সরকারি নথিতে সবকিছুই যেন নিয়মমাফিক। ভোলা জেলায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে চলছে এক হাজারেরও বেশি মসজিদভিত্তিক শিক্ষা কেন্দ্র, নিবন্ধিত রয়েছে ৩৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী, নিয়মিত সম্মানিও পাচ্ছেন শিক্ষকরা। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। কোথাও শিক্ষার্থীহীন শ্রেণিকক্ষ, কোথাও তালাবদ্ধ কেন্দ্র, আবার কোথাও খুঁজেই পাওয়া যায়নি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব। অথচ এসব কেন্দ্রের শিক্ষকরা প্রতি মাসেই সরকারি অর্থ থেকে সম্মানি তুলছেন। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বজনদের নামে কেন্দ্র বরাদ্দ, কাগজে শিক্ষার্থী দেখিয়ে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে। ফলে নৈতিকতা ও ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে পরিচালিত প্রকল্পে বছরে প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে দেখা দিয়েছে গুরুতর প্রশ্ন।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভোলায় বর্তমানে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় রয়েছে ১ হাজার ১৫১টি কেন্দ্র। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক ৩৫১টি, সহজ কোরআন শিক্ষা ৭৮৮টি এবং বয়স্ক কোরআন শিক্ষা ১২টি। এসব কেন্দ্রে মোট শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে ৩৮ হাজার ৪১০ জন। কেন্দ্রগুলোর ১ হাজার ১৫১ জন শিক্ষক মাসে ৬ হাজার টাকা করে সম্মানি পান। এতে বছরে ব্যয় হয় প্রায় ৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এছাড়া জেলার ১৪টি দারুল আরকাম ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের পেছনে আরও প্রায় ৬৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়। দুই প্রকল্প মিলিয়ে সরকারি ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৯ কোটি টাকা।
গত ১৫ থেকে ৩১ জুলাই ভোলা সদর, দৌলতখান ও চরফ্যাশন উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের অন্তত ২০টি কেন্দ্র সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সরকারি হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতার বিস্তর অমিল। হাতে গোনা কয়েকটি সহজ কোরআন শিক্ষা কেন্দ্র ছাড়া অধিকাংশ প্রাক-প্রাথমিক ও বয়স্ক কোরআন শিক্ষা কেন্দ্রে কোনো পাঠদান দেখা যায়নি। কোথাও তালা ঝুলছে, কোথাও শিক্ষক থাকলেও শিক্ষার্থী নেই, আবার কয়েকটি কেন্দ্র নির্ধারিত ঠিকানায় খুঁজেই পাওয়া যায়নি।
দৌলতখান উপজেলার চরপাতা দারুল আরকাম ইবতেদায়ি মাদরাসায় গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষক-কর্মচারীরা আড্ডায় সময় কাটাচ্ছেন। তিনজন শিক্ষক ও একজন কর্মচারী উপস্থিত থাকলেও একজন শিক্ষার্থীও ছিল না। অথচ উপস্থিতি খাতায় প্রথম শ্রেণিতে ২২ এবং দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১৮ শিক্ষার্থীর নাম রয়েছে।
স্থানীয় দোকানি আলী আহাম্মদ বলেন, শিক্ষকদের মাঝে মাঝে আসতে দেখি, কিন্তু ছাত্রছাত্রী দেখি না। পাশের বাসিন্দা মো. মনির জানান, এলাকাবাসীর কাছে এটি মাদরাসার চেয়ে ‘কাচারি’ হিসেবেই বেশি পরিচিত।
সদর উপজেলার শিবপুর দারুল আরকাম ইবতেদায়ি মাদরাসায় প্রথম দিন গিয়ে কেন্দ্রটি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। পরে আবার গিয়ে দেখা যায়, একজন শিক্ষক ও মাত্র তিনজন শিশু রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, নিয়মিত পাঠদান হয় না। যদিও প্রধান শিক্ষক ফাতেমা আক্তার মুক্তা বর্ষাকালকে শিক্ষার্থী কম থাকার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বাপ্তা ইউনিয়নের হাজি ইয়াছিন মাতাব্বর বাড়ির প্রাক-প্রাথমিক কেন্দ্রের ঠিকানায় গিয়ে কোনো কেন্দ্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বাড়ির প্রবীণ বাসিন্দা নাসির উদ্দিন জানান, সেখানে কখনো এমন কোনো শিক্ষা কেন্দ্র পরিচালিত হয়নি। পরে জানা যায়, অডিটের সময় অন্য একটি জরাজীর্ণ ঘর দেখিয়ে কেন্দ্র পরিচালনার দাবি করা হয়।
একইভাবে শিবপুর গুচ্ছগ্রামের কেন্দ্রেও কোনো স্থায়ী শ্রেণিকক্ষ পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা জানান, শিক্ষক মাঝে মধ্যে খোলা জায়গায় পলিথিন বিছিয়ে কয়েকজন শিশুকে নিয়ে ক্লাস করেন। নির্ধারিত দিনে অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে শিক্ষক ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়েছেন।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্ত্রী ও স্বজনদের নামে একাধিক কেন্দ্র বরাদ্দ রয়েছে। কোথাও ব্যক্তিগত মাদরাসার শিক্ষার্থীদের সরকারি প্রকল্পের শিক্ষার্থী হিসেবে দেখানো হচ্ছে, আবার কোথাও নিজস্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেই রিসোর্স সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৩৮ হাজার ৪১০ শিক্ষার্থী থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ প্রাক-প্রাথমিক, বয়স্ক কোরআন শিক্ষা কেন্দ্র এবং দারুল আরকাম ইবতেদায়ি মাদরাসায় বাস্তবে সেই উপস্থিতির খুব সামান্য অংশই দেখা গেছে। বিশেষ করে জেলার ১৪টি দারুল আরকাম ইবতেদায়ি মাদরাসার মধ্যে অধিকাংশেই শিক্ষার্থী উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত কম বা শূন্যের কাছাকাছি।
এ বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ভোলা জেলা উপপরিচালক এম. মাকসুদুর রহমান বলেন, প্রাক-প্রাথমিক কেন্দ্রগুলোর শিক্ষার্থী সংকট নিয়ে তারাও বিব্রত। প্রতিটি উপজেলায় ফিল্ড সুপারভাইজার এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে কেয়ারটেকারদের মাধ্যমে কেন্দ্রগুলো তদারকি করা হয়। অনিয়মিত কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করে সচল করার চেষ্টা করা হবে। প্রয়োজন হলে নীতিমালা অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের অর্থে পরিচালিত এই প্রকল্পের প্রকৃত চিত্র উদঘাটনে স্বাধীন তদন্ত, বাস্তবভিত্তিক উপস্থিতি যাচাই এবং নিয়মিত তদারকি জরুরি। অন্যথায় কোটি কোটি টাকার এই শিক্ষা প্রকল্প কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, আর প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য অর্জন হবে না।