জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পেছনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন দেশের প্রধান কয়েকটি বাম নেতাকর্মী ও অ্যাক্টিভিস্টরা। অভ্যুত্থানের দুই বছরের মাথায় এসে তারা বলছেন, দেশে পরিবর্তনের প্রত্যাশার অনেকটাই এখনো পূরণ হয়নি। গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের জন্য নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, গণমুখী প্রশাসনিক কাঠামো এবং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার কথা থাকলেও তা এখনো দৃশ্যমান নয়। জনগণের প্রত্যাশা এবং গণঅভ্যুত্থানের ঘোষিত আকাক্সক্ষার মধ্যে দৃশ্যমান ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ কারণে জুলাইকে ব্যর্থ বলা যাবে না। গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের জন্য আরও অনেকটা পথ হাঁটতে হবে।
দেশের কয়েকটি বাম সংগঠনের নেতা ও অ্যাক্টিভিস্টরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটানোই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অর্জন। এর বাইরে রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংস্কারের আকাক্সক্ষায় বিশেষ অগ্রগতি হয়নি। তবে মানুষের মধ্যে যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হয়েছে, তা দেশে নতুন কোনো দমনমূলক শাসনব্যবস্থাকে মেনে নেবে না।
জাসদ (রব) সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, ‘এই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মানুষের ভেতরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক সাহস, প্রতিবাদের স্পর্ধা এবং স্বাধীন সত্তার জাগরণ। এটিই জুলাইয়ের সর্বোচ্চ তাৎপর্য। জনগণের মুক্তি সংগ্রাম, গণঅভ্যুত্থান কখনো ব্যর্থ হয় না; ব্যর্থ হয় সরকার। এ জন্য আমি জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ বলব না; বরং বলব এর সম্ভাবনার একটি বড় অংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, গণমুখী প্রশাসনিক কাঠামো এবং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। জনগণের প্রত্যাশা এবং গণঅভ্যুত্থানের ঘোষিত আকাক্সক্ষার মধ্যে একটি দৃশ্যমান ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে। এমনও হতে পারে, রক্তের আত্মত্যাগের ওপর প্রতিষ্ঠিত সরকার গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষার পরিবর্তে ক্ষমতা সংরক্ষণকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তারা জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রকাশকে উপেক্ষা করছে, গণভোটের জনমতকে অস্বীকার করছে, কিংবা জনগণকে দেওয়া রাজনৈতিক অঙ্গীকার ভঙ্গ করছে। সেসব ঘটলেও তার অর্থ এই নয় যে গণঅভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে। বরং বলা যেতে পারে, সরকার ব্যর্থ হতে পারে; আন্দোলন নয়।’
সবশেষ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে আ স ম আবদুর রব বলেন, ‘শেখ হাসিনার সরকারের শাসনামলের নির্বাচনের সঙ্গে এই নির্বাচনের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর ধরনটি ছিল ফলাফল আগে, নির্বাচন পরে। পুরো প্রক্রিয়াই ছিল পূর্বপরিকল্পিত। অধিকাংশ প্রার্থীই সেই পরিকল্পনার অংশ ছিলেন। তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিরোধী দলের অংশগ্রহণ এবং ভোটারদের সম্পৃক্ততা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। অন্যদিকে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রতিযোগিতার সীমাবদ্ধতা, অংশগ্রহণের ঘাটতি ছিল। গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলে ব্যাপক প্রশ্নের মুখে পড়েছিল।’
আরেক বাম রাজনীতিক ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘এই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে তো অন্য কোনো লক্ষ্য স্পষ্টভাবে ছিল না। তবে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল যে, দেশে একটা গণতান্ত্রিক সংস্কার হবে বা গণতান্ত্রিক রূপান্তর হবে। সে রূপান্তর ঘটেনি। অবশ্য এর জন্য যে সাংগঠনিক রাজনৈতিক শক্তি দরকার, সেগুলোর দুর্বলতা ছিল বলেই গণতান্ত্রিক সংস্কার বা গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটেনি। সেদিক থেকে বলা যায় খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘এ অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল অত্যাচারী শাসকের পরিবর্তন, সেটা হয়েছে। এটাই বড় অর্জনের ঘটনা। তবে অভ্যুত্থানের পরে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে আসা অন্তর্বতী সরকার একটা বিশ্বাসঘাতকের ভূমিকা গ্রহণ করে। তারা গোপনে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু উপদেষ্টার ভূমিকা দেখে মনে হয়েছে, মুহাম্মদ ইউনূস তাদের বিভিন্ন দেশের কিংবা বিভিন্ন করপোরেট স্বার্থের লবিস্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।’
গণঅভ্যুত্থানের ভেতরের গোপন শত্রুরা পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের ওপর আক্রমণ করছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিগুলোর ওপর তারা আক্রমণ করছে। ফলে গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে যে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আকাক্সক্ষা ছিল, তার বিরোধী একটা যাত্রা আমরা দেখতে পাই।’
তিনি বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে আরও স্বাধীন করা, বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীন করা, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, মতাদর্শিক, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটাকে আরও জোরদার করা। কিন্তু দেখা গেল কিছু গোষ্ঠী এই গণঅভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশের সব সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির ওপর হামলা করছে। তারা মাজার, বাউল, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন চিহ্ন, ম্যুরাল, ভাস্কর্য, নাটক, গান, থিয়েটার, নারীর চলাফেরা সমস্ত কিছুর ওপরে চড়াও হচ্ছে। এসব গোষ্ঠী অভ্যুত্থানের সময়ে গুপ্ত অবস্থায় ছিল। আমি মনে করি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান মুক্তিযুদ্ধেরই একটা ধারাবাহিকতা। মুক্তিযুদ্ধের পরে মুক্তিযুদ্ধ যেভাবে জনগণের হাত থেকে চলে গিয়েছিল, বেদখল হয়ে গিয়েছিল, এই গণঅভ্যুত্থানও বেদখল করার চেষ্টা আছে।’
সবশেষ সংসদ নির্বাচনটি ইতিহাসে প্রশ্নবিদ্ধ হবে না মন্তব্য করে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘২০২৬-এর নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ ও একতরফা হবে না। কারণ এর আগেই এমন একটি দল ক্ষমতায় ছিল, যারা যে মাত্রায় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে ইতিহাসে তার কোনো পূর্ব দৃষ্টান্ত নেই। মুক্তিযুদ্ধ বাদ দিলে এ রকম নৃশংসতা ও বর্বরতা বাংলাদেশ পর্বে আমরা দেখিনি। এ রকম নৃশংসতার পরে আওয়ামী লীগ সঙ্গে সঙ্গেই নির্বাচনে অংশ নেবে, নির্বাচনে থাকবে এটা অপ্রত্যাশিত। ফলে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখা আবশ্যক ছিল।’
আওয়ামী লীগ একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিষিদ্ধ হয়েছে দাবি করে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘একটা দল নিষিদ্ধ করে তো রাজনীতি নিষিদ্ধ করা যায় না। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করলে বরং সুবিধাই হয়। সেটা জামায়াতে ইসলামীকে দিয়ে প্রমাণ পাওয়া যায়। জামায়াতের অপরাধ তো অনেক বড়। তারা গণহত্যার সঙ্গে জড়িত, শত শত মানুষকে হত্যা করেছিল। সে কারণে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার দাবিও ছিল। সরকার সরাসরি নিষিদ্ধ না করলেও কার্যত নিষিদ্ধ ছিল। তার কর্মকাণ্ডের ওপরে নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু দল নিষিদ্ধ করলে যে রাজনীতি নিষিদ্ধ হয় না, সেটার প্রমাণ হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে জামায়াতের শক্তি বহুগুণে বেড়েছে।’
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহামুদুর রহমান মান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের প্রত্যাশা ছিল একটা নতুন দেশ। একটা সুস্থ, সুন্দর, বাসযোগ্য দেশ। সেটার জন্য যেসব সংস্কার দরকার ছিল এই কয়েক মাসে এগুলোর বাস্তবায়ন মনে হচ্ছে হয়নি। এখন প্রকাশ্যে কথা বলা যাচ্ছে, আগের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাওয়া যাচ্ছে। পরিস্থিতি আগের চেয়ে নিশ্চয়ই ভালো আছে, তবে আরও ভালোর জন্য যে সংস্কারমূলক কাজ দরকার ছিল, সেগুলো হয়নি। ফলে আগের শঙ্কাটা থেকে যাচ্ছে।’
আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতির রেজাল্ট। এখানে আওয়ামী লীগের নির্বাচন করার বাস্তব কোনো পরিস্থিতি ছিল না। তবে ইথিক্যাল ছিল কি না, পলিটিক্যাল ছিল কি না সেটা বিতর্কিত ব্যাপার। তবে জনগণের একটা সেকশনকে বাদ দিয়ে দেশ গঠন হবে না। তাদেরও ইনক্লুড করতে হবে। সেটা হয়তো ধীরে ধীরে হবে। তবে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটার কোনো বিকল্প ছিল বলে আমার মনে হয় না।’
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জুলাই সম্পর্কে আমাদের দলীয় একটা মূল্যায়ন আছে। তা হলো পুঞ্জীভূত বিক্ষোভ যেটা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তৈরি হয়েছিল। মানুষ ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি। এ পুঞ্জীভূত ক্ষোভ কোটা আন্দোলনের ওপর ভর করেছিল। অর্থাৎ পার্টিকুলার ইস্যু বেজড আন্দোলনটা জেনারেল কানেকশন সৃষ্টি করেছিল।’
তিনি বলেন, ‘দেশে নির্বাচন হয়েছে, নতুন সরকার দেশ পরিচালনা করছে, কিন্তু ক্ষমতা এখনো বিদেশি দূতাবাসকেন্দ্রিক রয়ে গেছে। আমেরিকান দূতাবাস এখনো ডিক্টেট করছে। ধরে নিলাম ফার্স্ট ফেইজ এনিমি ছিলেন শেখ হাসিনা। তাহলে সেকেন্ড ফেইজের এনিমি কে? সেকেন্ড ফেজের এনিমি হলো অ্যান্টি-ডেমোক্রেটিক ফোর্সটা। এরা হলো সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। এ শক্তিকে লিড করেছে অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকার। এরা পরস্পর পরস্পরকে সহযোগিতা করেছে। এরই অংশ হিসেবে ইউনূস মব সন্ত্রাস শুরু করলেন। শুরু হলো বিভিন্ন ধরনের ভাস্কর্য ভাঙা, মাজার ভাঙা, মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভাঙা, ৩২ নম্বর ভাঙা।’
শাহ আলম বলেন, ‘মৌলবাদী শক্তি যখনই চব্বিশ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা শুরু করেছে, তখন থেকেই দেশের মানুষ সরে যেতে শুরু করে। মানুষ দেখল অন্তর্বর্তী সরকার একটি পাওয়ার সেন্টার। জামায়াত, বিএনপি, এনসিপি, সামরিক বাহিনী সবাই পাওয়ার সেন্টার হয়ে গেল। এতে করে দেশে নৈরাজ্য বেড়ে গেল। মানুষ তটস্থ হয়ে পড়ল। তবে আফটার ইলেকশন, পাওয়ার সেন্টার একটাতে এসেছে। গণঅভ্যুত্থানের পর অর্জন তেমন নেই, তবে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে, এটাই অ্যাচিভমেন্ট।’