দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার শঙ্কা

উজান থেকে আসা আশঙ্কাজনক পাহাড়ি ঢল এবং লাগাতার ভারী বৃষ্টির জোড়া প্রভাবে উত্তরের জনপদ নীলফামারীর তিস্তা নদীতে পানি প্রবাহে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করার পর বুধবার (৫ আগস্ট) বিকেলের দিক থেকে নামতে শুরু করেছে। তবে পানি কমার সাথে সাথেই নদী অববাহিকায় ভেসে উঠছে ধ্বংসের নতুন চিহ্ন। লোকালয় ও ফসলি জমিতে পানি কমলেও কূলঘেঁষা গ্রামগুলোতে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ নদীভাঙন, যা স্থানীয় অধিবাসীদের জীবনে তীব্র আতঙ্ক ডেকে এনেছে।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রের খবর অনুযায়ী, উজানের ঢলে নদীর পানি দ্রুত বেড়ে বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। এর ফলে নদী তীরবর্তী নিচু এলাকা ও চরাঞ্চল দ্রুত জলমগ্ন হয়ে পড়ে। তবে বিকেলের পর থেকে পানি প্রবাহ কিছুটা হ্রাস পায় এবং সন্ধ্যার দিকে তা বিপৎসীমার নিচে নেমে আসে। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আপাতত পানি প্রবাহ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও সার্বিক পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হচ্ছে।

পানি সরে যাওয়ার পরপরই নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনের ভয়াল রূপ প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। নদী রক্ষা বাঁধের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে গভীর ও বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও বাঁধের একাংশ নদীতে ধসে পড়ে স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি ডুবে যাওয়া সবজি, ভুট্টা ও বাদাম ক্ষেতের চারা পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছেন নীলফামারীর ডোমার ও জলঢাকা উপজেলার নদীঘেঁষা আটটি ইউনিয়নের বাসিন্দারা। ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করায় ভিটেমাটি হারানোর ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন শত শত পরিবার। স্থানীয়দের আকুল দাবি, দ্রুত টেকসই ও কার্যকর বাঁধ সংস্কারের ব্যবস্থা না করা হলে বসতবাড়ির পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক উপাসনালয় এবং ফসলি জমি চোখের সামনে নদীতে তলিয়ে যাবে।

এদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অববাহিকায় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের সসংবাদ দিয়েছে। পূর্বাভাষ অনুযায়ী রংপুর, সিলেট, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম বিভাগসহ তৎসংলগ্ন ভারতের উজানের ভূখণ্ডে আরও ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাবে উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রধান নদনদীর পানি নতুন করে বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারা, উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলের সোমেশ্বরী, ভোগাই ও কংস নদের পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর ফলে নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, শেরপুর ও নেত্রকোনার নদীসংলগ্ন নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হতে পারে। পাশাপাশি ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও চট্টগ্রাম বিভাগের প্রধান নদীগুলোর পানিও আগামী কয়েকদিন ক্রমাগত বাড়ার আভাস মিলেছে।

জাতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসও স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে না। আবহাওয়াবিদদের মতে, আগামী পাঁচ দিন দেশের আটটি বিভাগেই দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। দেশের কোথাও কোথাও বর্ষণের তীব্রতা বেড়ে অতি ভারী রূপ নিতে পারে, যা দেশের সার্বিক বন্যা ও ভাঙন পরিস্থিতিকে আরও দীর্ঘায়িত ও জটিল করে তুলতে পারে।