প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের দৃশ্যপট

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৩:২৯ এএম

প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের ভয়াবহ দৃশ্যপট পর্যালোচনায় বায়ুদূষণ কঠিন এক বাস্তবতায় নিপতিত। বর্তমান সময়ে দেশ ও বিশ্বপরিম-লে বায়ুদূষণের প্রভাব সচল জীবনযাত্রার সব অনুষঙ্গগুলোকে তীব্র চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানামুখী উন্নয়নমূলক কর্মযজ্ঞে বিশ্বের বিভিন্ন শহরে বায়ুদূষণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন ও প্রায়োগিক পন্থা অবলম্বন অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ বাযুদূষণে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ এবং রাজধানী ঢাকা প্রায়শই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে। মে মাসের মাঝামাঝি সময়েও ঢাকার বাতাসের মান ২০০ এর বেশি স্কোর নিয়ে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ বা ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে ছিল। গণমাধ্যমে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক বায়ুমান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের তথ্যানুসারে, মে মাসের ১১ তারিখ বিশ্বের ১২২ শহরের মধ্যে ১৯৫ স্কোর নিয়ে বিশ্বে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে উঠে আসে ঢাকা। একই সময়ে ১৫৭ স্কোর নিয়ে দূষিত শহরের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ভারতের দিল্লি। এরপরের অবস্থানে ছিল ভিয়েতনামের হ্যানয়। যার বায়ুমান স্কোর ১৫৬। বায়ুমান স্কোর ১৩৭ ও ১৩০ নিয়ে ৪র্থ ও ৫ম স্থানে ছিল যথাক্রমে চীনের চেংডু ও ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা।

ঢাকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বায়ুদূষণের মাত্রা। বিজ্ঞজনদের মতে, চট্টগ্রামে পাহাড়-গাছপালা ও সমুদ্রপরিবেষ্টিত হওয়ায় বায়ুদূষণ কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও; অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, অবৈধ ইটভাটা, কলকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, গাড়ির কালো ধোঁয়াসহ নানাবিধ কারণে চট্টগ্রামে বায়ুদূষণ বাড়ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর বায়ুদূষণের জন্য নগরীর ১৮টি স্টিল রি-রোলিং মিল ও ৯টি সিমেন্ট কারখানাকে দায়ী করেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের বাতাস এখন অস্বাস্থ্যকর। বাতাসের মান পরিমাপের জন্য স্থাপিত পরিবেশ অধিদপ্তরের তিনটি স্টেশনের পর্যবেক্ষণে চট্টগ্রামের বাতাসের মান স্বাস্থ্যকর নয় বলেই প্রতীয়মান। শীতকালে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় বাতাসের মান আরও কমে যায়। বায়ুদূষণের কারণে এখানকার মানুষ ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগে ভুগছে। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বায়ুদূষণের কারণে চট্টগ্রামবাসীর গড় আয়ু ৪ দশমিক ৮ বছর কমে যাচ্ছে। 

আমাদের সবার জানা, প্রতিদিনকার বাতাসের মান নিয়ে তৈরি করা একিউআই সূচক এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট শহরের বাতাস কতটুকু নির্মল বা দূষিত সে সম্পর্কে মানুষ তথ্য ও সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে অবহিত হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশে একিউআই নির্ধারণ করা হয় দূষণের পাঁচ ধরন; যথা বস্তুকণা (পিএম১০ ও পিএম২.৫), এনও২, এসও২ এবং ওজোন (ও৩) এর ভিত্তিতে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মানদন্ডে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) ১৫১ থেকে ২০০ হলে নগরবাসীর প্রত্যেকের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। একিউআই স্কোর ২০১ থেকে ৩০০ হলে স্বাস্থ্য সতর্কতাসহ তা জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচ্য। এই পরিস্থিতিতে শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ রোগীদের বাড়ির ভেতরে এবং অন্যদের বাড়ির বাইরের কর্মকান্ড সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে।

দূষিত বাতাসে কাচ-ধোঁয়া বা ধুলার মতো কঠিন ও তরল পদার্থ উড়ে বেড়ায়; যেগুলোকে ‘বস্তকণা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এসব বস্তুকণার মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হলো পিএম ২.৫। বস্তুতপক্ষে পিএম বা পার্টিকুলেট ম্যাটার হচ্ছে বাতাসে ভেসে বেড়ানো কঠিন ও তরল পদার্থে মিশ্রণ যা অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া খালি চোখে দেখা যায় না। এগুলো খুব সহজে নিঃশ্বাসের সঙ্গে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলতে পারে। বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক উপাদানের সমন্বয়ে পিএম তৈরি হতে পারে। পিএম ২.৫ এর ব্যাস ২ দশমিক ৫ মাইক্রনের কম। বায়ুদূষণ হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি), ফুসফুসের ক্যানসার ও শিশুদের মধ্যে একিউট লোয়ার রেসপিরেটরি সংক্রমণসহ অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

মূলত বায়ুদূষণ ও বায়ুর গুণগতমানের সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য উচ্চমানসম্পন্ন বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশে নিয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ‘রোগের বৈশ্বিক বোঝা-বায়ুদূষণের মূল উৎস’ শীর্ষক বৈশ্বিক গবেষণায় জানা যায়, রান্নার চুলায় (স্টোভ) পোড়ানো কয়লা-কাঠ-গোবর ও শস্যের ফেলে দেওয়া অংশ থেকে সৃষ্ট ধোঁয়ায় ২০১৭ সালে বিশ্বে প্রায় ১৮ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। ২০১৭ সালে অ্যামবিয়েন্ট (আউটডোর) পিএম ২.৫ এর কারণে বাংলাদেশে ৬৩ হাজার ৭১৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বাংলাদেশে বায়ুদূষণের অন্যতম মূল উপকরণ পিএম ২.৫ এর সর্বাপেক্ষা বড় উৎস হলো ঘরে ব্যবহৃত জ্বালানি। প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশের চুলাগুলো দীর্ঘদিন ধরে রান্নার দায়িত্বে থাকা নারীদের জন্য গুরুতর ঝুঁকির কারণ হয়েছে। পরিবেষ্টিত বায়ুদূষণের ২৮ দশমিক ২ শতাংশ আসে গৃহস্থালি জ্বালানি থেকে এবং বিদ্যুৎ থেকে আসে ১২ দশমিক ৪ শতাংশ।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ঘরের আবহাওয়া গরম রাখতে এবং রান্না করতে কাঠ পোড়ানো পিএম ২.৫ এর আরেকটি বড় উৎস। এই উৎসগুলোর কারণে আরও অতিরিক্ত ৭৪ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত সেন্টার ফর রিসার্চ অন অ্যানার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (সিআরইএ) গবেষণায় প্রতিফলিত তথ্য মোতাবেক, বাংলাদেশে বায়ুদূষণের প্রভাবে প্রতি বছর ৫ হাজার ২৫৮ শিশুসহ ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জন মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। একই কারণে প্রতি বছর ৯ লাখ মায়ের অকাল প্রসব হচ্ছে এবং প্রায় ৭ লাখ কম ওজনের শিশু জন্মগ্রহণ করছে। তাছাড়া এ সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে প্রতি বছর ৬ লাখ ৭০ হাজার রোগী জরুরি বিভাগে ভর্তি হচ্ছেন, যার ফলে সম্মিলিতিভাবে বছরে ২৬৩ মিলিয়ন কর্মদিবস হারাচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক জার্নাল কার্ডিওভাসকুলার রিসার্চে প্রকাশিত গবেষণায় বায়ুদূষণকে ‘মহামারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বায়ুদূষণের কারণে সারা বিশ্বে মানুষের গড় আয়ু কমেছে প্রায় তিন বছর এবং অকালে মারা যাচ্ছে প্রায় ৮৮ লাখ মানুষ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে তেল. গ্যাস, কয়লা ও জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপন্ন দূষণ সৃষ্টিকারী কণার প্রভাব মানুষের ফুসফুসে প্রায় এক বছর পর্যন্ত থাকতে পারে। গবেষণার প্রধান লেখক জস লেলিয়েভেল্ড বলেন, জনস্বাস্থ্যের ওপর বায়ুদূষণের প্রভাব ধূমপানের চেয়েও ক্ষতিকর। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার করে এই ক্ষতি কমানো সম্ভব। মহামারীর তুলনায় বায়ুদূষণেই বেশি মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। ম্যালেরিয়ার তুলনায় ১৯ গুণ এবং এইডসের তুলনায় প্রায় ৯ গুণ বেশি মানুষ মারা যাচ্ছেন। বায়ুদূষণ থেকে শুধু ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন ৬ শতাংশ মানুষ। দিন দিন বাড়ছে ফুসফুসের অন্যান্য রোগ, উচ্চরক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অন্যান্য মহাদেশের তুলনায় এশিয়ায় বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি বলে গবেষণায় প্রতিফলিত হয়েছে। বায়ুদূষণের কারণে চীনে ৪ দশমিক ১, বাংলাদেশে ৪ দশমিক ৭, ভারতে ৩ দশমিক ৯ এবং পাকিস্তানে ৩ দশমিক ৮ বছর গড় আয়ু কমেছে। ধনী দেশগুলোর তুলনায় দরিদ্র দেশে বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি অনুভূত। যুক্তরাষ্ট্র, উত্তর ও পশ্চিম ইউরোপ এবং দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোতে বায়ুদূষণ তুলনামূলকভাবে কম। ধনী দেশগুলোর মধ্যে রাশিয়া, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া এবং হাঙ্গেরিতে সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণ হয়।   

পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক বায়ুদূষণের জন্য চিহ্নিত কারণগুলো হলো ইটভাটা, রাস্তা নির্মাণ-পুনর্নির্মাণ-মেরামত, সেবা সংস্থাগুলোর নির্মাণকাজ ও রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, বড় উন্নয়ন প্রকল্প (এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল), সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বহুতল ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ, সড়ক বা মহাসড়কের পাশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বালু উত্তোলন ও সংগ্রহ, ট্রাক বা লরিতে বালু-মাটি-সিমেন্টসহ অন্য নির্মাণসামগ্রী উন্মুক্ত অবস্থায় পরিবহন, রাস্তায় গৃহস্থালি-পৌর বর্জ্য স্তূপাকারে রাখা ও বর্জ্য পোড়ানো, ড্রেন থেকে ময়লা তুলে রাস্তায় ফেলে রাখা, ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করতে গিয়ে ধুলাবালি ছড়ানো, বিভিন্ন সড়কের পাশে থাকা অনাবৃত স্থান, ফুটপাত ও রাস্তার আইল্যান্ডের মধ্যের ভাঙা অংশের মাটি ও ধুলা, ফিটনেসবিহীন পরিবহন থেকে নিঃসৃত ক্ষতিকর ধোঁয়া, বিভিন্ন যানবাহনের চাকায় লেগে থাকা কাদামাটি, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি কলোনির ময়লা-আবর্জনা পোড়ানো, বিভিন্ন মার্কেট-শপিংমল-বাণিজ্যিক ভবনের আবর্জনা ও ধুলাবালি রাস্তায় ফেলা, ঢাকা শহরের দূষণপ্রবণ এলাকার ধুলা, হাসপাতালের বর্জ্য রাস্তায় ফেলা, অধিক সালফারযুক্ত ডিজেল ব্যবহার এবং জনসচেতনতার অভাব। সমস্যাগুলো যথার্থ অর্থে চিহ্নিত হলেও আশু-স্বল্প-দীর্ঘমেয়াদি যুক্তি-জ্ঞাননির্ভর কর্মকৌশল প্রণয়ন এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিত্রাণের উপায় অনুসন্ধান একান্তই আবশ্যক। সদিচ্ছা-বাচনিক অঙ্গীকার দুর্ভোগ কমানোর লক্ষ্যে যুক্তিযুক্ত পদক্ষেপ হতে পারে না। বাস্তবতার নিরিখে পর্যায়ক্রমের ভারসাম্য নিশ্চিত করে যথোপযুক্ত সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ সময়ের দাবি।

বায়ুদূষণের কারণে হুমকি বাড়ছে জনস্বাস্থ্যের। এই প্রেক্ষাপটে পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এ বিষয়ে সামাজিক আন্দোলন জোরদার করা। একই সঙ্গে আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। দেশে পানিদূষণ ও অন্যান্য দূষণের বিষয়টিও বহুল আলোচিত। পানিদূষণের কারণে মারাত্মক দূষিত পদার্থ আমাদের খাদ্যচক্রে মিশে যাচ্ছে। ফলে মানুষ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সব ধরনের দূষণ রোধে কর্তৃপক্ষকে কঠোর হতে হবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিজ্ঞানী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত