ব্যতিক্রম শুধু মিরাজ

অস্ট্রেলিয়ায় কন্ডিশনের সঙ্গে অনেকটাই মানিয়ে নিয়েছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্টের ভেন্যু ডারউইনে আবহাওয়া খুব বেশি চ্যালেঞ্জে ফেলেনি সফরকারীদের। টিম ম্যানেজমেন্টের এক সদস্য জানান, দেশে ফেব্রুয়ারি মাসে যেমন আবহাওয়া থাকে, সেখানে ঠিক তেমনই। দিনের আলোয় ২৮ থেকে ৩১-এর মধ্যে ওঠানামা করে পারদ। তবে সর্বশেষ জিম্বাবুয়ে সফরে কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে যে বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছে, সে স্বাদ আর পেতে চায় না লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। এজন্য ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একমাত্র প্রস্তুতি ম্যাচে চোখ রেখেছেন নাজমুল হোসেন শান্তরা। ৩ দিনের এই ম্যাচের প্রথম দিনের প্রথম ইনিংসে কোরি রকিচ্চলি নামের এক অফ স্পিনারের কাছে কুপোকাত সফরকারীদের ব্যাটিং বিভাগ। তরুণদের সঙ্গে অভিজ্ঞরাও নাস্তানাবুদ হন। ব্যতিক্রম শুধু মেহেদী হাসান মিরাজ। সেঞ্চুরিতে প্রস্তুতি সারার পাশাপাশি দলকে টেনে তোলেন তিনি। তার অনবদ্য সেঞ্চুরির কারণেই প্রথম ইনিংসে ২৬৩ রানের পুঁজি পান শান্তরা।

১৪১ বল খেলে ১০৯ রানে অপরাজিত থাকেন মিরাজ। দলের বিপর্যয়ে ৭ নম্বরে নেমে ১১টি চারের সঙ্গে ৪টি ছক্কা হাঁকান তিনি। মূলত লোয়ার অর্ডারের ব্যাটারদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়েন সদ্য ওয়ানডে সংস্করণে অধিনায়কত্ব হারানো এই ক্রিকেটার। বিশেষ করে শেষ জুটিতে তার ব্যাটিং ছিল দেখার মতো। দল যখন নবম উইকেট হারায়, মিরাজের রান তখন ৫৬। সেখান থেকেই দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ের প্রদর্শনীতে সেঞ্চুরি তুলে নেন। ৬৯ রানের শেষ উইকেট জুটিতে খালেদ আহমেদের ব্যাট থেকে আসে মাত্র ১৫ রান, বাকিটা মিরাজের। দিনের খেলা শেষে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পাঠানো এক ভিডিওতে এই সেঞ্চুরির রেশ টেস্ট সিরিজে বয়ে নিতে চান বলে মন্তব্য করেন তিনি, ‘যেহেতু আমাদের সামনে টেস্ট ম্যাচ আছে, এটা (সেঞ্চুরি) আমাকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দেবে। আমি যে পরিকল্পনার মধ্যে আছি, এটা যদি অব্যাহত রাখতে পারি, আমার জন্য ভালো হবে। দলের জন্যও ভালো হবে।’

সাধারণত অন্যান্য প্রস্তুতি ম্যাচে স্কোয়াডের সব সদস্যকে ঘুরিয়ে-ফুরিয়ে খেলানো যায়। তবে এই ম্যাচটি কিছুটা আলাদা। সব মিলিয়ে ১৩ জন ক্রিকেটার খেলতে পারবেন প্রতিটি দলের হয়ে। জানা গেছে, বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্ট ১ জন বাড়াতে চেয়েছিল। তবে এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি স্বাগতিকরা। তাতে মাঠে নামার সুযোগ হয়নি মুশফিক হাসান, জাকের আলী ও লিটন দাসের। এদের মধ্যে লিটন সুস্থ হলেও ব্যাটিংয়ের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নন। এমনিতে কাফ মাসলের চোটের জায়গায় ব্যথা না থাকলেও দৌড়ের সময় কিছুটা অস্বস্তিবোধ এখনো আছে তার। আগামী ৮ অথবা ৯ আগস্ট ফিটনেস টেস্ট দেবেন তিনি। পাস করলে ১৩ আগস্ট প্রথম টেস্টে দেখা যাবে তাকে। সেক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘এ’ দলের সঙ্গে যোগ দিতে যাবেন জাকের।

যারা গতকাল প্রস্তুতি ম্যাচে নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ পান, তাদের অনেকেই সুবিধাটা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেননি। ধারাবাহিকতার অভাবের জন্য অভিজ্ঞ মাহমুদুল হাসানকে রেখে অস্ট্রেলিয়ায় গেছে বাংলাদেশ। নির্বাচকরা ওপেনিংয়ে তানজিদ হাসান তামিমের ওপর আস্থা রাখেন। তবে জিম্বাবুয়েতে টেস্ট অভিষেক হওয়া এই ব্যাটার গতকাল রানের খাতা খুলতে পারেননি। আরেক ওপেনার সাদমান ইসলাম (৩১) থিতু হয়েও রকিচ্চলির স্পিনে কাটা পড়েন। মুমিনুল হকও (১৬) তার স্পিন ফাঁদে ধরা পড়েন। বাংলাদেশের হয়ে রেকর্ড ১০৩ টেস্ট খেলা মুশফিককে শূন্য হাতে ফেরান তিনি। ৬১ রানে ৪ উইকেট হারানোর পর দলকে টানার চেষ্টা করেন শান্ত। তবে অধিনায়কও ৩৭ রানে আউট হলে বিপদ বাড়ে বাংলাদেশের।

মিরাজ যখন ব্যাটিংয়ে নামেন, তখন ৫ উইকেটে ১০৫ রান সফরকারীদের। একটু পরই অমিত হাসান থামেন ১৫ রানে। সেখান থেকে দলকে এগিয়ে নেন মিরাজ। তিনি একপ্রান্তে ধরে খেললেও অপর প্রান্তে সৌম্য সরকার (১৬), তাইজুল ইসলাম (১০) ও হাসান মাহমুদকে (৪) নিজের শিকার বানান রকিচ্চলি। একাই ৬ উইকেট দখল করেন তিনি। ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি লম্বা এই স্পিনারের পারফরম্যান্স থেকে ১৩ আগস্ট ডারউইনে হতে যাওয়া প্রথম টেস্টের সম্ভাব্য একটি ছবিও ফুটে ওঠে। এখানকার উইকেটে সাধারণত অস্ট্রেলিয়ার মূল ভেন্যুগুলোর থেকে আলাদা। কিছুটা শুকনো থাকে, যেখানে স্পিনাররা সহায়তা পান। টেস্ট ম্যাচে প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজেলউডের আগুন তো সামলাতে হবেই, সঙ্গে ন্যাথান লায়নের স্পিনের বিপক্ষেও বড়সড় পরীক্ষা দিতে হবে বাংলাদেশের ব্যাটারদের।

কিন্তু যে উইকেটে নিচের দিকের ব্যাটারদের সঙ্গে নিয়ে লড়াই করে সেঞ্চুরি করেন মিরাজ, সেখানে অন্যরা ব্যর্থ কেন? দিনের খেলা শেষে সে কৌতূহল নিজেই ভাঙেন মিরাজ, ‘প্রথম দিকে একটু চ্যালেঞ্জিং ছিল। আমি শুধু চেষ্টা করেছি মেরিট অনুযায়ী খেলার জন্য। ওদের বোলাররা খুব ভালো জায়গায় বোলিং করেছে। আমার জন্যও কঠিন ছিল, যেহেতু প্রথম এই কন্ডিশনে খেলছি। আমি মানিয়ে নিতে চেষ্টা করেছি। জুটি গড়ার চেষ্টা করেছি। প্রথম দিকে রানের জন্য খেলিনি। চেষ্টা করেছি কীভাবে উইকেটে থিতু হওয়া যায়। পরে যখন সুযোগ পেয়েছি, রান করা সহজ হয়েছে। এভাবেই চিন্তা করেছি।’

ব্যাটিং শেষে ১২ ওভার বল করার সুযোগ পান বাংলাদেশের বোলাররা। যেখানে সফরকারীদের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে ফেলেন স্পিনার রকিচ্চলি। সেখানে শান্ত ৪ বোলার ব্যবহার করলেও কোনো স্পিনারের হাতে বল দেননি। শুরুটা অবশ্য ভালোই করেন হাসান ও তাসকিন। একজন ফেরান অস্ট্রেলিয়ার সম্ভাবনাময় ব্যাটার স্যাম কনস্টাসকে, আরেকজন তুলে নেন ক্যাম্পবেল কেলাওয়ের উইকেট। ২ রানে ২ উইকেট হারালেও আর কোনো বিপদ ছাড়াই ৫১ রানে প্রথম দিনের খেলা শেষ করেছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশ। অধিনায়ক কার্টিস প্যাটারসন ২৬ ও জশ ফিলিপি ২২ রান নিয়ে আজ দ্বিতীয় দিনের ব্যাটিংয়ে নামেন।