মাদকের গোপন নেটওয়ার্কে উদ্বেগে কয়রার মানুষ

খুলনার কয়রা উপজেলায় মাদকবিরোধী অভিযানের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে মাদকের বিস্তার নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগও। গত তিন বছরে ১৫৪টি মাদক মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৯৬ জন। কিন্তু এত অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও ইয়াবা ও গাঁজার সরবরাহ থামেনি। বরং প্রকাশ্য লেনদেনের বদলে এখন আরও সংগঠিত ও গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাদক কেনাবেচা চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, সচেতন নাগরিক, একাধিক মাদকসেবী এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাদক কারবারিরা এখন সরাসরি লেনদেন না করে নির্দিষ্ট যোগাযোগব্যবস্থা ও সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করছে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া তাদের জন্য সহজ হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে কয়রা সদর, মহারাজপুর, আমাদী, উত্তর বেদকাশি ও দক্ষিণ বেদকাশিতে ইয়াবা ও গাঁজার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। স্থানীয়দের ভাষ্য, সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও স্থানের মাধ্যমে সহজেই মাদক সংগ্রহ করা যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, এখন আর প্রকাশ্যে কিছু হয় না। নির্দিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ করলে নতুন ক্রেতারাও সহজেই মাদক পেয়ে যায়। 

একাধিক মাদকসেবীর দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে ইয়াবার নাম সরাসরি উচ্চারণ করা হয় না। কোথাও "নাট", কোথাও "জোন" নামে ইয়াবা বোঝানো হয়। আবার ইয়াবা সেবনের জন্য ব্যবহৃত ফয়েল পেপার স্থানীয়ভাবে "বল্টু" নামে পরিচিত। এসব সাংকেতিক শব্দ ব্যবহারের কারণে বাইরের মানুষের পক্ষে বিষয়টি সহজে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে বলে তারা জানান।

অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রচ্ছায়ায় মাদক ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। ফলে খুচরা বিক্রেতারা গ্রেপ্তার হলেও মূল নিয়ন্ত্রকেরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যাচাইও করা সম্ভব হয়নি।

কয়রা থানার তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে উপজেলায় ১৫৪টি মাদক মামলা হয়েছে। এ সময়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৯৬ জনকে। উদ্ধার করা হয়েছে ২ হাজার ৩১১টি ইয়াবা, ৩৫ কেজি ৮ গ্রাম গাঁজা, ১২ লিটার চোলাই মদ এবং আটটি গাঁজা গাছ। পুলিশের তথ্য বলছে, আমাদী ও বাগালী ইউনিয়নে মাদকের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি।

সম্প্রতি বাগালী ইউনিয়নের ইসলামপুর এলাকায় একটি চায়ের দোকানে অভিযান চালিয়ে দুজনকে মাদকসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই মাসে কয়রা সদর ইউনিয়নের গোবরা গুচ্ছগ্রাম থেকে স্থানীয় লোকজন দুই সন্দেহভাজন মাদক কারবারিকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। দুটি মামলাতেই আদালত তাদের ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা করে জরিমানা করেন।

স্থানীয়দের মতে, একই এলাকায় বারবার মাদক উদ্ধার হওয়ার অর্থ হলো সরবরাহ চক্র এখনো সক্রিয়। খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করা হলেও অর্থদাতা, সরবরাহকারী ও মূল নিয়ন্ত্রকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।

শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের আশঙ্কা, সহজলভ্য ইয়াবা ও গাঁজার কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে তরুণেরা। অনেক শিক্ষার্থী মাদকে জড়িয়ে পড়ায় লেখাপড়া ব্যাহত হচ্ছে, পারিবারিক অশান্তি বাড়ছে এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তাদের মতে, শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তার দিয়ে পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদকের উৎস, সরবরাহপথ, অর্থের প্রবাহ, পৃষ্ঠপোষক এবং স্থানীয় বিতরণ নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে সমন্বিত অভিযান চালাতে হবে। পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি, মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন এবং তরুণদের জন্য ইতিবাচক সামাজিক কার্যক্রম বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

 মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চালাচ্ছে পুলিশ। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়রা থানার ওসি (তদন্ত) হাসানুজ্জামানকে সম্প্রতি উপজেলার কয়েকটি মসজিদে গিয়ে জুমার নামাজের আগে ও পরে মাদক, বাল্যবিবাহ ও অনলাইন জুয়ার ক্ষতিকর দিক নিয়ে বক্তব্য দিতে দেখা গেছে। তিনি মুসল্লিদের এসব সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। 

কয়রা থানার ওসি (তদন্ত) হাসানুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। সেই নীতির আলোকে কয়রা উপজেলাকে মাদকমুক্ত করতে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। মাদক ব্যবসা বা কারবারের সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আইনের আওতায় এনে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

খুলনা জেলা পুলিশের ডি-সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. আমির হামজা বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। শুধু খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করাই নয়, মাদকের মূল সরবরাহকারী, অর্থদাতা ও নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দিকেও আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং এই কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।

তিনি আরও বলেন, মাদক নির্মূলে শুধু পুলিশের অভিযান যথেষ্ট নয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক, শিক্ষক, গণমাধ্যমকর্মী ও সচেতন নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। কেউ মাদক ব্যবসা বা সেবনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাদকের সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি, তার পরিচয় বা প্রভাব যাই থাকুক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।