মনসুর আলী মেডিকেল কলেজে গভর্নিং বডি নিয়ে টানাপোড়েন

ঢাবির চিঠি ঘিরে প্রিন্সিপালের কক্ষে উত্তেজনা 

রাজধানীর উত্তরার শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের গভর্নিং বডি পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা দেখা দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠানো একটি চিঠিকে কেন্দ্র করে কলেজের প্রিন্সিপালের কক্ষে একদল তরুণের প্রবেশ, পদত্যাগের চাপ সৃষ্টি এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতির অভিযোগ উঠেছে। তবে নতুন গভর্নিং বডির বৈধতা নিয়ে এখনো সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে এবং বিষয়টি আদালতের বিচারাধীন বলেও দাবি করা হয়েছে।

কলেজের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক (পাবলিক রিলেশনস, রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড সার্ভিসেস) রোকসানা পারভীন জানান, মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে প্রিন্সিপালের কক্ষে অবস্থানকালে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি চিঠির অনুলিপি আসে। কিছুক্ষণ পর আনুমানিক ২২ থেকে ২৬ বছর বয়সী একদল তরুণ কক্ষে প্রবেশ করে ওই চিঠির কপি দেখিয়ে প্রিন্সিপালকে অবিলম্বে পদত্যাগ করে কক্ষ ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। এ সময় কক্ষে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

রোকসানা পারভীনের ভাষ্য, হঠাৎ একদল তরুণ এসে অত্যন্ত উত্তেজিত আচরণ শুরু করে। প্রিন্সিপাল স্যার তাদের শান্ত করার চেষ্টা করে জানান, বিষয়টি আদালতের স্থগিতাদেশ ও আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আদালতের বিষয় নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আইনগত বাধ্যবাধকতা ছাড়া দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তারা কোনো কথা না শুনে উচ্চস্বরে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে।

এক পর্যায়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে থানায় খবর দেওয়া হয়। ঘটনার খবর পেয়ে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। এ বিষয়ে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৪ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কলেজ পরিদর্শক এ কে এম আমজাদ হোসেন স্বাক্ষরিত একটি চিঠির (স্মারক নং-৪৭৫/ক.প.) মাধ্যমে শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের পুনর্গঠিত গভর্নিং বডির বিষয়ে প্রিন্সিপালকে অবহিত করা হয়। চিঠিতে বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল প্র্যাকটিশনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. মো. মোসাদ্দেক হোসেন বিশ্বাসকে গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনয়নের কথা উল্লেখ করা হয়।

চিঠিতে আরও বলা হয়, গভর্নিং বডি-সংক্রান্ত হাইকোর্ট বিভাগের স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আপিল বিভাগে ‘লিভ টু আপিল’ (নং-১১৭৩/২০২৬) দায়ের করলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের ওই স্থগিতাদেশ স্থগিত করেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় নতুন করে গভর্নিং বডি পুনর্গঠন করে।

চিঠির সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলে ডা. মো. মোসাদ্দেক হোসেন বিশ্বাস বলেন, “চিঠিটি এখনো আমার হাতে এসে পৌঁছায়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আমাকে বিষয়টি জানিয়েছেন। তাই আমি বিষয়টিকে সত্য বলে জানি।”

অন্যদিকে, কলেজের বর্তমান ট্রাস্টি বোর্ড ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন গভর্নিং বডি গঠনের আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মরহুম মোহাম্মদ নাসিমের সহধর্মিণী বেগম লাইলা আরজুমান।

কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠানো চিঠির সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। তাদের মতে, একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের গভর্নিং বডি পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন।

ট্রাস্টি বোর্ডের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, ২০২২ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী বেসরকারি মেডিকেল কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান এবং অন্তত ৫০ শতাংশ সদস্য ট্রাস্টি বোর্ড থেকে মনোনীত হওয়ার বিধান রয়েছে। এ বিষয়েও আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কলেজ পরিদর্শক এ কে এম আমজাদ হোসেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নীতিমালা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে কলেজ কর্তৃপক্ষ আদালতে রিট আবেদন করেছিল। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আপিল বিভাগে গেলে আদালতের আদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকূলে আসে। এরপর বিধি অনুসারে পাঁচ সদস্যের নতুন গভর্নিং বডি তিন বছরের জন্য পুনর্গঠন করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন গভর্নিং বডি সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয় করে কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

তবে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে কলেজটিতে প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পুনর্গঠিত গভর্নিং বডিকে কার্যকর বলে দাবি করছে, অন্যদিকে ট্রাস্টি বোর্ড আদালতে বিচারাধীন বিষয় উল্লেখ করে নতুন কমিটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ফলে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত গভর্নিং বডি-সংক্রান্ত বিরোধ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত এ বিষয়ে কলেজের প্রিন্সিপালের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া প্রিন্সিপালের কক্ষে প্রবেশ করে পদত্যাগের দাবি জানানো ব্যক্তিদের পরিচয় বা তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।