শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মেটাকে আরও ৫৬৭ মিলিয়ন বা প্রায় ৫৭ কোটি মার্কিন ডলার জরিমানা করার নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি আদালত। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) দেওয়া এ রায় শিশু নিরাপত্তা ইস্যুতে মেটার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আর্থিক দণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
নিউ মেক্সিকোর বিচারক ব্রায়ান বিডশেইড বলেন, শিশুদের জন্য মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো যে ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে, তা জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর 'পাবলিক নিউসেন্স' বা জনদুর্ভোগের পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি মেটাকে এমন একটি তহবিল গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন, যার অর্থ ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষতি কমাতে ব্যয় করা হবে।
এর আগে একই মামলায় মেটাকে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়েছিল। নতুন জরিমানাসহ কোম্পানিটির মোট আর্থিক দণ্ড দাঁড়াল ৯৪২ মিলিয়ন ডলার।
রায়ে বিচারক মেটার সঙ্গে একটি কারখানার তুলনা করেন। তিনি বলেন, কারখানা যেমন পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি দূষণও সৃষ্টি করে, তেমনি মেটার প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন ও কনটেন্টের পাশাপাশি শিশুদের মানসিক ক্ষতি ও যৌন শোষণের ঝুঁকিও সৃষ্টি হয়েছে, যা দূর করা জরুরি।
মেটার মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও থ্রেডস।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় মেটার এক মুখপাত্র বলেন, প্রতিষ্ঠানটি আদালতের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নয় এবং এর বিরুদ্ধে আপিল করবে।
তিনি বলেন, 'আমরা আমাদের প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীদের নিরাপদ রাখতে নিরলসভাবে কাজ করছি। ক্ষতিকর ব্যক্তি ও কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে আমরা সবসময় স্বচ্ছ থেকেছি। কিশোর-কিশোরীদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমাদের কার্যক্রমের ওপর আমরা আস্থাশীল এবং তথ্য বিকৃত করে আনা অভিযোগের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাব।'
নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্য ২০২৩ সালে মেটার বিরুদ্ধে মামলা করে অভিযোগ করে, কোম্পানির প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের যৌন হয়রানি, যৌন শোষণ এবং অশ্লীল কনটেন্টের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
মামলার প্রথম ধাপে আদালত রায় দেন, মেটার সুপারিশভিত্তিক অ্যালগরিদম তরুণ ব্যবহারকারীদের ক্ষতিকর কনটেন্ট ও অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগের দিকে পরিচালিত করেছে, যা অঙ্গরাজ্যের ভোক্তা সুরক্ষা আইন লঙ্ঘন করেছে।
দ্বিতীয় ধাপের রায়ে বিচারক বলেন, মেটার কর্মকাণ্ড শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজব্যাপী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ কারণেই এটিকে 'পাবলিক নিউসেন্স' হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। শিশু নিরাপত্তা ইস্যুতে কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে প্রথমবারের মতো এ ধরনের রায়ের মুখোমুখি হতে হলো বলেও মনে করা হচ্ছে।
বিচারক বলেন, কারখানার দূষণ যেমন শুধু কারখানার ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না, তেমনি মেটার প্ল্যাটফর্মের ক্ষতিকর প্রভাবও অনলাইন জগৎ পেরিয়ে বাস্তব জীবনে শিশু, তাদের পরিবার, স্কুল, হাসপাতাল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক চাপ সৃষ্টি করছে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, জরিমানার অর্থ দিয়ে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হবে। এর মধ্যে ৪২০ মিলিয়ন ডলার শিশুদের ইতোমধ্যে হওয়া ক্ষতির চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং আচরণগত স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে ব্যয় করা হবে।
এছাড়া শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের শিশুদের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রমেও এ তহবিলের অর্থ ব্যয় হবে।
রায়ে মেটাকে শিশুদের সুরক্ষায় বেশ কয়েকটি নতুন ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
* ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট যেন প্রাপ্তবয়স্কদের কাছে সুপারিশ না করা হয়।
* কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারী যেন অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যক্তিগত বার্তা পাঠাতে না পারেন।
* অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অশ্লীল ছবি বা ভিডিও আদান-প্রদান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।
* শিশু যৌন শোষণের সঙ্গে জড়িত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে 'ওয়ান-স্ট্রাইক' বা একবার অপরাধেই স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ।
এ ছাড়া আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছে—
* ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য 'লাইক' সংখ্যা প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে।
* প্রতিদিন রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত এবং শিক্ষাবর্ষ চলাকালে সপ্তাহের কর্মদিবসে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত (সাপ্তাহিক ছুটি ব্যতীত) পুশ নোটিফিকেশন বন্ধ রাখতে হবে।
* ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক মিলিয়ে ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের মাসিক ব্যবহারসীমা সর্বোচ্চ ৯০ ঘণ্টা নির্ধারণ করতে হবে, যা গড়ে দিনে প্রায় তিন ঘণ্টা।
এদিকে আগামী সপ্তাহে ক্যালিফোর্নিয়ায় মেটার বিরুদ্ধে আরও একটি বড় মামলা শুরু হচ্ছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় তিন ডজন অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল অভিযোগ করেছেন, শিশুদের গোপনীয়তা সুরক্ষায় বিদ্যমান আইন লঙ্ঘন করেছে মেটা।