প্রত্যাশা পূরণে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সরকারের

জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে এবং জনগণের শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতার আরেকটি প্রকাশ দেখিয়েছে। আমরা ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান দেখেছি। তারপর আসে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান। এই সময়গুলোর পেছনের সময়গুলোতে আমরা বারবার সরকারের উন্নয়ন প্রচার ও দাবিগুলো শুনতে পেতাম। যেভাবে আইয়ুব  খানের ‘উন্নয়নের দশক’ ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান দিয়ে শেষ হয়েছিল এবং এরশাদের ‘উন্নয়ন দশক’ শেষ হয়েছিল ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান দিয়ে, ঠিক তেমনি ২০১৪ থেকে শুরু হাসিনার ‘উন্নয়ন দশক’ও ২০২৪ সালে সর্বশেষ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেষ হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এই স্বৈরশাসকদের উন্নয়নের দাবি যদি সত্যি হয় এবং যদি দৃশ্যমান অবকাঠামো নির্মাণ জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ  হয় তাহলে কেন ওই  সরকারগুলো জনগণের সমর্থন নিশ্চিত করতে পারেনি?এর উত্তর অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমরা দেখি, এই তিনটি ক্ষেত্রেই উন্নয়নের দাবি বলা হলেও গণতান্ত্রিক অধিকার চূর্ণ করে একনায়কতান্ত্রিক শাসন চালানো হয়েছে। অত্যাচার, দুর্নীতি, বৈষম্যবৃদ্ধি মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল বলে মানুষ আর উন্নয়নের বিবরণকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করছিল না। প্রতিটি ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা জনগণের ক্রোধ, অসন্তুষ্টি এবং একটি ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধের জন্ম দিয়েছে। ঠিক এ কারণে সাধারণ মানুষের অভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়েছিল।

ইতিপূর্বে বহুবার ২০২৪ সালের গণউত্থানের পটভূমি নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা দেখেছি যে, ভোট না করেই দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা, সম্পদ লুটপাট, দুর্নীতি, এবং মূলধন আত্মসাৎ, পাশাপাশি সমাজের সব স্তরে ব্যাপক দমন ও অত্যাচার, সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সব স্তরের মানুষের মধ্যে সমষ্টিগত রোষ-ক্ষোভ এবং হতাশা সৃষ্টি করেছিল। যখন সরকার শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দমন করতে নির্বিচার হত্যাকান্ড শুরু করে তখন মানুষ আরও প্রতিরোধী হয়ে ওঠে, তা বিস্ফোরণ আকারে প্রকাশিত হয়। এটা আবারও মানুষের সমষ্টিগত শক্তির একটি প্রকাশ ছিল।

একই সময়ে, এই উত্থান নতুন জনসচেতনতা এবং নতুন প্রত্যাশাও তৈরি করেছিল। মানুষ বিশ্বাস করেছিল যে একই অনিয়ম, দমন, দুর্নীতি, জনসম্পদের লুটপাট এবং নাগরিকদের প্রান্তিকীকরণ পুনরায় ঘটবে না। তারা আশা করেছিল একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা জন্ম নেবে এবং দেশ এগুতে শুরু করবে। অন্যায় এবং বৈষম্য থেকে মুক্ত, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। এই উচ্চ প্রত্যাশাগুলো গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই দানা বাঁধছিল।

একটি অন্তর্বর্তী সরকার তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিল এবং এখন দেশে একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে। তবে, জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, সেই উত্তেজনা-আবেগ এবং প্রত্যাশার অনেকটাই ক্ষয় হয়েছে। আন্দোলনের অনেক অংশগ্রহণকারীর মধ্যেই আমরা বাড়তে থাকা হতাশা এবং অসন্তোষ শুনতে পাচ্ছি। এর নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চয়ই আছে। এখানে আমি এর  কিছু দিক সংক্ষেপে তুলে ধরছি।

প্রথমত, জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের পরে আমরা একটি নতুন ধরনের ফ্যাসিস্টিক প্রবণতার উত্থান দেখেছি। অনলাইন ও অফলাইন উভয় ক্ষেত্রেই অসহিষ্ণুতা, সহিংসতা, খুনের হুমকি, শিশুদের অত্যাচার, অন্য ধর্মের মানুষ বা ভিন্নমত প্রকাশকারীদের প্রতি হুমকি এবং আক্রমণ, নারী ও বিভিন্ন লিঙ্গের মানুষের প্রতি হুমকি এবং আক্রমণ ঘটেছে। আগের কালের মতোই, মিথ্যা মামলা, পাইকারি গ্রেপ্তার এবং বিচারবিহীন আটক! আমরা বিভিন্ন স্থানে রাষ্ট্রীয় সংস্থার দ্বারা নির্যাতন এবং পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা দেখতে পাচ্ছি।

দ্বিতীয়ত, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকালে আমরা মাজার, মন্দির, বাউল, মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য এবং চিত্রকর্মে হামলা, সংগীত অনুষ্ঠান বাতিল এবং নাটক নিষিদ্ধ হওয়াসহ ধর্মের নামে মানুষ খুন জখম দেখতে পেয়েছি। এছাড়াও প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, উদীচী এবং ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা হয়েছে। এসব ঘটনার কোনো ব্যাপক পর্যালোচনা হয়নি এবং যারা সরাসরি জড়িত বা যারা প্ররোচনা  দিয়েছিল তাদের বিচার করার জন্য কোনো অর্থবহ প্রচেষ্টাও হয়নি!

তৃতীয়ত, আরেকটি বিষয় যা জনগণের মধ্যে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে তা হলো পুরনো ধারায় জনস্বার্থের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর করা। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকালে অনেক চুক্তি সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ এবং অযৌক্তিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সাধারণ মানুষকে অন্ধকারে রাখার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্বার্থকে এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এসবের  মধ্যে বন্দরের চুক্তি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য উদাহরণ হলো স্টারলিঙ্কের সঙ্গে চুক্তি, এলএনজি আমদানি চুক্তি এবং জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি। এগুলোর সবই খুব কম স্বচ্ছতায় তড়িঘড়ি সম্পন্ন হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে সই করা সবচেয়ে উদ্বেগজনক এবং বিপজ্জনক চুক্তি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, যা নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে সম্পন্ন হয়।

এই চুক্তিগুলো যেভাবে সম্পন্ন হয়েছে, তাতে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর, আমরা দেখেছি যে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিটি রাজনৈতিক দল এই বিষয়গুলোতে সম্পূর্ণ নীরব রয়েছে। এটি এমন এক বিষয় যার ওপর সরকার ও বিরোধীপক্ষের মধ্যে পূর্ণ ঐক্য দেখা যায়, যদিও অন্য প্রায় প্রতিটি বিষয়ে তাদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে যেসব চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, তা নিয়ে যে ঐক্য হয়েছে, তা জনসাধারণের মনে প্রশ্ন  আরও বাড়িয়েছে এবং তা গণউত্থানের আকাক্সক্ষার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বলে অভিহিত করা যায়।

চতুর্থত, আমরা দেখছি যে আগের মতোই মেগা প্রজেক্ট নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে জনগণের সম্মতি ছাড়াই, যথেষ্ট জনঅংশগ্রহণ না করেই এবং অতীতের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা না করেই। আমরা তিস্তা মাস্টারপ্ল্যান এবং পদ্মা ব্যারেজ সংক্রান্ত সরকারের স্পষ্ট অঙ্গীকার শুনেছি। তবে, যা আমরা দেখিনি তা হলো এই ধরনের মেগা প্রজেক্ট নিয়ে পূর্বে উত্থাপিত উদ্বেগগুলোর কোনো অর্থপূর্ণ পর্যালোচনা বা প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন যা এগুলোর আগে হওয়া উচিত। উদাহরণস্বরূপ, পদ্মা ব্যারেজ নিয়ে এগোতে হলে ফারাক্কা ব্যারেজের অভিজ্ঞতা খতিয়ে দেখা উচিত, তিস্তা ব্যারেজের অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করা উচিত, গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্পের অভিজ্ঞতাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। এরকমভাবে, বিশেষজ্ঞদের দ্বারা প্রকাশিত মতামত ও উদ্বেগের যথাযথ ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। পূর্বের সরকারের সময় আমরা দেখেছি, নীতিনির্ধারক কর্মকর্তারা বারবার দায়িত্বশীল বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং সমাজ থেকে উদ্ভূত প্রশ্নগুলো উপেক্ষা করতেন। জোরজবরদস্তি করেই ধ্বংসাত্মক মেগা প্রজেক্টগুলো একটার পর একটা এগিয়ে নিয়ে যেতেন। আমরা এখনো একই ধারা দেখতে চাই না।

পঞ্চমত, গণবিদ্রোহের সময় আমরা বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের প্রতিবাদে গ্রাফিতি দেখেছি, যেমন শ্রেণিবৈষম্য, ধর্মীয় বৈষম্য, জাতিগত বৈষম্য এবং লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা ছবি সব দেয়াল সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু সরকার এবং বিরোধী দল এখন যে অবস্থান নিয়েছে তাতে এই অসাম্যগুলো সমাধান করার পথে যাওয়ার জন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ মনোযোগের ইঙ্গিত দেয় না। বরং অর্থনৈতিক নীতি আগের ধারাতেই চালানো হচ্ছে। জ্বালানি, পাটকল, চিনিকল নিয়ে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত এরই বহিঃপ্রকাশ।

এই পরিস্থিতি খুব যৌক্তিকভাবেই আমাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের ওপর পড়ে। একই সময়ে, নাগরিক সমাজেরও এই বিষয়ে সক্রিয় এবং স্পষ্ট ভূমিকা রাখতে হবে। নাগরিকদের সজাগ এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া, বৈষম্য, কতিপয়ের লুণ্ঠন, স্বৈরতন্ত্র এবং আধিপত্যমুক্ত বাংলাদেশের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা সম্ভব হবে না।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তক। সাবেক সদস্য সচিব, তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি। সম্পাদক, সর্বজন কথা।