শঙ্খশালিকের পছন্দ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ভোরের নরম আলো। ঘাসের ফাঁকে ব্যস্ত এক ছোট্ট পাখি। ঠোঁট দিয়ে একটু একটু করে খাবার কুড়িয়ে নিচ্ছে। প্রথম দেখায় পাখিটিকে সাধারণ শালিক মনে হলেও গভীরভাবে তাকালেই ধরা পড়ে তার ভিন্নতা। 

এ যেন বিরল এক অতিথি। ভাতশালিক, ঝুঁটিশালিক, গোশালিক, কাঠশালিকদের বাংলাদেশের যেকোনো জায়গায় দেখা গেলেও এই পাখিটির দেখা মেলে না সহজেই। পাখিটির নাম বামুনশালিক বা শঙ্খশালিক।

দেশের অনেক জায়গা থেকে বামুনশালিক প্রায় হারিয়ে গেলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসে সারা বছরই এদের বিচরণ চোখে পড়ে। গবেষকদের মতে, নিরাপদ আবাস, পর্যাপ্ত খাদ্য এবং অনুকূল পরিবেশের কারণে ক্যাম্পাসটি পাখিটির অন্যতম নির্ভরযোগ্য আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।

খোলামেলা বৃক্ষবাগান, তৃণভূমি, ভিজে মাঠ, চাষের জমি ও ঝোপঝাড় বামুনশালিকের পছন্দের আবাসস্থল। অন্য শালিকের তুলনায় এরা কম দলবদ্ধ, তবে পর্যাপ্ত খাবার পেলে ঝাঁক বেঁধে আসে। মাটিতে পোকামাকড় খুঁজে বেড়ালেও গাছে থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ওড়ার গতি অন্য শালিকদের চেয়ে বেশি। অন্য পাখির ডাক অনুকরণেও পারদর্শী। বাংলাদেশে রাজশাহী বিভাগের বৃক্ষবহুল এলাকাতেই এ পাখির উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

আকারে মাঝারি এই পাখিটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২১ সেন্টিমিটার। স্ত্রী ও পুরুষ বামুনশালিক দেখতে প্রায় একই রকম। এর মাথা কালো এবং ঘাড়ের পেছন পর্যন্ত বিস্তৃত কালো ঝুঁটি বা চূড়া প্রাপ্তবয়স্ক পাখির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

শরীরের ওপরের অংশ ধূসর, গলা ও লেজে থাকে পাটকিলে আভা। লেজের নিচে দেখা যায় সাদা ছোপ। ঠোঁট বেশ শক্ত, গোড়ায় নীলচে, মাঝখানে সবুজাভ এবং ডগা হলদেটে। চোখের নিচে নীল-হলুদ রঙের অনাবৃত চামড়া ও হলুদ পা পাখিটিকে সহজেই আলাদা করে চেনায়। তবে অল্পবয়সী বামুনশালিকের মাথায় ঝুঁটি থাকে না এবং তাদের দেহের নিচের অংশ তুলনামূলক ফ্যাকাশে কমলা রঙের হয়ে থাকে।

বামুনশালিক সাধারণত পুরোনো গাছের কোটর, দেয়ালের ফাঁকা অংশ কিংবা পরিত্যক্ত গহ্বরে বাসা বাঁধে। সুযোগ পেলে মানুষের ঝুলিয়ে দেওয়া কাঠের বাক্স বা মাটির হাঁড়িকেও বাসা হিসেবে ব্যবহার করে।

শুকনো ঘাস, পাতা ও পালক দিয়ে বাসা তৈরি করে এ পাখি। সাধারণত ৩ থেকে ৪টি নীলচে রঙের ডিম পাড়ে।প্রজনন মৌসুমে ছেলে পাখি মাথার ঝুঁটি খাড়া করে গান গায়। খাবার হিসেবে ফল ও পোকামাকড় বেশি পছন্দ। পাকা ফল, বিশেষত জাম বেশ প্রিয়। ফুলের মধুও খায়।

রাবিতে এ পাখিকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইলে রাবির বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ও আলোকচিত্রী ফাহিম মুন্তাসির রাফিন বলেন, "২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম বামুন শালিকের দেখা পাই।

তখনই ক্যামেরা নিয়ে ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফি শুরু করেছি। প্রথম দিনেই পশ্চিমপাড়ায়, সিরাজী ভবনের পেছনের ঘাসের মধ্যে খাবার খুঁজতে দেখি। সেখান থেকেই এ প্রজাতির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়।"

ক্যাম্পাসে এ পাখির বিচরণ এলাকা সম্পর্কে তিনি বলেন, "ক্যাম্পাসের পশ্চিমপাড়া, সিলসিলা এলাকার আশপাশ, শহীদ মিনার, হেলিপ্যাড, জুবেরি এলাকা, মেইন গেটসহ প্রায় পুরো ক্যাম্পাসেই এদের বিচরণ রয়েছে। তবে ডাস্টবিনের আশপাশে খাবার বেশি পাওয়ায় ওই এলাকাগুলোতে তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।"

সংরক্ষণের বিষয়ে তিনি জানান, প্রজনন মৌসুমে পাখিদের বিরক্ত না করা, বাচ্চা না ধরা এবং ক্ষতির চেষ্টা হলে প্রতিবাদ করা শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব। একই সঙ্গে বাইরে থেকে পাখির বাচ্চা চুরির ঘটনা ঠেকাতে প্রশাসনকে নিরাপত্তাকর্মীদের আরও সতর্ক থাকার ওপর জোর দেন তিনি।

পাখি গবেষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিনুজ্জামান মো. সালেহ রেজা বলেন, আমাদের বসবাসের জন্য যেমন কিছু মৌলিক চাহিদা আছে তেমনি পাখিদেরও আছে।

খাদ্য, আবাসস্থল, নিরাপত্তা ও অনুকূল পরিবেশ একটি পাখির টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। এগুলো সবই যদি কোনো জায়গায় থাকে, তাহলে তারা সেখানেই থাকবে স্বাভাবিক। এই ক্যাম্পাসে বামুনশালিকের বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু আছে বলেই তারা এখানে অবস্থান করছে।

প্রজননের বিষয়ে তিনি বলেন, একটি পাখি সাধারণত যে জায়গায় নিরাপদে বসবাস করে, সেখানেই প্রজনন করে। বামুনশালিকের প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ এখানে রয়েছে বলেই তারা এ ক্যাম্পাসে প্রজনন করে। সাধারণত মার্চ থেকে জুন-জুলাই পর্যন্ত এ পাখির প্রজননকাল।

তিনি আরও বলেন, দেশের সব জায়গায় এ পাখি দেখা যায় না, কারণ একেক অঞ্চলে একেক প্রজাতির পাখির আধিক্য থাকে। যেমন সুন্দরবন বা চট্টগ্রামে কিছু পাখি বেশি দেখা যায়, যেগুলো এখানে পাওয়া যায় না। একইভাবে বামুনশালিকের আধিক্য যেমন এখানে বেশি অন্য কোথাও তা নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিশেষ কোনো উদ্যোগের প্রয়োজন নেই। শুধু তাদের আবাসস্থল যেন নষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ, পরিবেশ ও আবাসস্থল অনুকূল না থাকলে তারা স্বাভাবিকভাবেই অন্য জায়গায় চলে যাবে।