বিনা তোষাপাট-০১

একসময় ‘সোনালি আঁশ’ নামে পরিচিত পাট ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কৃত্রিম আঁশের ব্যাপক ব্যবহার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নানা প্রতিকূলতায় সেই ঐতিহ্য অনেকটাই মøান হয়ে এলেও পরিবেশবান্ধব পাটের আঁশের প্রতি বিশ্ববাজারের আগ্রহ আবার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে উন্নত জাত ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদের মাধ্যমে পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষকের লাভ বাড়াতে কাজ করছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)। তাদের উদ্ভাবিত ‘বিনা তোষাপাট-০১’ এখন কৃষকের কাছে সম্ভাবনাময় একটি জাত হিসেবে আলোচনায় এসেছে।

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার ফুকরা গ্রামে বিনা-গোপালগঞ্জ উপকেন্দ্র থেকে দেওয়া ‘বিনা তোষাপাট-০১’-এর দুটি প্রদর্শনী প্লটে গিয়ে চোখে পড়ে সারিবদ্ধ, সবল ও সমান উচ্চতার পাটগাছ। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য এ জাতের পাটগাছের বৃদ্ধি ও ফলন দেখে তাদের আগ্রহ বেড়েছে। অনেকেই আগামী মৌসুমে এ জাতের চাষ করতে চান।

এ জাতের পাটের উৎপাদন প্রযুক্তি ও সম্ভাবনা তুলে ধরতে সম্প্রতি গোপালগঞ্জে একটি মাঠ দিবসের আয়োজন করে বিনা-গোপালগঞ্জ উপকেন্দ্র। অনুষ্ঠানে কৃষকদের হাতে-কলমে বিভিন্ন প্রযুক্তি দেখানো হয় এবং বাণিজ্যিকভাবে এ জাতের চাষাবাদের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

মাঠ দিবসে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. শহিদুল হক ভূঞা। তিনি বলেন, দেশে পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকের লাভজনক চাষাবাদ নিশ্চিত করতে বিনা ধারাবাহিকভাবে নতুন নতুন উচ্চ ফলনশীল ও উন্নত জাত উদ্ভাবন করছে। ‘বিনা তোষাপাট-০১’ সেই প্রচেষ্টারই একটি সফল উদাহরণ। গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারলে পাটের উৎপাদন যেমন বাড়বে, তেমনি পাটের গুণগত মানও বৃদ্ধি পাবে।

বিনা-গোপালগঞ্জ উপকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. মো. হারুন অর রশিদ জানান, ‘বিনা তোষাপাট-০১’ এমন একটি উন্নত জাত, যা তুলনামূলক কম সময়ে পরিপক্ব হয় এবং অধিক ফলন দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। সঠিক পরিচর্যা, সময়মতো বপন এবং আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি অনুসরণ করলে এর থেকে উন্নতমানের আঁশ উৎপাদন সম্ভব।

এ ছাড়া এর জীবনকাল কম হওয়ায় কৃষকরা ২ ফসলি জমিকে সহজে ৩ ফসলি জমিতে রূপান্তর করতে পারবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ফরিদপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ খায়ের উদ্দিন মোল্লার সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিনার পরিচালক (প্রশাসন ও সাপোর্ট সার্ভিস) ড. মো. লুৎফর রহমান মোল্লা, বিনার গবেষণা কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মাহবুবুল আলম তরফদার এবং বিনা-গোপালগঞ্জ উপকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. মো. হারুন অর রশিদসহ কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা, কৃষিবিদ এবং বিভিন্ন এলাকার কৃষক-কৃষাণীরা এই মাঠ দিবসে অংশ নেন।

মাঠ দিবসে অংশ নেওয়া কৃষকদের অনেকেই জানান, পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা ‘বিনা তোষাপাট-০১’-এর গাছের বৃদ্ধি এবং ফলন তাদের প্রত্যাশা জাগিয়েছে। প্রয়োজনীয় বীজ সহজলভ্য হলে এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা অব্যাহত থাকলে এ জাতের আবাদ আরও বাড়বে বলে তারা মনে করেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. মামুনুর রহমান জানান, জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জমির সীমাবদ্ধতার কারণে এখন বিনা তোষাপাট-০১ জাতের খুবই প্রয়োজন, যা কম সময়ে ভালো ফলন দেয় এবং কৃষকের উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লাভের সুযোগ তৈরি করছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক আঁশের চাহিদা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি আরও জানান, দেশে উদ্ভাবিত পাটের এ জাত বর্তমানে বাংলাদেশের বাজার দখল করা ভারতীয় জাতের চেয়ে উন্নতমানের। প্রতি বিঘা জমিতে তিন থেকে চার মণ বেশি ফলন পাওয়া সম্ভব। ভারতীয় জাতের তুলনায় এ পাটের জীবনকালও দশ দিন কম।

বিনার কর্মকর্তারা জানান, ‘বিনা তোষাপাট-০১’-এর বীজ পাওয়াটাও সহজ হবে। কৃষকরাই পাট উৎপাদন করে বীজ সংগ্রহ করতে পারবেন। আর এটা করা গেলে সারা দেশের কৃষকদের মধ্যে পাট বীজ সহজে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

কৃষকদের মতে, শুধু নতুন জাত উদ্ভাবন করলেই হবে না। কৃষকের হাতে সময়মতো মানসম্মত বীজ পৌঁছে দেওয়া, মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ বাড়ানো, সহজ শর্তে কৃষি উপকরণ নিশ্চিত করা এবং উৎপাদিত পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার ওপরও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ‘বিনা তোষাপাট-০১’ শুধু একটি নতুন জাত হিসেবেই নয়, দেশের পাট খাতে উৎপাদনশীলতা ও কৃষকের আয় বৃদ্ধির অন্যতম সহায়ক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একসময় যে পাট বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিচয় বহন করত, আধুনিক গবেষণা ও উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে সেই সোনালি আঁশকে আবারও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে ‘বিনা তোষাপাট-০১’। দ্রুত দেশের কৃষকের মাঠে ছড়িয়ে এ জাতের পাটের চাষাবাদ ছড়িয়ে দিতে পারলে পাট চাষে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলেও প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।