জুলাই গণআন্দোলনের শেষ সময়ে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট লক্ষ্মীপুরে যুবলীগ নেতা একেএম সালাহ উদ্দিন টিপুর নেতৃত্বে যুবলীগ-ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের নির্বিচার গুলিতে শহীদ হন চার মেধাবী শিক্ষার্থী। আহত হন তিন শতাধিক আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা। এ অবস্থায় প্রতিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। ছাত্র-জনতা টিপুর দুটি ভবনে আগুন লাগিয়ে দিলে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যান টিপু। মূলত ওই দিনই লক্ষ্মীপুরে ফ্যাসিবাদের দোসরদের কালো অধ্যায়ের অবসান ঘটে। গণঅভ্যুত্থানে লক্ষ্মীপুর, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে এই জেলার ১৭ জন শহীদ হন।
গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর হয়ে গেলেও প্রকৃত অপরাধীদের বিচার না হওয়ায় শহীদ ও আহত পরিবারগুলোতে অসন্তোষ বিরাজ করছে। তাদের অভিযোগ, অপরাধীদের অনেকে গ্রেপ্তার হলেও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে জামিনে বের হয়ে যাচ্ছে। সন্তান নেই, আজও সেটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে শহীদ পরিবারগুলোর। পাশাপাশি গুলিবিদ্ধ অনেকেই সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত।
লক্ষ্মীপুরে ৪ আগস্ট প্রথম শহীদ হন সাদ আল আফনান শহরের মাদাম ব্রিজ এলাকায়। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে বেলা ১১টায় আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর সালাহ উদ্দিন টিপুর নেতৃত্বে বায়েজিদ ভূঁইয়া, সেবাব নেওয়াজ, হুমায়ুন কবির পাটওয়ারী, সামিমসহ যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মীরা আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হামলা চালায়। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের ধাওয়ায় নেতাকর্মীদের নিয়ে পালিয়ে শহরের তমিজ মার্কেট এলাকায় পিংকি প্লাজায় বাড়ির ছাদে অবস্থান নেন টিপু। পরে আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে টিপুর বাসভনের সামনে পৌঁছালে টানা ৪ ঘণ্টা থেমে থেমে সড়কে অবস্থানরত ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে টিপু ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী। এ সময় গুলিতে শহীদ হন শিক্ষার্থী সাব্বির হোসেন, কাউছার হোসেন বিজয় ও ওসমান গনি। গুলিবিদ্ধসহ আহত হন আরও ৩০০-র বেশি ছাত্র-জনতা।
বিকেল সাড়ে ৪টায় আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে টিপুর দুটি ভবনে আগুন লাগিয়ে দিলে একপর্যায়ে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যান টিপু। ওই দিন উভয় পক্ষের নিহত হন ১২ জন। টিপু লক্ষ্মীপুরের আলোচিত সাবেক পৌর মেয়র আবু তাহেরের মেজো ছেলে। তার ইশারাতেই জেলাজুড়ে চলত সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জের শফীপুর এলাকায় দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন শহীদ সাব্বিরের বাবা আমির হোসেন। একমাত্র ছেলে ছিলেন সাব্বির। তার স্ত্রী ও এক শিশুসন্তান রয়েছে। ছেলের শরীরের ক্ষতবিক্ষত ছবি বুকে নিয়ে কান্নাকাটি করছেন আমির হোসেন ও মা মায়া বেগম। কোনোভাবেই ওই হত্যাকা-টি মেনে নিতে পারছেন না। তারা জানান, যে আশায় সাব্বিরের মতো ছাত্ররা বুকের তাজা রক্ত দিয়েছে, তা যেন মুছে না যায়। তারা হত্যাকা-ে জড়িত টিপুসহ অন্যদের বিচার ও গ্রেপ্তার নিশ্চিতের দাবি জানান।
শহীদ আফনানের মা নাসিমা আক্তার বলেন, ‘ছেলেকে হারানোর দুই মাস আগে স্বামীকে হারিয়েছি। গণঅভ্যুত্থানে ছেলেকেও হারিয়েছি। দুই বছর হলো মামলা করে বিভিন্ন হুমকি ধমকির কারণে ভয়ে এখন অন্যত্র বসবাস করি। আশা করেছিলাম, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় গেলে ছেলের হত্যার বিচার পাব। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সেই আশা আর নাই। সন্ত্রাসীরা যেভাবে আফনানকে হত্যা করেছে, পশুপাখিকেও মানুষ এমনভাবে মারে না।’ তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জীবদ্দশায় ছেলে হত্যার বিচার দেখে যাওয়ার আকুতি জানান।
শুধু নাছিমা আক্তার ও আমির হোসেনই নন, একই চিত্র জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রত্যেক শহীদের পরিবারের। দেশে নির্বাচিত নতুন সরকার গঠন হয়েছে। কিন্তু শহীদ পরিবারের সদস্যরা এখনো স্বজন হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ফিরতে পারেননি স্বাভাবিক জীবনে। গুলিবিদ্ধ অনেকেরই টাকার অভাবে সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে না। বাহিরে নিয়ে চিকিৎসা করানোর কথা থাকলেও তা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন গুলিবিদ্ধ আহত অনেকেই।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হোসাইন মো. রায়হান কাজেমী বলেন, জুলাই আন্দোলনে শহীদের ঘটনায় দুটি হত্যাসহ মোট তিনটি মামলা হয়। প্রধান আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে বলে জানান তিনি।
এদিকে, জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট হাছিবুর রহমান ও জেলা জামায়াতে ইসলামীর যুগ্ম সম্পাদক মহসিন কবির মুরাদ বলেন, ফ্যাসিস্টের দোসরদের বিরুদ্ধে আন্দোলন একক কোন দলের নয়, এটি ছাত্র-জনতাসহ সবার। জামায়াত নেতা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানান।