বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রধান টুর্নামেন্টগুলোর মালিকানার একাংশ (শেয়ার) ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের কাছে গোপনে বিক্রির বিতর্কিত উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার পর চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন সংস্থাটির সভাপতি জিয়ান্নি নি ইনফান্তিনো। উয়েফা ও কনকাকাফ, এএফসির অনাস্থা প্রকাশের পর এবার ২০২৭-২০৩১ মেয়াদের নির্বাচনে ইনফান্তিনোর প্রার্থিতা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ওয়েলশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। একই পথে হেঁটে ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও তাদের সমর্থন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছে। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, এক সপ্তাহ আগেও বিশ্ব ফুটবলে যার নিয়ন্ত্রণকে ‘অদম্য’ মনে হচ্ছিল, সেই ইনফান্তিনো এখন পদ বাঁচাতেই হিমশিম খাচ্ছেন।
সোমবার প্রথম জাতীয় ফুটবল সংস্থা হিসেবে ওয়েলশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয়, তারা ২০২৭ থেকে ২০৩১ মেয়াদের জন্য ফিফা সভাপতি পদে ইনফান্তিনোকে আর সমর্থন করবে না।
ওয়েলশ ফুটবল সংস্থার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘সুশাসন, সঠিক প্রক্রিয়া, নেতৃত্ব, মূল্যবোধ, অংশীদার ব্যবস্থাপনা এবং দূরদর্শিতার সাম্প্রতিক ব্যর্থতা আমাদের এমন এক অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে ফুটবল বিশ্বের নেতৃত্বে ইনফান্তিনোর ওপর এফএডব্লিউ সম্পূর্ণ আস্থা হারিয়েছে। ফুটবলের সেরা স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে ব্যর্থ হওয়া এমন এক ভুল, যা আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না।’ ওয়েলশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের এই ঘোষণার পর ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচনের সমর্থনে দেওয়া চিঠি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করতে যাচ্ছে। ফিনল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও ইতিমধ্যেই একই পদক্ষেপ নিয়েছে।
ফিফার অলাভজনক কাঠামোর বাইরে ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি নতুন লাভজনক বাণিজ্যিক সত্তা তৈরির প্রকল্প তীব্র বিরোধিতায় স্থগিত করা হলেও উয়েফা ইনফান্তিনোকে ছাড় দিচ্ছে না। ইউরোপীয় ফুটবলের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইতিমধ্যেই ফিফা ও জশুয়া কুশনারকে ছয় পৃষ্ঠার একটি আইনি নোটিস পাঠিয়েছে। নোটিসে সভাপতি ইনফান্তিনোসহ শীর্ষ ১৮ জন কর্মকর্তার (যার মধ্যে আর্সেন ওয়েঙ্গার ও জিল এলিসও রয়েছেন) সমস্ত ই-মেইল, ফাইল ও ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে, যাতে কোনো প্রমাণ নষ্ট বা মুছে ফেলা না হয়। সালিশি বা নিয়ন্ত্রক সংস্থায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি হিসেবে এই ‘ডকুমেন্ট প্রিজারভেশন অর্ডার’ দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সাবেক মার্কেটিং প্রধান মাইকেল পেইন পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘খেলাধুলার ইতিহাসে কোনো শীর্ষ নেতার এত দ্রুত পতন আমরা আগে কখনো দেখিনি। এক সপ্তাহ আগেও তিনি একটি সফল বিশ্বকাপ শেষ করে নির্বিঘ্নে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন, আর এখন তিনি এক মাসের মধ্যে পদ বাঁচাতে পারেন কি না তা নিয়েই সংশয় তৈরি হয়েছে।’ মাইকেল পেইন সতর্ক করে বলেছেন, ইনফান্তিনো দায়িত্বে থেকে গেলে বিশ্ব ফুটবলে গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে, এমনকি বড় দেশগুলো আলাদা হয়ে যেতে পারে। তার মতে, ছোট দেশগুলোকে কাছে টেনেও আর রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয় ইনফান্তিনোর দিন শেষ। তিনি কীভাবে নিজেকে এই বিপদে ফেললেন চরম অহংকার ও ঔদ্ধত্যের কারণে।’
পরিস্থিতি যেভাবে মোড় নিচ্ছে, আগামী মরক্কো কংগ্রেসে ইনফান্তিনোর পক্ষে চতুর্থ মেয়াদে লড়াই করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। আফ্রিকা বা এশিয়ার দেশগুলোর ভোট নিজের পক্ষে রেখে তিনি টিকে থাকার চেষ্টা করলেও ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার এই সুসংগঠিত অবস্থান তাকে ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে কোণঠাসা করে ফেলেছে।