রবিঠাকুরের নায়িকারা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী নারী চরিত্র শতবর্ষ পেরিয়ে আজও সমসাময়িক, সমান আবেদনময়ী। কবিগুরুর প্রয়াণ দিবসে তার সৃষ্ট নন্দিত নারী চরিত্রগুলোতে অভিনয় করা কয়েকজন অভিনেত্রীর ভাবনায় উঠে এসেছে রবীন্দ্রসাহিত্যের চিরন্তন সৌন্দর্য ও তাদের অভিনয়ের অভিজ্ঞতা লিখেছেন তারেক আনন্দ

রবীন্দ্রপ্রেমী সাদিয়া ইসলাম মৌ

শৈশব থেকেই রবীন্দ্রনাথের রচনার অন্ধ ভক্ত নৃত্যশিল্পী ও অভিনেত্রী সাদিয়া ইসলাম মৌ। কাজের অবসরে কবিগুরুর গল্প-উপন্যাস পাঠই তার প্রধান সঙ্গী। রবীন্দ্রসাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগের কারণেই পর্দায় রবীন্দ্রনায়িকা হওয়ার সুযোগ এলে তা হাতছাড়া করেননি। অভিনয় করেছেন ‘মণিহারা’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘বদনাম’ ও ‘দর্পহরণ’-এর মতো জনপ্রিয় সব নাটকে। মৌ বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের মতো সর্বমুখী প্রতিভার অধিকারী বিশ্বসাহিত্যে বিরল। নারীদের মনস্তত্ত্ব ও ভালোবাসার গভীরতা তিনি যেভাবে উদঘাটন করেছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। রবীন্দ্রগল্পের নারীরা প্রতি পদে নিজেদের নতুনভাবে আবিষ্কার করে।’

জয়া আহসানের চ্যালেঞ্জিং ‘কমলা ও মেহেরজান’

যেকোনো জটিল চরিত্রে অনায়াসে মিশে যাওয়ার সহজাত ক্ষমতা রয়েছে জয়া আহসানের। কবিগুরুর ‘মুসলমানী’ গল্প অবলম্বনে নির্মিত টেলিছবি ‘না কমলা না মেহেরজান’-এ তার অভিনয় দর্শককে মুগ্ধ করেছিল। চ্যালেঞ্জিং ও ভিন্নধর্মী সেই চরিত্রে রূপদান প্রসঙ্গে তিনি সবসময়ই রবীন্দ্রসাহিত্যের প্রতি তার পরম শ্রদ্ধার কথা প্রকাশ করেছেন।

মুক্তির প্রতীকে একাধিক ‘নন্দিনী’

‘রক্তকরবী’র নন্দিনী কেবল একটি চরিত্র নয়, তা যেন শোষণের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদের নাম; শৃঙ্খল ভাঙার বার্তা। সময়কে অতিক্রম করা এই নান্দনিক চরিত্রে রূপ দান করে বিভিন্ন সময়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন অপি করিম, নূনা আফরোজ, নাদিয়া, শশী, মৌ ও তারিন। বিশেষ করে ছোটপর্দায় অপি করিমের নন্দিনী ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। রবীন্দ্রভাবনা নিয়ে অপি করিম জানান, ‘রবীন্দ্রনাথ কতটা আধুনিক ছিলেন, তা নন্দিনী চরিত্রের মনস্তত্ত্ব দেখলেই বোঝা যায়। তিনি সবসময় শোষিত মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। আমার অভিনয়জীবনে নন্দিনী চরিত্রটি অত্যন্ত বিশেষ একটি স্থানে অবস্থান করছে।’

চিরকালীন বাস্তবের খোঁজে নুসরাত ইমরোজ তিশা

রবীন্দ্রনাটকের প্রতি সবসময়ই বাড়তি টান অনুভব করেন অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা। অভিনয় করেছেন ‘রবিবার’ নাটকের বিভা, ‘মাল্যদান’-এর কুড়ানী, ‘রক্তকরবী’র নন্দিনী, ‘একরাত্রি’র সুরবালা এবং ‘শেষের কবিতা’র লাবণ্যর মতো চরিত্রে। তিশার মতে, ‘রবিঠাকুরের গল্পে যে জীবনবোধ ও মানবিকতার ছায়া রয়েছে, তা চিরন্তন বাস্তব। এক শতক আগের লেখা চরিত্রগুলো আজও আমাদের চারপাশের পরিচিত মানুষের মতো মনে হয়।’

অনুপ্রেরণায় মিম

‘রবিবার’ গল্প অবলম্বনে তৈরি ‘অপরিচিতা’ নাটকে অভিনয় করেছিলেন বিদ্যা সিনহা সাহা মিম। তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই কবিগুরুর লেখা তার অন্যতম প্রেরণা। মিমের ভাষ্য, ‘রবীন্দ্রগল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এদের সম্মোহনী ক্ষমতা। তার লেখা ‘চিত্রাঙ্গদা’ আমার অত্যন্ত প্রিয়। রবীন্দ্রচরিত্রগুলোর মধ্যে চিরচেনা মানুষের ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়।’

সাহিত্য নির্ভরতায় বিজরী

‘শেষ পুরস্কার’ নাটকে অভিনয় করে নজর কেড়েছিলেন বিজরী বরকতউল্লাহ। বিজরী বলেন, ‘কবিগুরু যেভাবে তার চরিত্রগুলোর অন্তর্নিহিত আবেগ প্রকাশ করেছেন, তা পর্দায় ফুটিয়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং কাজ। চরিত্রটির সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম হতে না পারলে এতে রূপদান করা সম্ভব নয়।’

মৌটুসী বিশ্বাস ও পূর্ণিমা

বড়পর্দায় রবীন্দ্রনাথের মনস্তাত্ত্বিক ছোটগল্প ‘শুভা’র নাম ভূমিকায় অভিনয় করে ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন চিত্রনায়িকা পূর্ণিমা। অন্য সূক্ষ্ম চরিত্র ‘মহামায়া’য় কাজ করেছিলেন মৌটুসী বিশ্বাস। নিজের অনুভূতি জানিয়ে মৌটুসী বলেন, ‘রবীন্দ্রনাটকের নায়িকা হতে পারাটা যেকোনো অভিনেত্রীর জন্যই বিশেষ প্রাপ্তি। মহামায়া চরিত্রে কাজ করে যে শিল্পীমনস্ক আত্মতৃপ্তি পেয়েছি, তা আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন।’

এ ছাড়া বিভিন্ন সময় ছোট ও বড় পর্দায় রবিঠাকুরের মানসী রূপ নিয়ে হাজির হয়ে দর্শকদের হৃদয় জয় করেছেন জাকিয়া বারী মম ও ঊর্মিলা শ্রাবন্তী করসহ আরও বেশ কিছু জনপ্রিয় তারকা। শতবর্ষ পেরিয়েও রবীন্দ্রসাহিত্যের এই নায়িকারা বাংলা সংস্কৃতি ও অভিনয়ের আঙিনায় আজও সমান প্রাণবন্ত।