সরকারিভাবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালনের আহ্বান

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস সরকারিভাবে পালনের আহ্বান জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী ও বিশিষ্টজনেরা। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘আদিবাসী জনগণ: জীবন, ভূমি অধিকার ও সংস্কৃতির সম্মান’ শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনারে এ দাবি জানানো হয়। 

অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামসহ ১৭টি অধিকারভিত্তিক সংস্থা যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে। এতে সম্মানীয় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য আন্না মিনজ ও অ্যাডভোকেট মাধবী মারমা। সেমিনারে বক্তারা আদিবাসী জনগণের ভূমি অধিকার রক্ষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেন।

সেমিনারে মানবাধিকার কর্মী ইলিরা দেওয়ান মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সেমিনারে প্যানেল আলোচক হিসেবে আলোচনায় অংশ নেন- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, গবেষক ও নৃ- বিজ্ঞানী ড. ঈশিতা দস্তিদার, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভানেত্ৰী ডা: ফওজিয়া মোসলেম। এছাড়াও সমতল ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নেতা-নেত্রী এবং অন্যান্য সুশীল সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। 

স্বাগত বক্তব্যে এএলআরডি এর নির্বাহী পরিচালক জনাব শামসুল হুদা বলেন, ‘বর্তমান সরকার আদিবাসীদের উন্নয়নে ইতিবাচক কথা বলে যা আমাদের আশান্বিত করে তবে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই আমাদের আশাকে স্বার্থক করতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘের স্থায়ী ফোরামে সরকারীভাবে প্রতিবছর বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করে, কিন্তু দেশে সরকার আদিবাসী দিবস উদযাপন করেনা যা হতাশাজনক। তিনি সেমিনারে মানবাধিকারকর্মী ও বিশিষ্টজনেরা সরকারিভাবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালনের আহ্বান জানান। 

মূল প্রবন্ধে মানবাধিকারকর্মী ইলিরা দেওয়ান সরকারের কাছে আদিাবসীদের উন্নয়নে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো - ১. সংবিধানের ২৩ক ধারায় বর্ণিত 'উপজাতি, নৃ- গোষ্ঠী' শব্দগুলো বাদ দিয়ে তার পরিবর্তে ' আদিবাসী' শব্দটি অন্তর্ভূক্ত করতে হবে;; ২. পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনকে কার্যকর করতে অবিলম্বে উদ্যোগ নেয়া এবং এর সভা নিয়মিত সম্পন্ন করে কমিশনকে গতিশীল করা; ৩. সমতলের আদিবাসীদের জন্য স্বতন্ত্র ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে; ৪. আদিবাসীদের অধিকার দেখভালের জন্য জাতীয়ভাবে একটি অধিদপ্তর গঠন করা যেটি পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিতের জন্য গঠিত হবে এবং এই অধিদপ্তরটি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অন্তর্ভূক্ত থেকে কাজ যাতে করতে পারে তা নিশ্চিত করা; ৫. আদিবাসী এলাকায় পর্যটন শিল্প প্রসারিত করার আগে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনধারা যাতে ব্যাহত না হয় এবং তাদের সংস্কৃতি, কৃষ্টির প্রতি সম্মান রেখে ভ্রমণের জন্য সরকারীভাবে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা; 

এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সমতলের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে এ নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক করা, সরকার ঘোষিত নারী স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় আদিবাসীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ, একই সঙ্গে ধাত্রীবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত আদিবাসী নারীদের তালিকা প্রণয়ন করে সরকারি ব্যয়ে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ সহ পার্বত্য শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম এলাকায় চিনিকলের নামে অধিগ্রহণ করা আদিবাসী ও বাঙালিদের ন্যায্য ভূমি প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে সরকারকে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতেও আহ্বান জানানো হয়। 

সেমিনারে প্যানেল আলোচকদের মধ্যে গবেষক ও নৃবিজ্ঞানী ঈশিতা দস্তিতার আদিবাসীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে আদিবাসীদের লোকজ জ্ঞান ও চিকিৎসাসেবার স্বীকৃতিসহ আদীবাসী ধাত্রি, সেবিকাদের আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা বিষয়ে প্রশিক্ষণসহ দুর্গম অঞ্চলে আদিবাসীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে বিশেষ ব্যবস্থাগ্রহণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

আদবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, ‘আমাদের দেশের বৈচিত্রের যে সংস্কৃতি তাকে ধরে রেখে এগিয়ে যেতে হবে। বর্তমান সরকার যে রংধনু জাতির কথা বলছে, যে অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে যা আদিবাসীদের জন্য সম্ভাবনার, নতুন পথে চলার প্রেরণা দিচ্ছে। কিন্তু তাকে বাস্তবে রূপ না দিলে আবার আমরা পিছিয়ে যাব। যে বৈষম্য নিরসনের চেতনার কথা বলা হচ্ছে আদিবাসীদের বাদ রেখে তা সম্ভব নয়৷’

মাননীয় সংসদ সদস্য আন্না মিনজ এমপি বলেন, আদিবাসীদের না পাওয়ার বঞ্চনা যেমন সর্বস্বীকৃত কিন্তু পাওয়ার বিষয়টিকেও আমাদের স্বীকার করতে হবে। আদিবাসীদের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো সামানের দিনগুলোতে কীভাবে আমরা আরো এগিয়ে যেতে পারি সে দিকটির প্রতি বেশি জোর দেয়া। তিনি বলেন বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার থেকে শুরু করে অন্যান্য ডকুমেন্টে আদিবাসীদের উন্নয়নের বিষয়টি যুক্ত করা অন্যতম স্বীকৃতি। এছাড়াও তিনি বলেন জাতীয় বাজেট থেকে শুরু করে অন্যান্য কর্মসূচীতে সরকারের উদ্যোগগুলো ইতিবাচক যা আদিবাসীদের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে৷

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আদিবাসীদের কোন বিতর্ক ব্যাতীত সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া উচিৎ। তিনি বলেন, আদিবাসীদের তাদের অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে যাতে কারে স্বার্থান্বেষীগোষ্ঠী তাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে তাদের ন্যায্য দাবীকে দুর্বল করে না দেয়। তিনি বলেন, আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমির মালিকানার আইনগত স্বীকৃতি নেই, এটিকে স্বীকৃতি দিতে হবে। তিনি সংসদীয় আদিবাসী বিষয়ক ককাস গঠন এবং এটিকে সক্রিয়ভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে সরকারকে আহ্বান জানান। 

অন্যান্য আলোচকরা আদিবাসীদের এলাকায় ইকো ট্যুরিজম থেকে শুরু করে যে কোন উন্নয়নকাজের ক্ষেত্রে আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবী জানান। তারা বলেন পাবর্ত্য অঞ্চলে বন্যা খুবই অপরিচিত ছিল। কিন্তু অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে এ বছরে পার্বত্যঅঞ্চলের বেশিরভাগ এলাকায় বন্যায় আক্রান্ত হয়। ১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তির অধীনে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে ২৭ হাজারের বেশি ভূমি বিরোধের আবেদন থাকলেও স্বার্থান্বেষী মহলের বিরোধিতায় কখনও কমিশনের সভা হতে পারছেনা। আলোচকবৃন্দ জরুরিভিত্তিতে ভূমি কমিশনের সক্রিয়তা নিশ্চিত করার আহবান জানান। এছাড়া ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাসত্ত্ব আইন এর ৯৭ ধারা বাস্তবায়নে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) যাতে আদিবাসীদের ভূমি বিষয়ে স্বতপ্রণোদিত হয় কাজ করেন সে বিষয়ে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।