বর্তমানে পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যের সংকট ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ দূষণ। এই প্লাস্টিক কণাগুলো নদী, সমুদ্র ও মাটির পাশাপাশি খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে ধীরে ধীরে মানবদেহে প্রবেশ করছে। সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণায় বাজারে বিক্রীত দুধ, ভোজ্য তেল ও টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ায় উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস এবং পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার গবেষণার ফল প্রমাণ করেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। যে কারণে মাইক্রোপ্লাস্টিক কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, ভোক্তা সুরক্ষা এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় কাঁচা দুধ, ব্র্যান্ডের তরল ও গুঁড়া দুধ এবং দইয়ের নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক ও কৃত্রিম তন্তুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি ১০০ মিলিলিটার প্রক্রিয়াজাত দুধে গড়ে ১৫৬.০৬টি প্লাস্টিক কণা রয়েছে, যা কাঁচা দুধের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অন্যদিকে, ESDO-এর পরীক্ষায় বাজারে প্রচলিত ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে প্রায় ৭৬.৫ শতাংশ ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর আগে চাল, লবণ, চিনি ও বোতলজাত পানিতে একই ধরনের দূষণের তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। বিভিন্ন গবেষণা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয়, প্রতিদিনের খাদ্য ও ব্যবহার্য পণ্যের মাধ্যমে অদৃশ্য প্লাস্টিক কণা নীরবে মানবদেহে প্রবেশ করছে। যা ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের উৎস বহুমাত্রিক। প্রথমত, শিল্পোৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত প্লাস্টিকের পাইপ, সিন্থেটিক ফিল্টার, প্লাস্টিক প্যাকেজিং, ড্রাম এবং পরিবহনের সময় ঘর্ষণের ফলে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা সরাসরি খাদ্যে মিশে যায়। দ্বিতীয়ত, পরিবেশে অবাধে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য আলোর অতিবেগুনি রশ্মি, তাপ ও আবহাওয়াজনিত কারণে ভেঙে অতি ক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। কণাগুলো পরবর্তী সময়ে মাটি, ভূগর্ভস্থ পানি এবং পশুখাদ্যের মাধ্যমে শস্য, মাছ, মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যে প্রবেশ করছে। এর ফলে পুরো খাদ্যশৃঙ্খল দূষিত হয়ে, অদৃশ্য প্লাস্টিক কণা শেষ পর্যন্ত মানুষের খাদ্যে পৌঁছে যাচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে খাদ্যের মাধ্যমে অতিরিক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করলে তা দীর্ঘমেয়াদি কোষের ক্ষতি, অভ্যন্তরীণ প্রদাহ এবং হরমোনের স্বাভাবিক কার্যকলাপে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটাতে পারে। যে কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা, খাদ্যশৃঙ্খল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে প্লাস্টিক দূষণ অবিলম্বে কমিয়ে আনার ওপর জোর দিচ্ছেন। দীর্ঘমেয়াদে অসংক্রামক রোগের হার বৃদ্ধি পেলে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে, পরিবারের সঞ্চয় কমে এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। ফলে উৎপাদন, শ্রমবাজার ও স্বাস্থ্য খাতে ওপর তার প্রভাব পড়বে। দেশের অর্থনীতি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হিমায়িত মাছ ও দুগ্ধজাত পণ্যের রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাজারগুলো খাদ্যনিরাপত্তায় কঠোর আইন প্রণয়ন করলেও, মাইক্রোপ্লাস্টিকের জন্য বিশ্বব্যাপী কোনো নির্দিষ্ট সহনীয় মাত্রা নির্ধারিত হয়নি। তবে উন্নত বাজারে ভোক্তা অধিকার সংস্থাগুলো এ বিষয়ে ক্রমশ সোচ্চার হয়েছে। যদি বাংলাদেশের রপ্তানিকৃত খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক পরীক্ষায় ধরা পড়ে, তবে তা প্রত্যক্ষ নিষেধাজ্ঞার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর । তখন ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে এবং অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা (Non-tariff barriers) তৈরি হবে।
দীর্ঘমেয়াদে এটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন কমিয়ে নতুন বাজারে প্রবেশকে বাধাগ্রস্ত করবে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ থাকলেও, খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্তকরণ ও নিয়ন্ত্রণে, সুনির্দিষ্ট জাতীয় মানদণ্ড ও নিয়মিত তদারকি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বিভিন্ন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের দাবি করলেও, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত প্লাস্টিক সামগ্রীর গুণগত মান পরীক্ষাগারে যাচাই হয় না। যদিও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বন্ধের ফেজ-আউট নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর প্রয়োগ ও শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চরম উদাসীনতা রয়েছে। এই অদৃশ্য দূষণ রোধে বিএসটিআই ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ল্যাব সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ এবং কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। বিশ্বের অনেক দেশ খাদ্য প্যাকেজিংয়ে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে, পরিবেশবান্ধব ও ফুড-গ্রেড উপকরণ ব্যবহারে, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে কর-সুবিধা ও নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে। গবেষণা, নীতিমালা এবং শিল্পব্যবস্থাপনায় আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করে জনস্বাস্থ্যকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। নিত্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের নীরব বিপর্যয় মোকাবিলায়, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। প্রথমত, বিএসটিআই ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পরীক্ষার জন্য উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন, জাতীয় সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড প্রণয়ন এবং কঠোর বাজার তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, টুথপেস্ট ও কসমেটিকসে ক্ষতিকর মাইক্রোবিডসের ব্যবহার ধাপে ধাপে নিষিদ্ধ করতে হবে এবং খাদ্যশিল্পে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও ফুড-গ্রেড প্যাকেজিংয়ের ব্যবহারে বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে।
প্লাস্টিক বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং বিকল্প সাশ্রয়ী উপকরণ তৈরিতে সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ সংক্রান্ত গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ এবং গণমাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারলে, জনস্বাস্থ্য সংকট অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয় এটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ভোক্তার সম্মিলিত দায়িত্ব।
লেখক : শিক্ষক ও কলাম লেখক
jasim6809786@gmail.com