দায়িত্বশীল স্বাধীনতাই গণতন্ত্র

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে বোঝার সহজ উপায় হলো, রাজপথের দিকে তাকানো। সেখানে যদি  মানুষ ভয় ছাড়া নিজের মতপ্রকাশ করতে পারে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারে- তবে ধরে নেওয়া যায়, রাষ্ট্রে গণতন্ত্র জীবিত। কিন্তু যখন রাজপথ মিছিল, সহিংসতা, প্রতিশোধ কিংবা শক্তি প্রদর্শনের প্রতীকে পরিণত হয়- তখন প্রশ্ন জাগে, আমরা কি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করছি, নাকি আরও ভঙ্গুর করছি? রাজনীতির ইতিহাসে, মিছিলের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য রয়েছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম- প্রতিটি অধ্যায়ে রাজপথ ছিল মানুষের কণ্ঠস্বর। এদেশে মিছিল কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না; এটি অধিকার আদায়ের ভাষা, প্রতিবাদের সংস্কৃতি এবং সাহসের প্রতীক ছিল। অথচ সেই মর্যাদাপূর্ণ ঐতিহ্য প্রশ্নের মুখে। বর্তমানে মিছিল ঘিরে যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেখানে নাগরিক অধিকারের পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে- দখল, ভয়, পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষ, যানজট, জনদুর্ভোগ এবং প্রাণহানির ঘটনা। ফলে মিছিলের সাংবিধানিক অধিকার এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকারের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদে শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্রভাবে সমাবেশ করার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া নয়, বরং নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণভাবে পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করা। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। অধিকার তখনই অর্থবহ, যখন অন্যের অধিকার অকারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। যদি একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্স আটকে থাকে, পরীক্ষার্থী পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে না পারে, ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে যায় কিংবা সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বের হতে ভয় পান- তাহলে রাষ্ট্রকেই ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে হবে। মিছিল ঘিরে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয়। একসময় মিছিল ছিল বক্তব্যের বাহন; এখন অনেক ক্ষেত্রে সেটি শক্তি প্রদর্শনে পরিণত হয়েছে। দেখাা যায়- ব্যানারের চেয়ে লাঠির উপস্থিতি বেশি চোখে পড়ে, যুক্তির চেয়ে সেøাগান উচ্চকিত হয়- আর মতবিরোধ অনেক সময় ব্যক্তিগত বা দলীয় শত্রুতায় রূপ নেয়। এতে গণতন্ত্রের মূল দর্শন- ভিন্নমতের সহাবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আসলে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের সংস্কৃতি দুর্বল হয়েছে। সংসদ, স্থানীয় সরকার কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার ক্ষেত্র সংকুচিত হলে- রাজপথ হয় প্রধান রাজনৈতিক মঞ্চ। সেখানে যুক্তির চেয়ে আবেগ বেশি কাজ করে। আবেগ যখন সংগঠিত শক্তির সঙ্গে মেশে, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়া স্বভাবিক। আমরা ভুলে যাই- গণতন্ত্র মানে সীমাহীন স্বাধীনতা নয়, এটি দায়িত্বশীল স্বাধীনতা।

 বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে, প্রতিবাদের অধিকার ও জনজীবনের স্বাভাবিকতাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। যুক্তরাজ্যে বড় রাজনৈতিক সমাবেশের আগে পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও আয়োজকদের মধ্যে সমন্বয় হয়। সুইডেন ও নেদারল্যান্ডসে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে উৎসাহিত করা হয়। কিন্তু সহিংসতা কিংবা জনসম্পদের ক্ষতি হলে, কঠোর আইনগত ব্যবস্থা থাকে। আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো, রাজনৈতিক মিছিলের পাশাপাশি- বিভিন্ন পেশাজীবী, স্বার্থগোষ্ঠী কিংবা দাবি-দাওয়া আদায়ের আন্দোলন রাজপথনির্ভর হয়ে উঠছে। এটি কেবল প্রতিবাদের সংস্কৃতির পরিবর্তন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অনাস্থা জানায়। মানুষ যখন বিশ্বাস করে, আলোচনার টেবিলে কথা শোনা হবে না- তখন সে রাজপথে নামতে বাধ্য হয়। এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব বেশি। কার্যকর রাষ্ট্র কখনো নাগরিককে এমন অবস্থায় ঠেলে দেয় না, যেখানে দাবি আদায়ের পথ হয় সড়ক অবরোধ। প্রশাসনিক জবাবদিহি, কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি, সংসদীয় বিতর্ক, স্থানীয় সরকারের সক্রিয়তা এবং স্বাধীন গণমাধ্যম এসব প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলে, রাজপথের ওপর চাপ কমে। এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের দায়িত্ব শুধু আইন প্রয়োগ নয়; বরং নাগরিক অধিকার রক্ষা করা। অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ যেমন গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি সহিংসতা বা নাশকতার ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় থাকাও রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। আইন প্রয়োগ হতে হবে নিরপেক্ষ, পেশাদার এবং মানবাধিকারসম্মত।

গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন মিছিলের রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। একটি ছোট ঘটনা, মুহূর্তে জাতীয় আলোচনায় পরিণত হচ্ছে। গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য কিংবা উসকানিমূলক প্রচার সংঘাত বাড়াতে পারে। ফলে তথ্য যাচাই, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং ডিজিটাল সচেতনতা আজ গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার অংশ হয়ে উঠেছে। সরকারি সম্পদ ভাঙচুর, যানবাহনে আগুন, সাধারণ মানুষের ওপর হামলা কিংবা প্রতিপক্ষের সভা পণ্ড করা আন্দোলনের ভাষা নয়। ন্যায়সংগত দাবি সহিংসতার ফলে নৈতিক শক্তি হারায়। বাংলাদেশ এমন সময়ে দাঁড়িয়ে যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক আস্থা গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, পর্যটন কিংবা ব্যবসায়িক পরিবেশ- রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করে। ফলে মিছিলের রাজনীতিকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে- যেখানে প্রতিবাদের অধিকার অক্ষুন্ন থাকবে, কিন্তু জনজীবন জিম্মি হবে না। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, ন্যূনতম আচরণবিধি প্রণয়ন করা যেতে পারে। রাজপথের শক্তি তখনই অর্থবহ হবে- যখন তা রাষ্ট্রকে ধ্বংস নয়, সংশোধনের পথে আনে। যে রাজনীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সম্মান করে, সেই রাজনীতি শেষ পর্যন্ত জনগণের আস্থা অর্জন করে। গণতন্ত্রের আগামী পথ নির্ধারিত হবে, এই ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতার ওপর। যেখানে প্রতিবাদ ও মতভেদ থাকবে- কিন্তু থাকবে না ভয়, সহিংসতা এবং জনজীবন জিম্মির সংস্কৃতি।

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

drharun.press@gmail.com