার সময় কেবলের বড় অংশ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক কৌতূহলী মানুষ কেবলের ওপর উঠে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বাউরিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. রিয়াদ বলেন, ‘গত এক বছরে প্রায় আধা কিলোমিটার ভূমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের কারণে মাটি সরে গিয়ে সাবমেরিন কেবল উন্মুক্ত হয়েছে। ভাটার সময় এটি স্পষ্ট দেখা যায়। অনেকেই না বুঝে কেবলের ওপর উঠে ভিডিও করেন, যা খুবই বিপজ্জনক।’
এদিকে এলাকাবাসীর অভিযোগ, জিও ব্যাগ দিয়ে অস্থায়ীভাবে ভাঙন ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থায়ী তীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। তাদের দাবি, অবিলম্বে টেকসই তীররক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সাবমেরিন কেবলের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎ বিপর্যয়, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এমনকি নৌযান দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটতে পারে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি ও স্থায়ী উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) চট্টগ্রাম (উত্তর) অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শহীদুল ইসলাম মৃধা বলেন, কেবল স্থাপনের সময় এলাকাটি নিরাপদ বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রাকৃতিক কারণে এখন নদীভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কেবলের নিরাপত্তার বিষয়টি প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। এখন যেহেতু পুনরায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হবে।’