ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের উপকণ্ঠ সার্সেলে অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম বৃহৎ সাংস্কৃতিক আয়োজন ‘ফ্রাঙ্কো-বাংলা সামার ফেস্ট-২০২৬’। দিনব্যাপী এই উৎসবের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন বাংলাদেশের কিংবদন্তি রক তারকা, নগর বাউলখ্যাত শিল্পী জেমস। তার জনপ্রিয় গানগুলোর সঙ্গে হাজারো দর্শক একযোগে কণ্ঠ মিলিয়ে এক অনন্য উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি করেন। প্রবাসে বাংলাদেশি সংস্কৃতি, সংগীত ও ঐতিহ্যের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায় পরিণত হয় পুরো আয়োজন।
গতকাল রবিবার (২ আগস্ট) সাপ্তাহিক ছুটির দিনে প্যারিসের শহরতলি সার্সেলের একটি খোলা মাঠে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। দুপুর ১২টায় নিবন্ধনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, তিন হাজারেরও বেশি দর্শক এতে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিলেন নগর বাউল ব্যান্ডের প্রধান শিল্পী জেমস। মঞ্চে উঠে তিনি তার একের পর এক জনপ্রিয় গান পরিবেশন করলে দর্শকরা করতালি, উচ্ছ্বাস এবং সম্মিলিত কণ্ঠে গানের সঙ্গে অংশ নেন। পুরো অনুষ্ঠানস্থল পরিণত হয় এক বিশাল সাংস্কৃতিক উৎসবে।
জেমসের পাশাপাশি বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড জলের গান তাদের স্বকীয় ধারার সংগীত পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করে। এছাড়া জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী রাহুল আনন্দ তার পরিবেশনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেন। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বাংলাদেশি শিল্পী বিন্তি গান পরিবেশন করে দর্শকদের প্রশংসা কুড়ান।
আয়োজক কমিটির সদস্যরা জানান, প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন সুদৃঢ় করা এবং বাংলা সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষেই প্রতিবছর এ ধরনের আয়োজন করা হয়। ২০২৩ সালে একই ধরনের আয়োজনের পরিকল্পনা থাকলেও সে সময় ফ্রান্সের সার্বিক পরিস্থিতির কারণে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ বিরতির পর এবারের আয়োজন প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সফল হয়েছে বলে তারা জানান।
তাদের ভাষ্য, প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ও উচ্ছ্বাস প্রমাণ করেছে যে দীর্ঘদিন ধরেই তারা এমন একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক আয়োজনের অপেক্ষায় ছিলেন। সকাল থেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে দর্শকরা অনুষ্ঠানস্থলে আসতে শুরু করেন। শিশু থেকে প্রবীণ, সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে উৎসবটি এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
অনুষ্ঠানস্থলে যাতায়াতের পথে ফ্রান্সের গণপরিবহন ব্যবস্থায় কিছুটা বিঘ্ন সৃষ্টি হলেও দর্শকদের ভোগান্তি কমাতে আয়োজক কমিটি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে। ট্রেন স্টেশন থেকে অনুষ্ঠানস্থল পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তিনটি শাটল বাসের ব্যবস্থা করা হয়। এসব বাস সারাদিন দর্শকদের আনা-নেওয়ার দায়িত্ব পালন করে।
শুধু সংগীতানুষ্ঠান নয়, বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ঘিরেও ছিল নানা আয়োজন। দিনব্যাপী বিভিন্ন গ্রামীণ ও বিনোদনমূলক খেলাধুলা দর্শকদের আকর্ষণ করে। পাশাপাশি দেশীয় পোশাক, অলংকার, হস্তশিল্প ও বিভিন্ন পণ্যের স্টল দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
খাবারের অংশেও ছিল বাংলাদেশের ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ উপস্থিতি। সমুচা, সিঙ্গাড়া, ঝালমুড়ি, পিঠা-পুলি, বিরিয়ানি, ডাবের পানি এবং বিভিন্ন কোমল পানীয়সহ দেশীয় খাবারের স্টলে ছিল উপচে পড়া ভিড়। পান-সুপারির স্টলও দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সার্সেলের স্থানীয় সংসদ সদস্য, ডেপুটি মেয়র, স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা, বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ।
দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল র্যাফেল ড্র। এতে বিজয়ী হিসেবে একজন প্রবাসী বাংলাদেশি নারী একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি জিতে নেন। বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হলে উপস্থিত দর্শকদের করতালি ও উচ্ছ্বাসে পুরো অনুষ্ঠানস্থল আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে।
আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীদের মতে, প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতি, সংগীত ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় করতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।