ঢাকা শহরে সমকালীন শিল্পচর্চার এক ভিন্ন ও নির্ভীক স্বরের নাম ‘কলাকেন্দ্র’। চার দেয়ালের মাঝে বাঁধাই করা কিছু ছবি ঝুলিয়ে রাখার চিরাচরিত গ্যালারি থেকে বের হয়ে কলাকেন্দ্র হয়ে উঠেছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও স্বাধীন ভাবনার এক মুক্ত জায়গা। যেখানে গতানুগতিক ‘বাজারী আর্ট’ বা বাণিজ্যিক চোখ ধাঁধানো শিল্পের ভিড়ে ঠাঁই পায় ব্যতিক্রমী, অপ্রথাগত ও গবেষণাধর্মী শিল্পকর্ম। কলাকেন্দ্র মূলত সেই সব তরুণ ও স্বাধীন ভাবনার শিল্পীদের আশ্রয়স্থল, যাদের কাজের ভেতরে রয়েছে নতুন ভিজ্যুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ গড়ার অদম্য সাহস ও স্বতাড়না। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বহু প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পী তাদের জীবনের প্রথম একক প্রদর্শনী বা আত্মপ্রকাশের সাহস পেয়েছেন এই কলাকেন্দ্রের হাত ধরেই। কলাকেন্দ্রের ১১ বছরের পথচলা, তরুণ শিল্পীদের সংগ্রাম, আর্ট মার্কেট আর বিশ্ব শিল্পের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের শিল্পচর্চার গতি-প্রকৃতি কথা বলেছেন কলাকেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও শিল্পী ওয়াকিলুর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
প্রশ্ন : কলাকেন্দ্রের শুরুটা আসলে কীভাবে হয়েছিল? পেছনের ভাবনা আর যারা এই যাত্রায় যুক্ত ছিলেন, তাদের কথা একটু বলুন।
ওয়াকিলুর রহমান : কলাকেন্দ্র হঠাৎ করে গড়ে ওঠা কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। এর ইতিহাসটা বেশ লম্বা। শুরু করার আগেই আমাদের অনেকেরই বিভিন্ন সংগঠন বা যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছিল। একদম প্রথম দিক থেকেই ঢালী আল মামুন, দিলারা বেগম জলি, নিসার হোসেন, শিশির ভট্টাচার্য্য, সাইদুল ইসলাম জিউস, ফারহা যেবা এঁরা সবাই যুক্ত ছিলেন। ‘কিবরিয়া প্রিন্ট স্টুডিও’ থেকে তমাল, ববি এদের মতো অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে-বাইরে থেকে আমাদের সঙ্গে কাজ করে গেছেন।
আমাদের কিছু শুভাকাক্সক্ষীও শুরু থেকে পাশে ছিলেন। আবুল মনসুর, শিল্পী নাজলী লায়লা তারা মানসিকভাবে উৎসাহ দিয়েছেন, সহায়তার হাতও বাড়িয়ে দিয়েছেন। লালন সেন্টারের তৌফিক তূরীসহ অনেকেই নানাভাবে আছেন।
তরুণদের কথা না বললেই নয়। বিভিন্ন ধাপে বহু তরুণ এসেছে এবং স্বপ্রণোদিত হয়ে কাজ করেছে। তাদের অবদানকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানানো উচিত। ঢাকা আর্ট সেন্টারের হয়ে কিউ কাজ করত, পরে কেশকা শাহবা প্রায় দুই-তিন বছর নিয়মিত আমাদের সঙ্গে ছিল। এখনো প্রতিটা সময়ে চার-পাঁচজন করে তরুণ ভলান্টিয়ার হিসেবে থাকে। তাদের জন্যই এই কার্যক্রম আমরা টেনে নিয়ে যেতে পারছি।
আর্থিকভাবে আমরা কোনো সবল প্রতিষ্ঠান নই যে, বড় পেশাদার টিম রেখে বেতন দিয়ে কাজ করাব। আর সেটা আমাদের উদ্দেশ্যও নয়।
প্রশ্ন : তাহলে কলাকেন্দ্রের মূল উদ্দেশ্য কী? প্রচলিত বাণিজ্যিক গ্যালারির চেয়ে কতটা আলাদা?
ওয়াকিলুর রহমান : আমরা চেয়েছি বাজারে প্রফেশনাল বাণিজ্যিক গ্যালারি আরও বেশি গড়ে উঠুক। শিল্পচর্চায় সেটারও দরকার আছে। কিন্তু আমরা নিজেরা যেহেতু পেশাদার আর্টিস্ট এবং শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত, তাই প্রফেশনাল আর্ট গ্যালারি বানাতে চাইনি। বরং একটা ‘প্রজেক্ট গ্যালারি’ করতে চেয়েছি।
এমন একটা জায়গা, যেখানে আমাদের চিন্তা, শিল্পভাবনা আর নতুনদের পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো দেখানো যায়। আমরা চাই প্রচুর শিল্পী সক্রিয় হোক, গ্যালারির স্পেস তৈরি হোক, সংগ্রাহক তৈরি হোক। কলাকেন্দ্রে আমরা সচেতনভাবেই বাজারের হিসাব-নিকাশকে একটু দূরে রেখেছি।
আজকে ঢাকার লালমাটিয়াতেই অনেকগুলো গ্যালারি গড়ে উঠেছে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের অর্থায়নে বা অলিয়ঁস ফ্রঁসেজে স্বতন্ত্র প্রজেক্ট হচ্ছে। এগুলোতে কাজের উপস্থাপনা, এক্সিবিশন ডিজাইন বা কিউরেশনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আমরা সরাসরি দাবি করব না যে, এতে আমাদের বিশাল ভূমিকা আছে। কিন্তু যারা আমাদের কাজ ও গবেষণা গভীরভাবে দেখবেন, তারা বুঝবেন এই ইতিবাচক পরিবর্তনের পেছনে কলাকেন্দ্রের একটা পজিটিভ প্রভাব রয়ে গেছে।
প্রশ্ন : শিল্প, বাজার আর আমাদের জাতীয় আর্ট ইকোসিস্টেমের বর্তমান অবস্থাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
ওয়াকিলুর রহমান : আর্ট ইকোসিস্টেমের বড় একটা অংশ হলো স্পেস তৈরি হওয়া আর বন্ধ হওয়া। একটা স্পেস কিছুদিন জাঁকজমক করে চলে, আবার হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। এই রূপান্তরটাই আর্টের ইকোসিস্টেমের নিয়ম।
শিল্পের সঙ্গে দেশের বাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতির সরাসরি সম্পর্ক আছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় পর্যায়ের যেসব প্রতিষ্ঠান আছে, সেখানে শিল্পের কোনো বড় ইতিবাচক রূপান্তর দেখা যায় না। পরিবর্তন খুব ধীর, প্রায় স্থবির।
তার বিপরীতে বড় পরিবর্তনটা হচ্ছে ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে। সামদানী আর্ট ফাউন্ডেশন, দুরজয় আর্ট ফাউন্ডেশন, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন এরা শিল্পচর্চাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ছোট ছোট অনেক গ্যালারিও নিজেদের মতো করে লড়ে যাচ্ছে।
প্রশ্ন : এই বাস্তবতায় একটা অলাভজনক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কলাকেন্দ্র চালানোর চ্যালেঞ্জগুলো কী?
ওয়াকিলুর রহমান : আমরা যে কাঠামোতে কলাকেন্দ্র চালাই, সেখানে এক ধরনের অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। আমরা একটা নির্দিষ্ট জেনারেশন, নিজেদের কাজেও ব্যস্ত থাকতে হয়। সময়ের সঙ্গে আর্থিক কাঠামোর নানা চড়াই-উতরাই পার হতে হয়।
ঢাকার রিয়েল এস্টেটের পরিস্থিতি তো জানাই। অনবরত স্ট্রাকচার পাল্টাচ্ছে, ভাড়া বাড়ছে, বড় বাণিজ্যিক বলয়ের প্রভাব স্পষ্ট। এই অবস্থায় একটা স্থায়ী স্পেস পাওয়া আর টিকিয়ে রাখা ভীষণ কঠিন। ঢাকার মতো জায়গায় এমন একটা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা বেশ জটিল সংগ্রাম।
তবে আমরা একটা বিষয়ে খানিকটা নির্লিপ্ত। যতদিন পারি, নিজেদের সামর্থ্যরে মধ্যে চালিয়ে যাব। কারণ এই স্পেসের মাধ্যমেই আমরা নতুন ও তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছি। না হলে একদিন এটা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। তারপর নতুন প্রজন্ম এসে নিজেদের মতো করে নতুন স্পেস তৈরি করবে, কাজকে সামনে এগিয়ে নেবে।
প্রশ্ন : গত এগারো বছরে কলাকেন্দ্রে যে প্রদর্শনীগুলো হয়েছে, সেগুলোতে কী ধরনের পরিবর্তন দেখেছেন? শুরুর এক্সিবিশন আর আজকের এক্সিবিশনের পার্থক্য কোথায়?
ওয়াকিলুর রহমান : এগারো বছরের এই যাত্রায় কাজগুলোর মধ্যে এক ধরনের সুশৃঙ্খল ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে। শুরুতেই আমরা একটা বিশেষ ডিসিপ্লিন ঠিক করে নিয়েছিলাম, যাতে অহেতুক সংগ্রাম করে শক্তি নষ্ট না হয়। হিসাব করে নিয়েছিলাম খুব সাশ্রয়ী বাজেটে অত্যন্ত মানসম্মত কাজ কীভাবে চালিয়ে যাওয়া যায়।
দীর্ঘ দশ-এগারো বছরে আমরা প্রায় আশিটিরও বেশি প্রদর্শনী করেছি। প্রতি মাসে নিয়ম করে একটা করে এক্সিবিশন হয়, শিল্পীকে নিয়ে একটা ছোট ক্যাটালগ বা পাবলিকেশন প্রকাশ করি, আর প্রতি মাসে অন্তত দুবার আর্ট সম্পর্কিত বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা বা আলোচনার ব্যবস্থা রাখি।
পাবলিকেশনের কপিগুলো শিল্পীদের হাতে তুলে দিই, ফ্রি ডিস্ট্রিবিউশনের মাধ্যমে লাইব্রেরিগুলোতে পাঠাই। এর ফলে তারা এই ডকুমেন্ট দিয়ে বিশ^বাজার বা অন্য জায়গায় নিজেদের সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারে।
প্রশ্ন : আপনারা তো অনেক জাঁকজমকপূর্ণ কমার্শিয়াল বা সেলিব্রিটি আর্ট শো-এর পেছনে হাঁটেননি। কিউরেশনের পেছনের মূল পছন্দ কী ছিল?
ওয়াকিলুর রহমান : তথাকথিত খুব জনপ্রিয় বা বাণিজ্যিক সেলিব্রিটি শিল্পীদের নিয়ে আমরা খুব কম কাজ করেছি। যদি বড় তারকা বা বর্ষীয়ান শিল্পীদের কাজ করে থাকি, তার উদ্দেশ্য বাজার ছিল না গবেষণা আর তাদের নতুন করে পাঠ করা।
আমরা মূলত তিন ধরনের প্রজেক্টে নজর দিয়েছি :
এক. তরুণ ও সম্ভাবনাময় শিল্পী যাদের কাজের মধ্যে তীব্র তাড়না, সততা আর নতুন ভিজ্যুয়াল ভাষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সাহস আছে।
দুই. আউটসাইডার আর্ট যারা আর্ট একাডেমি বা প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই ভেতরের প্রবল তাড়না থেকে আঁকেন। এমন পাঁচ-ছয়জন অসাধারণ শিল্পীকে আমরা এক্সিবিশন করিয়েছি। তাদের কাজে এক দুর্লভ মৌলিকত্ব খুঁজে পেয়েছি।
তিন. গবেষণাধর্মী ও আর্কাইভাল প্রদর্শনী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে সেখানকার শিল্পীদের নিয়ে চল্লিশজনের কাজ নিয়ে ‘চর্যা’ নামের এক্সিবিশন করেছিলাম। সম্প্রতি চারজন প্রথিতযশা মাস্টার আর্টিস্ট শফিউদ্দীন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, মনিরুল ইসলাম আর রফিকুন নবীর শুরুর দিকের গ্রাফিক্স মিডিয়ার কাজগুলো নিয়ে একটা প্রদর্শনী করেছি। বিভিন্ন ব্যক্তিগত সংগ্রাহকের কাছ থেকে যোগাযোগ করে এই অমূল্য কাজগুলো একত্রিত করা হয়েছিল। দেশে তো এমন স্থায়ী স্পেস কম, যেখানে মাস্টার আর্টিস্টদের এই জাতীয় আর্কাইভাল কাজ নিয়মিত দেখা যায়। সেই অভাবটাই আমরা কিছুটা পূরণের চেষ্টা করছি।
প্রশ্ন : অনেক গ্যালারিতে পোর্টফোলিও জমা নিয়ে বাছাই করা হয়। আপনারা কীভাবে তরুণ শিল্পীদের নির্বাচন করেন?
ওয়াকিলুর রহমান : সত্যি বলতে, কেউ পোর্টফোলিও দেখাল আর আমরা সঙ্গে সঙ্গে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলে দিলাম এই বিষয়টা আমরা পছন্দ করি না। কারণ একসময় আমরাও তরুণ আর্টিস্ট ছিলাম। কাজ নিয়ে গ্যালারিতে গ্যালারিতে ঘোরার অভিজ্ঞতা কতটা কষ্টের, সেটা জানি। কাউকে সরাসরি ‘না’ বললে সে হয়তো মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে।
তাই আমরা নিজেরাই তাদের খোঁজ রাখি। বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক এক্সিবিশনে যাই, শিক্ষক ও শিল্পীদের সঙ্গে খোঁজখবর নিই। এখন তো সোশ্যাল মিডিয়ার জমানা তরুণদের আইডিয়া ও কাজের ধরন অনলাইনেও দেখা যায়।
যখন দেখি কোনো তরুণের কাজের মধ্যে নিখাদ অনুসন্ধিৎসা আছে, সে প্রথাগত ফর্ম ভেঙে নতুন উপস্থাপন, ম্যাটেরিয়াল আর ভাষা নিয়ে কথা বলতে চাইছে তখন আমরা নিজেরাই তাকে কলাকেন্দ্রে আমন্ত্রণ জানাই। বলি, এসো, একসঙ্গে কাজটা করি।
প্রশ্ন : আপনারা যে তরুণ অল্টারনেটিভ আর্টিস্টদের প্রচার করছেন, তাদের আর্ট মার্কেট গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কলাকেন্দ্রের পদক্ষেপ কী?
ওয়াকিলুর রহমান : জোর করে আর্ট মার্কেট তৈরি বা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। একটা শিল্পকর্ম মূলত তিনভাবে কালেকশনে যায় ব্যক্তিগত সংগ্রাহক, শিল্পরসিক আর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা।
আমাদের এখানে যেসব তরুণ আসে, তাদের বড় কোনো প্রথাগত পোর্টফোলিও বা ট্র্যাক রেকর্ড থাকে না। অথচ কমার্শিয়াল বাজারে পোর্টফোলিও একটা বড় উপাদান। তারপরও আনন্দের কথা হলো কলাকেন্দ্রে প্রদর্শনীর মাধ্যমে শুরু করে আজ অনেক তরুণ শিল্পী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে পেরেছেন।
একজন শিল্পীর কাজের ভেতরের মৌলিকতা আর গভীরতাকে ক্রমাগত আলোচনার টেবিলে রাখা, ক্যাটালগ বানিয়ে মানুষের সামনে প্রদর্শন করা আর তার কাজকে সসম্মানে উপস্থাপন করাই আমাদের কাজ। বাকিটা সংগ্রাহক আর শিল্পীর নিজস্ব বোঝাপড়া।
প্রশ্ন : আপনি বহু বছর ইউরোপে থেকেছেন, চীনে পড়াশোনা করেছেন, বিশ্বশিল্পচর্চাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। পশ্চিমা বা আন্তর্জাতিক তরুণ শিল্পীদের তুলনায় বাংলাদেশের তরুণদের অবস্থান কোথায়?
ওয়াকিলুর রহমান : পার্থক্যের জায়গাটা আসলে তথ্যের চেয়ে বেশি প্রোডাকশন প্রসেসে।
আজকের তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের তরুণরাও বাইরের ট্রেন্ড, কনসেপ্ট বা কাজ সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। অনেক ক্ষেত্রে দেশীয় কাজের চিন্তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক চিন্তার একটা চমৎকার মিল পাওয়া যায়।
কিন্তু ঘাটতিটা তৈরি হয় আমাদের একাডেমিয়া বা প্রাতিষ্ঠানিক জায়গা থেকে। আন্তর্জাতিক স্তরে একজন শিল্পী তার কাজের পেছনের ফিলোসফি বা থিওরি যেভাবে গুছিয়ে বলতে পারেন, আমাদের শিল্পীদের সেখানে কিছুটা দুর্বলতা থেকে যায়। আর প্রোডাকশন প্রসেস ও স্মার্টনেসের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে একজন শিল্পীকে জীবনযাপন, কাজের উপকরণ, জায়গা, টিকে থাকা এগুলোর সঙ্গে এত বিশ্রীভাবে যুদ্ধ করতে হয়, যা বিদেশের শিল্পীদের ক্ষেত্রে অনেক সহজতর।
তারপরও আমাদের দেশের যে দুই-একজন শিল্পী আন্তর্জাতিক সার্কিটে নিয়মিত কাজ করছেন, তাদের প্রোডাকশন প্রসেস আর উপস্থাপনা দেখলে বোঝা যায় সুযোগ ও সঠিক চর্চা পেলে আমাদের তরুণরাও বিশ্বমঞ্চে অনন্য দৃষ্টান্ত রাখতে সক্ষম।
প্রশ্ন : চারুকলা থেকে শুরু করে চীন, ছাব্বিশ বছরের জার্মানি জীবন, তারপর ঢাকায় কলাকেন্দ্র এই দীর্ঘ শিল্পসফরের সারসংক্ষেপ যদি টানতে বলি...
ওয়াকিলুর রহমান : যখন চারুকলায় ভর্তি হয়েছিলাম, শিল্প সম্পর্কিত গভীরতা বা জীবনের ব্যাপকতা নিয়ে আমার কোনো স্পষ্ট ধারণাই ছিল না। কিন্তু আমি ভাগ্যবান ছিলাম। চারুকলায় পড়ার সময় দারুণ কিছু সিনিয়র, সমবয়সী আর জুনিয়র বন্ধুদের পেয়েছিলাম।
দুই-তিন বছরের মধ্যেই বুঝতে পেরেছিলাম কেবল অ্যাকাডেমিক বাঁধাধরা চারকোল বা অয়েল পেইন্টিং চর্চার বাইরেও শিল্পের এক বিশাল সীমানাহীন জগৎ আছে। এই বোধ থেকেই আমরা গড়ে তুলেছিলাম ‘সময় গ্রুপ’। নিজেদের প্রশ্ন করতে শিখলাম আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য ও আঞ্চলিক ইতিহাসের ভূমিকা ঠিক কতটা?
পরে চীনে উচ্চশিক্ষা নিই। সেখানে প্রাচীন এশীয় সভ্যতার ভিজ্যুয়াল ভাষার সঙ্গে পরিচয় ঘটে। তারপর ছাব্বিশ বছর জার্মানি তথা ইউরোপে জীবনযাপন ও শিল্পচর্চা। কিন্তু আমার ব্যক্তিত্বের একটা বৈশিষ্ট্য হলো কেবল একা একা স্টুডিওতে ছবি এঁকে যাওয়া আমাকে পূর্ণ তৃপ্তি দেয় না। সামাজিকভাবে একটা আন্দোলন বা সম্মিলিত প্রকাশভঙ্গি তৈরি করার ভেতরের যে আনন্দ, তা আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
সেই তাগিদ থেকেই ছাব্বিশ বছর পর বাংলাদেশে ফিরে এসে এমন একটা প্ল্যাটফর্ম খুঁজতে শুরু করি যেখানে আমার অর্জিত অভিজ্ঞতাকে তরুণদের মুখোমুখি দাঁড় করানো যাবে, তাদের নতুন কাজকে স্বাধীনভাবে উন্মোচন করা যাবে।
সেই চেতনারই ফসল আজকের কলাকেন্দ্র।