তালেবানের বন্দিদশা থেকে পালিয়ে আট হাজার মাইল দূরে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে যখন তারা পা রাখলেন, তখন পায়ের নিচের ঘাস কেবল একটি প্রান্তর নয়; বরং এটি ছিল বছরের পর বছর ধরে কেড়ে নেওয়া অধিকার পুনরুদ্ধারের এক ঐতিহাসিক মঞ্চ। দেশের মাটিতে নিষিদ্ধ হওয়ার পর শরণার্থী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া আফগান নারী ফুটবলাররা এবার ফিরলেন মাঠের ফুটবলে। হার-জিত ছাপিয়ে তাদের এই প্রত্যাবর্তন প্রমাণ করেছে, সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে টিকে থাকার নামই ফুটবল।
২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর আফগানিস্তানে নারীদের ওপর নেমে আসে খড়্গ। মাধ্যমিক শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা এবং যেকোনো ধরনের সংগঠিত খেলাধুলা থেকে নিষিদ্ধ করা হয় নারীদের। ২০০৭ সালে গঠিত হওয়া আফগান জাতীয় নারী ফুটবল দলের অস্তিত্ব তখন সংকটে পড়ে। বাধ্য হয়ে প্রাণ বাঁচাতে এবং নিজেদের স্বপ্ন বাঁচাতে দেশ ছাড়েন ফুটবলাররা।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি এক বিশেষ প্রতিবেদনের সূত্রমতে, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও পর্তুগালের মতো দেশে শরণার্থী হিসেবে নতুন জীবন শুরু করা এসব মেয়েরা দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ফিফার স্বীকৃতি আদায় করে নেন। এর ফলে আফগান ফুটবল ফেডারেশন বা তালেবানের অনুমোদন ছাড়াই তারা এখন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার ঐতিহাসিক অধিকার পেয়েছেন।
নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে কুক দ্বীপপুঞ্জের বিপক্ষে দুটি প্রথমাংশ বা প্রীতি ম্যাচ খেলার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ পাঁচ বছর পর একত্র হলো এই দল। অকল্যান্ডের বৃষ্টির দিনে মাঠে নামার আগের অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে মিডফিল্ডার ফাতিমা হাইদারি সতীর্থদের উদ্দীপ্ত করে বলেন, ‘সবসময় শক্তিশালী থেকো, কারণ আমরা আফগান নারীদের প্রতিনিধিত্ব করছি।’
দলের এই যাত্রাপথটা মোটেও সহজ ছিল না। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ২৩ বছর বয়সি মানোজ নুরি কাবুলের রাস্তায় ছেলেদের সঙ্গে লুকিয়ে ফুটবল খেলে বড় হয়েছেন। বড় ভাইয়ের কঠোর বিরোধিতা ও পরিবারের আপত্তির মুখেও লুকিয়ে খেলেছেন বিভিন্ন ক্লাবে। এমনকি বড় ভাই যেন টিভি নিউজে তাকে চিনতে না পারেন, সেজন্য লোডশেডিং করার মতো মরিয়া চেষ্টা করেছিলেন তিনি। দেশ ছাড়ার সময় নিজের কষ্টার্জিত সব মেডেল ও ট্রফি বাগানের মাটিতে লুকিয়ে রেখে আসেন নুরি। সেই দিনের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘একদিন আমি দেশে ফিরে সেগুলো আবার খুঁড়ে বের করব।’
ফুটবলকে নিজের জীবনের লাইফলাইন হিসেবে দেখছেন আরেক সদস্য মুরসাল সাদাত। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ২৪ বছর বয়সি এই ফুটবলার বলেন, ‘আমি যদি ফুটবলার না হতাম, তবে আজ আফগানিস্তানের কোটি কোটি মেয়ের মতো চার দেয়ালের মাঝে আটকে থাকতাম, যাদের পড়াশোনা বা নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার কোনো অধিকার নেই।’
যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী ডিফেন্ডার নাজমা আরেফি তার সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে জানান, কাবুলের ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপদাহে নারীদের জন্য বরাদ্দ করা সবচেয়ে বাজে সময়েও তারা অনুশীলন চালিয়ে গেছেন। নতুন দেশে এসে স্বাধীনতা পেলেও দেশের মাটিতে ফেলে আসা বোনদের জন্য তার বুকভাঙ্গা কষ্ট হয়। তিনি বলেন, ‘লক্ষ লক্ষ মেয়ের পড়াশোনা বা স্বপ্ন পূরণের সুযোগ নেই। আমি মনে করি, আমার পাওয়া প্রতিটি সুযোগের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা উচিত।’
ফিফার এই স্বীকৃতি এবং নির্বাসিত জীবনেও মাঠে ফিরে আসা নিয়ে তালেবান ক্রীড়া দপ্তরে যোগাযোগ করা হলেও তারা এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে মাঠের লড়াইয়ে কুক দ্বীপপুঞ্জের কাছে প্রীতি ম্যাচ দুটিতে যথাক্রমে ১-০ ও ৩-০ গোলে হেরেছে আফগান দল। স্কোরবোর্ডে হার লেখা থাকলেও, এই পরাজয় তাদের কাছে কোনো হার নয়। দেশহীন, পরিবারছাড়া এবং অন্তহীন অনিশ্চয়তার মাঝেও আফগানিস্তানের নারী ফুটবলারদের এই ঘুরে দাঁড়ানো প্রমাণ করে, শত বাধা পেরিয়ে তারা হারিয়ে যাওয়ার পাত্রী নন।