গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক গণজোয়ারে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর কেটে গেছে দুই বছর। রাজপথের সেই রক্তস্নাত আত্মত্যাগ ও প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বৈরাচার মুক্ত দেশ আজ কতটুকু বদলেছে? মৌলিক অধিকার, মুক্তচিন্তা ও সুশাসনের প্রত্যাশা কতখানি পূর্ণ হলো- তা নিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন জুলাইয়ের সম্মুখসারির শিল্পীরা। রক্তমাখা জুলাইয়ের দুই বছর পূর্তিতে তাঁদের প্রাপ্তি, ক্ষোভ, অভিজ্ঞতা ও আগামীর স্বপ্ন নিয়ে এই বিশেষ আয়োজন
কাক্ষিক জাতীয় ঐক্য আমরা দেখতে পাইনি
আসিফ আকবর
চব্বিশের জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মুক্তির সনদ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পথ তৈরি করেছিল, আর ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার এবং ‘এই দেশ ২০ কোটি মানুষের’ সেই সত্যকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে। এই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটেছে এবং ফ্যাসিবাদ বিতাড়িত হয়েছে। তবে এই ফ্যাসিবাদের মূল উৎপাটন করা এখন জরুরি। কারণ, বিগত ৫৩ বছর ধরে তারা মিথ্যা গল্প আর বৈদেশীয় বেনিয়াদের মদদে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করে রেখেছিল। এই মিথ্যাচার, লুটপাট ও অন্যায়ের শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করেছে আমাদের ছাত্রসমাজ, বিভিন্ন বাহিনী, শ্রমিক, কৃষক ও সর্বস্তরের সাধারণ জনতা।
প্রাথমিকভাবে এই আন্দোলন ছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্য নিরসনের আন্দোলন। পরবর্তী সময়ে মেধা ও কোটাভিত্তিক ব্যবস্থার অসংগতি থেকে তা এক দফার আন্দোলনে রূপ নেয়, যা ছিল একটি অনিবার্য পরিণতি। এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ আজ ফ্যাসিস্টদের থেকে মুক্ত হয়েছে।
জুলাই বিপ্লব ঘিরে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক উঁচুতে। আমরা ভেবেছিলাম, পতনের পর একটি শক্তিশালী জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠবে। এমন একটি অত্যাচারী ও লুটপাটকারী শাসকগোষ্ঠী, যাদের নজর ছিল দেশের বাইরে, তাদের বিদায়ের পর দল-মত নির্বিশেষে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের সূচনা হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই কাক্সিক্ষত জাতীয় ঐক্য আমরা দেখতে পাইনি। ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো এক হয়ে দেশ পুনর্গঠনে ও জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে মনোযোগ দেবে, এমনটাই ছিল প্রত্যাশা। অথচ সংসদের ভেতরে ও বাইরে দলগুলোকে পুনরায় বিবাদে লিপ্ত হতে দেখা যাচ্ছে, যা রাষ্ট্রকে নতুন করে অস্থিতিশীল করার ঝুঁকি তৈরি করছে। এটি কোনোভাবেই জুলাইয়ের মূল স্পিরিটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
জুলাই আন্দোলনে কোনো নির্দিষ্ট সীমানা ছিল না; শিশু থেকে শুরু করে আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই এতে সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছিল। শেষ পর্যায়ে এটি কেবল কোটা আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বাংলাদেশের মানুষ আসলে কী চায়, সেই স্পষ্ট বার্তা উঠে এসেছিল। কিন্তু আন্দোলনের পর আমাদের যে ইস্পাতকঠিন ঐক্য থাকার কথা ছিল, তা ব্যাহত হওয়া চরম হতাশার।
বিদেশি শক্তিগুলো বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রাখতে এবং চিরতরে অস্থিতিশীল করতে তাদের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তবে আমাদের মূল চিন্তা বাইরের শত্রু নিয়ে নয়; সবচেয়ে বড় বিপদ হলো দেশের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা বিদেশি এজেন্ট ও চক্রান্তকারীরা। তারাই মূলত বিভেদ সৃষ্টি করছে। তাই বাইরের শত্রুর চেয়ে ঘরের শত্রুকে আগে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
আমি আশা করি, জুলাইয়ের স্পিরিটকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মতানৈক্য দ্রুত ঘুচিয়ে রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করবে। বাংলাদেশের মানুষের চাহিদা খুব বেশি নয় সংস্কৃতি, খেলাধুলা, গণমাধ্যমসহ তাদের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করাই যথেষ্ট। আমাদের দেশ জনবহুল এবং এখানকার মানুষ অত্যন্ত রাজনীতিসচেতন। ফলে এখানে সুস্থ রাজনীতি চর্চা করা চ্যালেঞ্জিং। তবে একমাত্র রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যই জুলাই বিপ্লবকে পূর্ণাঙ্গ সফলতা এনে দিতে পারে, যা এখনো দৃশ্যমান নয়। এই বিপ্লব যদি ব্যর্থ হয়, তবে বাংলাদেশ আর কখনোই স্থিতিশীল হতে পারবে না এবং শত্রুপক্ষের ষড়যন্ত্র সফল হবে।
জুলাই বিপ্লব আমাদের জন্য এক বিশাল অর্জন। এটি কেবল অত্যাচারী ও খুনি শাসকের বিদায় নয়, বরং ফ্যাসিবাদের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি। তবে এই মুক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী করতে হলে আপামর জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, আর সেই ঐক্যের নেতৃত্ব দিতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকেই। তারা যদি মানুষের এই আশা-ভরসার মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়, তবে আগামী দিনে জনগণ তাদেরও প্রত্যাখ্যান করবে, এটাই স্বাভাবিক। চব্বিশের জুলাই আমাদের শিখিয়েছে সাধারণ মানুষের শক্তির ঐক্য কী করতে পারে; আর সেটাই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার মূল প্রেরণা।
হাসিনামুক্ত বাংলাদেশ অর্জন ও সুশাসনের নতুন আশা
লতিফুল ইসলাম শিবলী
আমার ব্যক্তিগত জীবনে দুটি বড় অর্জন রয়েছে- আমি দুটি সফল গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যক্ষ সাক্ষী এবং এর সম্মুখ লড়াইয়ের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলাম। এই দুটি ঐতিহাসিক বিজয়ের অভিজ্ঞতা আমার পুরো জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে। শৈশবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ দেখার সৌভাগ্য হলেও বোঝার বয়স ছিল না। আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সারা জীবন হৃদয়ে ধারণ করেই বড় হয়েছি। তবে ১৯৯০ এবং ২০২৪ সালের দুটি গণঅভ্যুত্থানে সরাসরি অংশগ্রহণ ও বিজয় চাক্ষুষ করা, এটিই আমার জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়।
অনেক সময় অনেকে প্রশ্ন করেন, ২০২৪-এর এই গণঅভ্যুত্থান থেকে আমরা শেষ পর্যন্ত কী পেলাম? আমার সহজ উত্তর, আমরা একটি হাসিনামুক্ত বাংলাদেশ পেয়েছি। স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদ যে নামেই ডাকি না কেন, শেখ হাসিনা তার অবৈধ শাসনকে বৈধতা দিতে যেভাবে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে সাজিয়েছিলেন, তাতে মনে হতো এই জীবদ্দশায় হয়তো আর এই ফ্যাসিবাদের পতন দেখে যেতে পারব না। মনে মনে একটাই আকাক্সক্ষা ছিল, অন্তত মৃত্যুর আগে যেন স্বৈরাচারমুক্ত একটি দেশ দেখে যেতে পারি। আলহামদুলিল্লাহ, সেই আকাক্সক্ষা পূরণ হয়েছে। রক্তক্ষয়ী এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমার সেই প্রাপ্তি পুরোপুরি অর্জিত হয়েছে।
১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক ধারায় প্রবেশ করেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার পালাবদল ঘটছিল। কিন্তু সেই সুবাতাস বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার অন্ধ নেশায় বাংলাদেশ আবারও এক ভয়াবহ স্বৈরশাসনের কবলে পড়ে। শেখ হাসিনা আজীবন ক্ষমতায় থাকার জন্য যা যা করা সম্ভব, রাতের অন্ধকারের ভোট, ডামি নির্বাচন, সবই করেছিলেন। গত ১৬ বছর আমরা চরমভাবে নিষ্পেষিত হয়েছি। বাকস্বাধীনতা ছিল না, কথা বলার অধিকার ছিল না; এমনকি এটি আমাদের নিজের দেশ, সেই অনুভূতিটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। মূলত ভারতীয় তাঁবেদার রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে অন্য দেশের অনুগত রাজ্যে পরিণত করা হয়েছিল।
গত ৫ আগস্ট হাসিনার পলায়নের পর সেই বিকেল এবং পরবর্তী কয়েকটা দিনের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। রিকশায় ঘুরে ঘুরে আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেদিন মনে হয়েছিল, ‘হ্যাঁ, এটিই আমার দেশ!’ এতদিন পর আমরা যেন আমাদের নিজস্ব স্বাধীন মাতৃভূমিকে আবার ফিরে পেয়েছিলাম।
২৪-এর এই রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা মুক্ত ও স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি সত্য, তবে পথ এখনো অনেক বাকি। গণতন্ত্র, ইনসাফ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তবেই বাংলাদেশ তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে। আশা করি, এ দেশ আর কখনো কোনো স্বৈরশাসকের কবলে পড়বে না, বরং নিজের মহিমায় সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশ পুনর্গঠনে যেভাবে চিন্তাভাবনা করছেন, তাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, ‘বন্ধু গো তোলো শির, তোমারে দিয়াছি পতাকা মোদের বিংশ শতাব্দীর...।’ আজ সেই পতাকার দায়িত্ব তার হাতে। আশা করছি, তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ একটি সুশাসিত ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে পরিণত হবে।