বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব গোপনে বিক্রির এক বিতর্কিত ছক ফাঁস হতেই বিশ্ব ফুটবলের মসনদে নেমে এসেছে ঘোর অমানিশা। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে সামনে এসেছে, সদ্য শেষ হওয়া বিশ্বকাপের ফাইনালের ঠিক আগের দিন খোদ ফিফার শীর্ষ ডিরেক্টরদের অন্ধকারে রেখে এই গোপন চুক্তি বাস্তবায়নের চাপ দেওয়া হয়েছিল। যদিও তীব্র প্রতিবাদের মুখে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো শেষ পর্যন্ত ওই বাণিজ্যিক পরিকল্পনা বাতিল করেন এবং এ সংক্রান্ত ভুলত্রুটির জন্য বিশ্বজুড়ে সদস্য দেশগুলোর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চান, তবুও বিশ্ব ফুটবলের ক্ষমতা দখলের এই লড়াইয়ে তীব্র মেরূকরণ তৈরি হয়েছে।
কঠিন এই সময়ে ইনফান্তিনোর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আফ্রিকার ৫৪টি দেশ, আর্জেন্টিনা ও মেক্সিকো। কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবল (সিএএফ) সভাপতি প্যাট্রিস মতসেপে এক বিবৃতিতে ইনফান্তিনোর প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমরা ফিফা, এর সদস্য অ্যাসোসিয়েশন, অন্যান্য ফুটবল কনফেডারেশন এবং অংশীদারদের সঙ্গে সুশাসন, যথাযথ প্রক্রিয়া এবং স্বচ্ছতা রক্ষা ও সুরক্ষার জন্য একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
আফ্রিকার এই বিশাল ভোটব্যাংক ইনফান্তিনোর তরীকে সংকটময় মুহূর্তে বড় সুরক্ষা দিয়েছে। একই সঙ্গে মেক্সিকো এবং বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাও ইনফান্তিনোর নেতৃত্বকে সাধুবাদ জানিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছে। আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া ইনফান্তিনোকে পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করেন, ‘গত ১০ বছর ফিফার নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বিশ্ব ফুটবলের বিকাশ এবং একটি স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে।’ এছাড়া তারা ইনফান্তিনোর ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টিও ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে।
অন্যদিকে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তৈরি করেছে ইউরোপ ও অন্যান্য কিছু দেশ। ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে ফিফা এই প্রস্তাব বাতিল করলেও উয়েফা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, ইনফান্তিনো ফিফা প্রধানের পদে থাকা অবস্থায় তারা বিশ্বকাপসহ ফিফার সব টুর্নামেন্ট বয়কট করবে। পাশাপাশি নরওয়ের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লিসে ক্লাভেনেড সরাসরি ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করেছেন। এছাড়া ইংল্যান্ড, ওয়েলস, ক্রোয়েশিয়া এবং আলবেনিয়ার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও আনুষ্ঠানিকভাবে ইনফান্তিনোর ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এদিকে খেলোয়াড়দের বৈশ্বিক ইউনিয়ন ‘ফিফপ্রো’ এই গোপন চুক্তিকে সভাপতির ক্ষমতার চরম অপব্যবহার বলে অভিহিত করে জানিয়েছে, এটি ফিফার বর্তমান সুশাসন কাঠামোর একটি মারাত্মক অভিযোগ।
এদিকে দক্ষিণ আমেরিকার নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল একতরফা সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে জানিয়েছে, এমন কোনো পদক্ষেপকে তারা সমর্থন করবে না যা এই প্রাতিষ্ঠানিক কৌশলগুলোকে উপেক্ষা করে। তবে ভোটের প্রক্রিয়া ছাড়া হুট করে সভাপতির পদত্যাগের কোনো বেআইনি পদক্ষেপকে তারা সমর্থন করবে না। অন্যদিকে ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের পক্ষ থেকেও এই গোপনীয় বাণিজ্যিক পরিকল্পনার সরাসরি বিরোধিতা করা হয়েছে।
আগামী বছরের মার্চে মরক্কোর রাবাতে হতে যাওয়া ফিফা কংগ্রেসে চতুর্থ মেয়াদের জন্য লড়বেন ইনফান্তিনো। উন্নয়ন তহবিলের (ফিফা ফরোয়ার্ড প্রকল্প) সুবাদে আফ্রিকা ও এশিয়ার ছোট দেশগুলোর বড় একটি অংশ এখনো তার পক্ষে থাকায় নির্বাচনী লড়াইয়ে তিনি বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। তবে উয়েফার বয়কট হুমকি এবং বিশ্ব ফুটবলের এই তীব্র মেরূকরণ আগামী দিনে ফিফার রাজনীতিকে কোথায় নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।