সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্য সুরক্ষার অন্যতম প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এটি পানি, সামুদ্রিক খাবার, ফল, শাক-সবজি, লবণ, মধু, চা, চাল, মাংস এবং এমনকী আমরা যে বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাস নিই, সেখানেও পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা মানুষের রক্ত, ফুসফুস, প্ল্যাসেন্টা এবং ধমনীতেও এগুলো শনাক্ত করেছেন।
মাইক্রোপ্লাস্টিক আসলে কী?
মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা যা ৫ মিলিমিটারের চেয়েও ছোট। কিছু মাইক্রোপ্লাস্টিক সেভাবেই তৈরি করা হয়, তবে বেশিরভাগই বোতল, খাবারের পাত্র, প্যাকেজিং এবং সিন্থেটিক কাপড়ের মতো বড় প্লাস্টিক পণ্য থেকে আসে, যা ধীরে ধীরে ভেঙে যায়। এছাড়াও ন্যানোপ্লাস্টিক রয়েছে, যা আরও ছোট। এগুলো এতটাই ক্ষুদ্র যে খালি চোখে দেখা যায় না এবং ধারণা করা হয় যে এগুলো মানবদেহের গভীরে প্রবেশ করতে পারে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক কীভাবে আমাদের খাবারে প্রবেশ করে?
খাদ্য শৃঙ্খলের প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করতে পারে। ফল ও শাক-সবজি চাষের দূষিত মাটি, নদী ও সমুদ্র (যেখানে মাছ ও শেলফিশ প্লাস্টিকের কণা গ্রহণ করে), প্লাস্টিকের খাদ্য প্যাকেজিং, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও পরিবহন, অথবা খাবার প্রস্তুত বা সংরক্ষণের সময় বাতাসে ভেসে থাকা প্লাস্টিকের ধূলিকণার মাধ্যমে এগুলো খাবারে প্রবেশ করতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ)-এর মতে, বিভিন্ন ধরনের খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। তবে, শুধু এগুলো শনাক্ত করার অর্থ এই নয় যে এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতি করছে।
আমাদের শরীর কি এগুলো শোষণ করতে পারে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-এর মতে, অনেক বড় মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পরিপাকতন্ত্রের মধ্য দিয়ে বর্জ্যের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।উদ্বেগটি হলো ক্ষুদ্রতম কণা, বিশেষ করে ন্যানোপ্লাস্টিক নিয়ে। গবেষকরা মনে করেন যে এগুলো জৈবিক বাধা অতিক্রম করে বিভিন্ন টিস্যুতে প্রবেশ করতে সক্ষম হতে পারে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে কী ক্ষতি করতে পারে?
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হলো প্রদাহ। গবেষণায় দেখা গেছে যে কিছু মাইক্রোপ্লাস্টিক কোষকে উত্তেজিত করতে পারে এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসসহ অনেক স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে মাইক্রোপ্লাস্টিক অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়াতে পারে। অতিরিক্ত অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ধীরে ধীরে কোষ, প্রোটিন এবং ডিএনএ-র ক্ষতি করতে পারে।
আমাদের অন্ত্রে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ব্যাকটেরিয়া রয়েছে যা খাবার হজমে সাহায্য করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং এমনকী মানসিক স্বাস্থ্যকেও প্রভাবিত করে। পরীক্ষামূলক গবেষণা থেকে জানা যায় যে মাইক্রোপ্লাস্টিক অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার এই স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
প্লাস্টিক মানেই শুধু প্লাস্টিক নয়। অনেক প্লাস্টিকে এমন সংযোজনী পদার্থ থাকে যা সেগুলোকে নমনীয়, রঙিন বা টেকসই করে তোলে। মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশ থেকে কীটনাশক এবং ভারী ধাতুসহ বিভিন্ন দূষক পদার্থও শোষণ করতে পারে। গবেষকরা গবেষণা করছেন যে এই কণাগুলো মানবদেহে প্রবেশ করার পর এই রাসায়নিক পদার্থগুলো নির্গত হতে পারে কি না।
মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে চলা সম্ভব?
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) বলছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন প্রায় সর্বত্রই পাওয়া যায়- মহাসাগর, নদী, মাটি, বায়ু এবং খাদ্য শৃঙ্খলে। এর মানে হলো, এগুলোকে সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব। তবে এর সংস্পর্শ কমানোর কিছু সহজ উপায় রয়েছে।
তাপের কারণে খাবারে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা এবং রাসায়নিক পদার্থের নির্গমন বেড়ে যেতে পারে। পুনরায় গরম করার আগে খাবার একটি কাঁচ বা সিরামিকের পাত্রে ঢেলে নিন।
পানির বোতল, লাঞ্চ বক্স এবং খাবার সংরক্ষণের জন্য প্লাস্টিকের চেয়ে কাঁচ এবং স্টেইনলেস স্টিল ভালো বিকল্প, বিশেষ করে গরম খাবার ও পানীয়ের ক্ষেত্রে।
স্যুপ, চা বা কফি যাই হোক না কেন, খুব গরম খাবার প্লাস্টিক কণার স্থানান্তর বাড়িয়ে দিতে পারে।
কিছু গবেষণা থেকে জানা যায় যে, ফিল্টার করা কলের পানির চেয়ে বোতলজাত পানি মানুষকে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শে আনতে পারে।
মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রকৃত প্রভাব নির্ণয় না হওয়া পর্যন্ত, বিশেষজ্ঞরা সচেতন থাকা, যেখানে সম্ভব অপ্রয়োজনীয় সংস্পর্শ এড়ানো এবং সাধারণ অভ্যাসগুলো মেনে চলার পরামর্শ দেন।