কুড়িগ্রামের ঐতিহ্য ও ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও শাপলা চত্বরের সীমানা দেয়াল ভেঙে একটি অংশ সংকুচিত করায় স্থানীয় বাসিন্দা, সুশীল সমাজ ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
তাঁদের অভিযোগ, যানজট নিরসনের জন্য জেলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনার জায়গা সংকুচিত না করে বিকল্প উপায়ে সড়ক প্রশস্ত করা সম্ভব ছিল।
অন্যদিকে, সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ বলছে, শাপলা চত্বর এলাকায় দীর্ঘদিনের যানজট নিরসন ও মানুষের দুর্ভোগ কমাতেই শহীদ মিনারের সামনের প্রায় ১৫ ফুট অংশ অপসারণ করা হচ্ছে। এতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ এই মোড়টি প্রশস্ত হয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক হবে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে কুড়িগ্রাম শহরের জিরো পয়েন্ট এলাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনের অংশ অপসারণের কাজ শুরু হয়। কুড়িগ্রাম পৌরসভা ও সওজ বিভাগের যৌথ উদ্যোগে এ কার্যক্রম শুরু করে।
কুড়িগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও শাপলা চত্বরটি কুড়িগ্রাম-রংপুর ও কুড়িগ্রাম-চিলমারী সড়কের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ব্যস্ত সময়ে অটোরিকশা, বাস ও ট্রাকের চাপ বেড়ে যাওয়ায় এখানে প্রায়ই যানজটের সৃষ্টি হয়। প্রশাসনের দাবি, সরু মোড়ের কারণে যানজটের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মীর নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, যানজট নিরসনের জন্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনের প্রায় ১৫ ফুট অংশ অপসারণ করা হবে। এতে মোড়টি প্রশস্ত হবে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক হবে। শহীদ মিনার একটি সংবেদনশীল বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, জেলার সব রাজনৈতিক দল ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সওজ কর্তৃপক্ষ মূলত সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে।
কাজ পরিদর্শনে গিয়ে জেলা পরিষদের প্রশাসক সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ বলেন, শাপলা চত্বর দীর্ঘদিন ধরে শহরের যানজটের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত। শহীদ মিনারের মূল স্তম্ভ অক্ষত রেখে শুধু কিছু অংশ অপসারণ করা হচ্ছে। এতে সড়ক প্রশস্ত হবে এবং শহরের কেন্দ্রস্থলে যান চলাচল আরও গতিশীল হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কাজ শুরুর সময় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু, যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক হাসিবুর রহমান হাসিব, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি নিজাম উদ্দিন, এনসিপির জেলা আহ্বায়ক মুকুল মিয়া, সাবেক মেয়র আবু বকর সিদ্দিকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
তবে শহীদ মিনারের অংশ অপসারণের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, সুশীল সমাজ ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা। তাঁদের দাবি, শাপলা চত্বরসংলগ্ন রেলওয়ের খাসজমি এবং আশপাশের দোকানপাট উচ্ছেদ বা পুনর্বিন্যাস করেও সড়ক প্রশস্ত করা সম্ভব ছিল। তাই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার জায়গা সংকুচিত না করে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তাঁদের।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রবীণ হিতৈষী সংঘের সভাপতি সামিউল হক নান্টু বলেন, এ ঘটনা দুঃখজনক। কুড়িগ্রামের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানাই। রাস্তা সম্প্রসারণের বিকল্প পথ রয়েছে। শহীদ মিনারের মতো সংবেদনশীল ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা রক্ষায় সরকারের উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। এ শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠার পেছনেও রয়েছে অনেক লড়াই ও সংগ্রামের ইতিহাস। ইতিহাস বদলানো বা মুছে ফেলা উচিত হবে না।’
রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সহসভাপতি সুব্রতা রায় বলেন, শহীদ মিনারের অংশ ভেঙে রাস্তা প্রশস্ত করা গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়। প্রয়োজন হলে আশপাশের জমি অধিগ্রহণ কিংবা দোকানপাট সরিয়ে সড়ক সম্প্রসারণ করা যেত। শহীদ মিনারের জায়গা সংকুচিত করে সড়ক সম্প্রসারণ ভাষা আন্দোলনের স্মৃতির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
স্থানীয়দের মতে, কুড়িগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি জেলার ভাষা আন্দোলন, গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি ঐতিহাসিক স্থান। তাই উন্নয়ন ও যানজট নিরসনের প্রয়োজন থাকলেও এর ঐতিহ্য ও স্থাপত্যিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে বিকল্প পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পৌরসভার প্রশাসক বিএম কুদরত-এ-খুদার বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।