দেশের সর্বপ্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের সবকটি বিমানবন্দরকে যাত্রীবান্ধব, নিরাপদ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে নজিরবিহীন কড়াকড়ির উদ্যোগ নিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। এখন থেকে বিমানবন্দরে যেকোনো ধরনের অনিয়ম, দালালদের দৌরাত্ম্য, যাত্রীদের হয়রানি বা পেশাদার ভাবমূর্তি ক্ষুণœকারী অপকর্মের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত হিসেবে পরিচালিত হবে ‘মোবাইল কোর্ট’ (ভ্রাম্যমাণ আদালত)। একই সঙ্গে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘পাসপোর্ট ও টিকিট মিললেই শাহজালালের গোলচত্বর পার’ নীতি কার্যকরী করার পাশাপাশি সবার জন্য সমান নিরাপত্তা প্রটোকল চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া শাহজালালে কর্মরত বিমানবাহিনীর ১৪৫০ জন সদস্যের মধ্যে ৭০০ জনকে কমানোর বিষয়ে বলা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বেবিচক সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে গঠিত বিশেষ কমিটির প্রথম সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। সভায় দেশের প্রতিটি বিমানবন্দরকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর একগুচ্ছ মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে শাহজালালে কর্মরত এভসেকের সঙ্গে এপিবিএনসহ অন্য সংস্থাগুলোর সমন্বয় না থাকার বিষয়টিও বৈঠকে বিশদ আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া বৈঠকে কারপার্কিং এলাকায় নজরদারির পাশাাপাশি সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে বলা হয়েছে।
শাহজালালে নানা অব্যবস্থাপনা নিয়ে গত বুধবার ‘বিমানবন্দরে এত জঞ্জাল’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনের পর বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১৭ সদস্যর একটি কমিটি গঠন করা হয়। গতকালকের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম। সে সময় উপস্থিত ছিলেন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদ্জ্জুমান মিল্লাত, বেবিচক চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, পুলিশ, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, এনএসআই, ডিজিএফআই, এসবি, সিটিটিসি, অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটিসহ বিভিন্ন সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধি, বেবিচকের সদস্যসহ (নিরাপত্তা) অন্য কর্মকর্তারা।
কমছে বিমানবাহিনীর সদস্য : নাম প্রকাশ না করে বৈঠকে উপস্থিত বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈঠকে বিমানবন্দরের সার্বিক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এভসেকের সঙ্গে এপিবিএনসহ অন্যান্য সংস্থার সমন্বয়হীনতার বিষয়টিও সামনে আসে। বিমানবন্দরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পরে সিদ্ধান্ত হয় শাহজালালে কর্মরত বিমানবাহিনী ১৪৫০ জন সদস্যের মধ্যে ৭০০ সদস্য কমানো হবে। সব সংস্থাকে মিলেমিশে কাজ করতে বলা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এবিবিএনসহ অন্যান্য সংস্থার সদস্যরা বিমানবন্দর থেকে চলে গেলে তখন অ্যাক্ট টু সিভিল পাওয়ারের আওতায় বিমানবাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয় শাহজালালে। নির্বাচিত সরকার আসার পর পর্যায়ক্রমে বিমানবাহিনীর সদস্য সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত হয়।
অপকর্ম করলেই তাৎক্ষণিক মোবাইল কোর্ট : বিমানবন্দরের সার্বিক পরিবেশকে শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখতে কোনো ধরনের আপস না করার কঠোর বার্তা দিয়েছে বেবিচক। কমিটির প্রথম সভাতেই সিদ্ধান্ত হয়, যাত্রী হয়রানি, অবৈধ ট্রলি বাণিজ্য, দালালচক্রের সক্রিয়তা এবং যেকোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বজায় রাখা হবে। সভায় উপস্থিত ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিমানবন্দরে অতীতে ছোটখাটো অনিয়মের ক্ষেত্রে কেবল কারণ দর্শানো বা সতর্কবার্তাতেই সীমাবদ্ধ রাখা হতো, যার সুযোগে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এখন থেকে ঘটনার তীব্রতা বুঝে তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে আইনগত শাস্তি বা জরিমানা নিশ্চিত করা হবে। ফলে বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থা, চুক্তিবদ্ধ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী এবং বহিরাগত কোনো চক্র যাত্রী সাধারণকে জিম্মি বা বিভ্রান্ত করার সুযোগ পাবে না।’
সবার জন্য নিরাপত্তা প্রটোকল সমান : বিমানবন্দরের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বিশেষ সুবিধা দান বা শিথিলতা প্রদর্শন করা হবে না বলে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বিশেষ কমিটির সভায়। ভিআইপি, সিআইপি বা সাধারণ যাত্রীদের পাসপোর্ট কন্ট্রোল এবং সিকিউরিটি তল্লাশির ক্ষেত্রে সবার জন্যই প্রটোকল হবে এক ও অভিন্ন। সভায় জোর দিয়ে বলা হয়, আইকাওর মানদণ্ড মেনে চলতে হলে নিরাপত্তার জায়গায় কোনো শিথিলতা বা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। মেটাল ডিটেক্টর, স্ক্যানার ও আর্চওয়ে দিয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে সাধারণ যাত্রী থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি সবাইকে একই নিরাপত্তা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
তথ্য বিনিময়ের নির্দেশনা : বেবিচক সূত্র জানায়, সভায় দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও কার্যকরী, সমন্বিত ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডসম্মত করতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বয় জোরদার, জাতীয় বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকরীকরণ, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ, বিমানবন্দরে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি সংযোজন, বিদ্যমান নিরাপত্তা নীতিমালা পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার সর্বজনীন নিরাপত্তা সংস্থা কর্মসূচি নির্বিঘেœ সম্পন্ন করতে স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ অন্যান্য সংস্থার সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
ড্রোন ব্যবহার করলেই ব্যবস্থা : বিমানবন্দরে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না উল্লেখ করে বিমানমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন, ভিআইপি এবং সিআইপিসহ সবার জন্যই নিরাপত্তা প্রটোকল সমান। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা রক্ষায় সবাইকে একইভাবে নিয়ম মেনে চলতে হবে। সে সময় তিনি বিশেষভাবে প্রবাসী কর্মীদের হয়রানিমুক্ত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে বলেন। প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বিমানবন্দর এলাকার আকাশসীমা সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দর এলাকায় যেকোনো ধরনের ড্রোন উড্ডয়ন বন্ধ করতে দ্রুত অ্যান্টি ড্রোন সিস্টেম স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ও স্ক্যানার সবসময় চাহিদার চেয়ে বেশি মজুদ রাখতে হবে। ব্যত্যয় ঘটলে কাউকে ছাড় না দিয়ে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’
বহু ভাষায় ডিজিটাল সাইন বসানোর পরিকল্পনা : ‘বিমানবন্দর একটি দেশের ড্রয়িং রুমের মতো। এখানে প্রবেশ করার পর কোনো যাত্রী যেন কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা বা হয়রানির শিকার না হন। যেকোনো অনিয়ম বা অপকর্ম দৃশ্যমান হওয়া মাত্রই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অন-দ্য-স্পট আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ‘দেশি-বিদেশি যাত্রীরা যাতে সহজেই বিমানবন্দরে নামার পর কাক্সিক্ষত গন্তব্য বা কাউন্টার খুঁজে পান, সে জন্য পুরো টার্মিনালে বহুল ভাষায় নতুন ডিজিটাল সাইনেজ বসানো হবে। যাত্রীদের বহু আলোচিত ট্রলি সমস্যার স্থায়ী সমাধানে ট্রলির অবস্থান ট্র্যাকিং করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নির্দিষ্ট স্থানে ট্রলি জমা করা ও যাত্রী নামার সঙ্গে সঙ্গে যেন সহজে ট্রলি পাওয়া যায়, সে জন্য জনবল বাড়ানো হবে।
বিমানবন্দরকে ঢেলে সাজানোর মহাপরিকল্পনা : শাহজালাল তৃতীয় টার্মিনাল চালু ও যাত্রী সক্ষমতা বৃদ্ধির পটভূমিতে পুরো বিমানবন্দর এলাকাকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং প্রযুক্তিভিত্তিক সেবা এবং ব্যবস্থাপনাগত আমূল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সভায়। পুরো বিমানবন্দরকে আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আইপি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। এলাকাগুলোতে সন্দেহভাজন চলাফেরা শনাক্ত করা যাবে। সভায় বলা হয়, শুধু কঠোর নীতিনির্ধারণ করলেই বিমানবন্দর সুন্দর হবে না, বরং বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি সংস্থাকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। যাত্রীদের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, লাগেজ বেল্ট থেকে দ্রুত মালামাল সরবরাহ এবং ইমিগ্রেশন পারাপারে সময় কমিয়ে আনার ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
পাসপোর্ট ও টিকিট থাকলেই গোলচত্বর পার : বিমানবন্দরমুখী যানজট কমানো এবং নিরাপত্তার সুনির্দিষ্ট বলয় তৈরির লক্ষ্যে একটি নতুন ট্রাফিক ও নিরাপত্তা ফিল্টারিং ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হচ্ছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বিমানবন্দরের ক্যানোপি বা টার্মিনাল অভিমুখী প্রবেশপথে অপ্রয়োজনীয় মানুষের ভিড় সামলাতে শাহজালাল বিমানবন্দরের সামনের ‘গোলচত্বর’ এলাকাতেই প্রাথমিক নিরাপত্তা চেকপোস্ট কার্যকরী করা হবে। গোলচত্বর এলাকা পার হয়ে বিমানবন্দরে প্রবেশের মুখে চালক এবং যাত্রীদের বৈধ পাসপোর্ট এবং ভ্রমণের কনফার্মড টিকিট দেখাতে হবে। যাত্রীদের সঙ্গে আসা অতিরিক্ত স্বজনদের মধ্যে মাত্র দুজনকে যেতে দেওয়া হবে। সভায় শাহজালালে প্রবেশপথে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিমানবন্দরের প্রবেশমুখে দায়িত্বপ্রাপ্ত এপিবিএন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যাত্রী ও আগত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে যাত্রীপ্রতি সর্বোচ্চ দুইজন দর্শনার্থীকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই সাপেক্ষে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে বলা হয়েছে।
ভেঙে দিতে হবে কারপার্কিংয়ের সিন্ডিকেট : শাহজালালের কারপার্কিং ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণভাবে একটি নির্দিষ্ট বলয় ও অব্যবস্থাপনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে গাড়ি পার্কিংয়ের নির্দিষ্ট ফি থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। রাতে ও ভোরের শিফটে টার্মিনাল এবং পার্কিং এলাকায় পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় নির্ধারিত পার্কিং ফি তিনগুণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। গতকালকের বৈঠকে বলা হয়েছে, স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ইজারার নিয়োগ দিতে হবে। কোনো তদবির চলবে না। সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। বিমানবন্দরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ‘একে ট্রেডার্সের’ কর্মকা- নজরদারির আওতায় আনতে হবে।