রাষ্ট্র সংস্কার দাবিতে অনড় এনসিপি

৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাশিত রাষ্ট্র সংস্কার ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এখনো বাস্তবায়ন হয়নি বলে মনে করছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলের নেতাদের দাবি, গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক পরিবেশে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও সংবিধানসহ রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার, জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা এবং জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা অপূর্ণ রয়ে গেছে।

এনসিপির সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জনগণের প্রত্যাশা কখনো কমে না। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর মানুষ রাষ্ট্রের প্রতিটি কাঠামোয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আশা করেছিল। তবে বিভিন্ন বাস্তবতায় সেই প্রত্যাশার পুরোটা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। যেকোনো বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পরও সেই প্রত্যাশার সবটুকু পূরণ হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।’

তিনি বলেন, ‘এনসিপি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দলটি সাংগঠনিকভাবে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। মতাদর্শগত কারণে কেউ দল ছেড়েছেন, আবার একই কারণে অন্য দল থেকে অনেকে এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। এটিকে ভাঙা-গড়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।’ জোট রাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কোনো লাভ-ক্ষতির হিসাব করে নয়, বরং অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। প্রত্যাশিত সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত এ দাবিতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ চলবে।’

এনসিপি নেতারা মনে করছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে পরিবর্তনের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা এখনো অর্ধেক পথে রয়ে গেছে। নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার মতো কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার হয়নি। বিশেষ করে গণভোটে জনগণ রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে রায় আসার পরেও সে অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের কার্যক্রম শুরু না হওয়াকে তারা বড় ধরনের অপূর্ণতা হিসেবে দেখছেন।

এনসিপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জুলাইয়ের চেতনা হারিয়ে যায়নি। তবে তা এখন কঠিন এক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে থাকা একটি রাষ্ট্রকে অল্প সময়ে বদলে দেওয়া সম্ভব নয়।’

তার ভাষায়, ‘জুলাইয়ের চেতনা শুধু সরকার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জবাবদিহিমূলক শাসন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাই ছিল মূল লক্ষ্য। বাস্তব রাজনীতির নানা টানাপড়েনে মানুষের মধ্যে কিছুটা হতাশা তৈরি হলেও আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি অটুট রয়েছে।’

আতিক মুজাহিদ স্বীকার করেন, তাদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা ছিল। পাশাপাশি পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতিরোধও সংস্কারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের পর রাষ্ট্র পরিচালনা, নির্বাচন ও সংস্কার প্রশ্নে মতপার্থক্য হওয়া স্বাভাবিক। তবে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাই এনসিপির লক্ষ্য। জাতীয় স্বার্থে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ইস্যুভিত্তিক সহযোগিতা গণতান্ত্রিক রাজনীতির অংশ। আমরা ব্যক্তি বা দলের নয়, নীতির পক্ষে রাজনীতি করছি।’

এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মানুষের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণœ হয়েছিল। সে সময়ে গুম-খুনের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পেয়েছে গুম কমিশন। আমাদের তখন স্বাধীনতা ছিল না। ৫ আগস্টের মধ্য দিয়ে দেশের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ থাকলেও দেশে গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটাধিকার ফিরে এসেছে। এগুলো আমাদের জুলাইয়ের বড় অর্জন।’

আদীব বলেন, ‘এসব অর্জনের পাশাপাশি রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার এখনো শেষ হয়নি। তাই জুলাই অভ্যুত্থানের প্রকৃত লক্ষ্য বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কারসহ প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত শেষ করা প্রয়োজন। জুলাই অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে আর কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বৈরাচারী ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও গোপন বন্দিশালার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না এবং আইনের শাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে শিক্ষিত বেকারত্ব নিরসন, কৃষক-শ্রমিকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সমান ন্যায়বিচার এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিও জুলাইয়ের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল।’

এনসিপির নেতারা বলছেন, রাষ্ট্রের মালিকানা কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকারের নয়। সাধারণ জনগণের মালিকানা নিশ্চিত করাই ছিল জুলাই আন্দোলনের মূল দর্শন। জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন তখনই হবে, যখন সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভিত্তি সুসংহত হবে।