মহিপালে একসঙ্গে ৭ জন হত্যার মামলা নিয়ে বিতর্ক

ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের এক দফা আন্দোলনে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ফেনী শহরের উপকণ্ঠ মহিপালে সরকারবিরোধী ছাত্র-জনতার ওপর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। বেলা ১টার পর ৩০-৪০ মিনিটের হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে নিহত হন ৭ জন। ৭ জন হত্যার ঘটনায় মামলা হয় ২২টি।

এসব মামলায় আসামি করা হয় প্রায় ১১ হাজার জনকে। এর মধ্যে এজহারভুক্ত আসামির সংখ্যা ২ হাজার ৫০৫ জন। যার মধ্যে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১ হাজার ১৯২ জনকে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে এজাহারভুক্ত আসামি রয়েছেন ২২৩ জন। অনেক আসামি এরই মধ্যে আদালতের মাধ্যমে কারাভোগ করে জামিনে মুক্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

হত্যার ৬টি ও হত্যাচেষ্টার ৭টি মামলায় চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। এই ১৩ মামলায় ২ হাজার ১৩৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। ২টি হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়েছে। টমটম চালক সবুজ হত্যা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে আর সিহাব হত্যা মামলা সাক্ষ্যগ্রহণের অপেক্ষায় আছে।

মামলার তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, ওই হত্যাকা-ে ৩০ জন অস্ত্রধারী অংশ নেন। যাদের বিভিন্ন ফুটেজ দেখে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু এই অস্ত্রধারীদের মধ্যে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছে মাত্র দুজন।

৭ জনের হত্যায় দায়ের করা ২২ মামলা নিয়ে চলছে নানা বিতর্ক। গণহারে আসামি করা, আসামি করার ভয় দেখিয়ে ‘মামলা বাণিজ্য’-এর ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। একই সময়ে, একই স্থানের ঘটনায় বিপুল সংখ্যক আসামি করার ফলে নানামুখী জটিলতায় দিশেহারা অবস্থা পুলিশের। তদন্তে নেমে অনেক মামলার বাদী ও  আসামিদের নাম-পরিচয় পর্যন্ত শনাক্ত করতে পারছেন না তারা। আবার প্রবাসী, মৃত ব্যক্তিসহ ঘটনাস্থলের ত্রিসীমানাতেও না থাকা অসংখ্য ব্যক্তির নাম রয়েছে এজাহারে। মামলায় আসামির দীর্ঘ তালিকার অনেকের সম্পর্কে জানেন না বাদী নিজে। স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের মাধ্যমে নাম সংগ্রহ করে মামলার তালিকায় নাম জড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ আছে, অনেকে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না হয়েও সামাজিক ও ব্যবসায়িক প্রতিহিংসার কারণেও মামলার আসামি হয়েছেন।

মামলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ওবায়দুল কাদের, ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারী, আলাউদ্দিন নাসিম এমপি, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এমপিসহ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ছয়টি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পাঁচ পৌরসভার মেয়র এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতাদের আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে কেবল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।

পুলিশের বিরুদ্ধেও বাদীর সঙ্গে যোগসাজশ করে বাণিজ্যের অভিযোগ উঠছে। বিএনপি নেতাকে আওয়ামী লীগ নেতা বানিয়ে মামলা করার মতো ঘটনাও ঘটছে। ফেনীর কয়েকজন সাংবাদিকের নামেও মামলা করা হয়েছে।

এজাহার থেকে নাম সরানোর তদবিরে জড়িয়ে পড়েছে এক শ্রেণির দালাল চক্র। অপরাধী না হয়েও আসামি হওয়ায় অনেকে লাখ টাকা খরচ করতে বাধ্য হচ্ছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মামলায় আসামির সংখ্যার আধিক্য, দুর্বল চার্জশিট ও ঘটনায় জড়িত না থাকা ব্যক্তিদের জড়ানোসহ নানা অসংগতি খুঁজে পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি)। আইসিটি’র চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম মামলাগুলো পর্যবেক্ষণ করে সম্প্রতি ফেনী জেলা আদালতের পিপি মেজবাহ উদ্দিন খান ও মামলাগুলোর বাদী পক্ষের আইনজীবী মেজবাহ উদ্দিন ভূঞাকে ঢাকায় ডেকে পাঠান। এরপর মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

পিপি মেজবাহ উদ্দিন খান জানান, হত্যাচেষ্টা আর বিস্ফোরক আইনের ১৫টি মামলা ফেনীর আদালতে বিচার হলেও হত্যা মামলাগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হবে শিগগিরই। মামলাগুলোর পুনঃতদন্ত হতে পারে বলেও জানান মেজবাহ খান।

নাম প্রকাশ না করে পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, এসব মামলা নিয়ে প্রচন্ড হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ। ঢালাওভাবে প্রতিটি মামলায় শত শত ব্যক্তিকে আসামি করায় জটিলতায় পড়ছে তদন্ত। বিভিন্ন হত্যা মামলার আসামিদের ধরতে অভিযান চলছে। এসব অভিযানে নিরপরাধ লোকজনও গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকারও হচ্ছেন। অনেক জায়গায় আসামি ধরার নামে গ্রেপ্তার বাণিজ্যের অভিযোগের কারণে ভাবমূর্তি সংকটে পড়ছে পুলিশ।

এ প্রসঙ্গে ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, মামলা বাণিজ্য ও হয়রানির ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সঠিক নয়। ছাত্র-আন্দোলনের পর দায়ের হওয়া মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিরপরাধ কেউ যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন সেদিকে আমরা খেয়াল রাখছি।’

এদিকে, বিচারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। সম্প্রতি সেদিনের ঘটনায় যারা মারা যাওয়া সোনাগাজীর মান্দারী গ্রামে জাকির হোসেন শাকিরের বাড়িতে গেলে তার মা কোহিনুর আক্তার ও বাবা আবদুল লতিফ হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কোহিনুর আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলেকে মহিপালে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করেছে। দুই বছর পার হয়ে গেলেও আমি আমার ছেলের হত্যার বিচার পেলাম না। কান্না করতে করতে এখন চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। তবুও ছেলে হত্যার বিচার পাচ্ছি না।’ তারা সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে সরকারের কাছে আকুতি জানান।