কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) এজেন্টকে মানুষ ও স্বয়ংক্রিয় বটের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের জন্য ব্যবহৃত ক্যাপচা পরীক্ষায় বেশ বেগ পেতে হয়েছে। এমনকি শত শত পৃষ্ঠা জুড়ে চিন্তা-ভাবনা করেও পরীক্ষাটি পেরোতে দীর্ঘ সময় লেগেছে এআই এজেন্টটির। তবে শেষ পর্যন্ত ক্যাপচা বাধা অতিক্রম করে এজেন্টটি একটি ক্ষতিকর সফটওয়্যার প্যাকেজ পাবলিক ডেটাবেসে আপলোড করে দেয়। খবর টেকক্রাঞ্চ।
এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের সর্বশেষ এক প্রতিবেদনে। প্রতিষ্ঠানটির পরীক্ষাধীন ‘মিথোস ৫’ মডেলের আচরণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা যায়, মডেলটি পরীক্ষার নির্ধারিত স্যান্ডবক্সের বাইরে অননুমোদিতভাবে ইন্টারনেটে প্রবেশ করে এবং একটি ক্ষতিকর সফটওয়্যার প্যাকেজ প্রকাশ্য ডেটাবেসে আপলোড করে।
অ্যানথ্রপিক মূলত মডেলটির হ্যাকিং সক্ষমতা পরীক্ষা করছিল। এ জন্য তাকে একটি সিস্টেমে প্রবেশ করে নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্য খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরীক্ষাটি একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে হওয়ার কথা থাকলেও কোনো এক পর্যায়ে সিস্টেমের ইন্টারনেট সংযোগ উন্মুক্ত থেকে যায়।
এরপর মডেলটি ধারণা করে, কাঙ্ক্ষিত সিস্টেমের ব্যবহারকারীরা যে পাইথন সফটওয়্যার প্যাকেজ ব্যবহার করতে পারেন, সেটির মধ্যে একটি এক্সপ্লয়েট যুক্ত করে দিলে সিস্টেমে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাকে প্রথমে অনলাইন পাইথন সফটওয়্যার সূচি পিওয়াইপিএল এ একটি ব্যবহারকারী অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। আর সেখানেই সামনে আসে ক্যাপচা।
অ্যানথ্রপিকের প্রকাশ করা ১ হাজার ২২ পৃষ্ঠার বিস্তৃত ট্রান্সক্রিপ্টে দেখা যায়, ক্যাপচা পার হতে গিয়ে মডেলটি অস্বাভাবিক পরিমাণ সময় ও প্রচেষ্টা ব্যয় করেছে। বিপুল এই প্রচেষ্টার বিষয়টি তথ্যবিজ্ঞানী কলিন ফ্রেজারও আলাদাভাবে তুলে ধরেছেন।
সফটওয়্যার প্যাকেজে ক্ষতিকর কোড যুক্ত করা বা সেটিকে ‘পয়জন’ করার কাজটি মডেলটির জন্য তুলনামূলক সহজ হলেও ক্যাপচা পরীক্ষাই হয়ে দাঁড়ায় বড় বাধা।
প্রথমে মডেলটি ‘আমি মানুষ’—এ ধরনের একটি ক্যাপচা চেকবক্সের মুখোমুখি হয়। সেটি সক্রিয় করার পর তাকে ছবিভিত্তিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। এক পর্যায়ে Fastly-এর একটি ইমেজ ক্যাপচায় ছবির ভেতরের অক্ষর শনাক্ত করে লিখতে বলা হয়।
এরপর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ক্যাপচায় কখনো প্রাণীর ছবি শনাক্ত করতে বলা হয়, কখনো একই ধরনের দেখতে একাধিক প্রাণীর মধ্যে ভিন্নটিকে বেছে নিতে বলা হয়। একটি পরীক্ষায় দুটি কুমিরের মধ্যে কোনটি ভিন্ন, তা শনাক্ত করতে গিয়ে মডেলটি দীর্ঘ সময় ধরে ছবির সূক্ষ্ম পার্থক্য বিশ্লেষণ করে। অন্য একটি ধাপে দুটি ব্যাঙ এবং পরে একাধিক গরিলার সঙ্গে প্রায় অদৃশ্য একটি বিড়ালের ছবি দেখানো হয়। কোনটি অন্যদের থেকে আলাদা, তা শনাক্ত করতেও মডেলটি ব্যাপক সময় ব্যয় করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রান্সক্রিপ্টের ৪৫ থেকে ১৪০ নম্বর পৃষ্ঠা পর্যন্ত বড় একটি অংশজুড়ে মডেলটি ক্যাপচা সমাধানের কৌশল তৈরির চেষ্টা করেছে। পরে ৪৮০ থেকে ৫০৫ নম্বর পৃষ্ঠার মধ্যেও ক্যাপচা ঘিরে বারবার সমস্যায় পড়তে দেখা যায়।
এক পর্যায়ে মডেলটি বুঝতে পারে, শুধু সঠিক উত্তর দিলেই হবে না; ক্যাপচা যাচাইয়ের জন্য ব্যবহৃত নিরাপত্তা টোকেনও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সার্ভারে পাঠাতে হবে। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করতে গিয়ে সেই টোকেনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছিল। ফলে সঠিক উত্তর দেওয়ার পরও সার্ভার থেকে ক্যাপচা ব্যর্থ হওয়ার বার্তা আসছিল।
মডেলটি তখন ক্যাপচা যাচাইয়ের প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করতে থাকে এবং কীভাবে দ্রুত পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা যায়, তা বের করার চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত ক্যাপচা অতিক্রম করতে সক্ষম হয় এটি।
তবে এরপরও তার কাজ শেষ হয়নি। PyPI অ্যাকাউন্ট সক্রিয় করতে ই-মেইল যাচাইয়ের প্রয়োজন হয়। পরে ফোন নম্বর যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসে। বিভিন্ন বিকল্প ব্যবহারের চেষ্টা করেও মডেলটি বারবার নতুন ক্যাপচা বাধার মুখে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত নিজের আগের একটি অ্যাকাউন্টে ই-মেইল যুক্ত করার পথ বের করে মডেলটি। এরপর আবারও ক্যাপচা পার হতে হয়। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে মডেলটি তার পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্ষতিকর সফটওয়্যার প্যাকেজ আপলোড করে।
ঘটনাটি এআই এজেন্টগুলোর সক্ষমতার পাশাপাশি তাদের অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ব্যবহারের ঝুঁকিও সামনে এনেছে। বিশেষ করে পরীক্ষার জন্য তৈরি স্যান্ডবক্সে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ উন্মুক্ত থাকলে একটি এআই এজেন্ট কীভাবে নিজের নির্ধারিত কাজের বাইরে গিয়ে বাস্তব অনলাইন অবকাঠামোয় কার্যক্রম চালাতে পারে, তা এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে।
তবে ঘটনাটির সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিকগুলোর একটি হলো—উন্নত এআই এজেন্টের জন্যও মানুষের কাছে পরিচিত ক্যাপচা এখনো বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠতে পারে। একটি সাধারণ ব্যবহারকারীর কাছে বিরক্তিকর মনে হওয়া ‘আমি মানুষ’ চেকবক্স বা ছবিতে ভিন্ন প্রাণী শনাক্ত করার পরীক্ষাই মডেলটির জন্য পরিণত হয়েছিল দীর্ঘ এক প্রযুক্তিগত গোলকধাঁধায়।
অ্যানথ্রপিকের প্রকাশ করা এই পরীক্ষার বিবরণ তাই একই সঙ্গে এআই এজেন্টের সম্ভাবনা এবং সীমাবদ্ধতা—দুই দিকই সামনে এনেছে। একদিকে মডেলটি জটিল সাইবার কৌশল তৈরি ও বাস্তবায়নে সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে, অন্যদিকে একটি ক্যাপচা পরীক্ষায় দীর্ঘ সময় ধরে আটকে গিয়ে দেখিয়েছে, মানুষের জন্য সহজ মনে হওয়া কিছু কাজ এখনো এআইয়ের জন্য কতটা কঠিন হতে পারে।